“আমার সুস্থ রোগী হাসপাতালে এসেছিল…”

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম

সাহিত্য

চিকিৎসকের শেষ চেষ্টাটুকুও যখন অপরাধ হয়ে যায়হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে একজন স্বজন কাঁদছেন।কিছুক্ষণ আগেও তাঁর প্রিয় মানুষটি কথা বলছিলেন।

2026-08-26T16:05:12+06:00
2026-08-26T16:05:12+06:00
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
সাহিত্য
“আমার সুস্থ রোগী হাসপাতালে এসেছিল…”
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০৫ পিএম  
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম
চিকিৎসকের শেষ চেষ্টাটুকুও যখন অপরাধ হয়ে যায়

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে একজন স্বজন কাঁদছেন।

কিছুক্ষণ আগেও তাঁর প্রিয় মানুষটি কথা বলছিলেন। নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতালে এসেছিলেন। হয়তো নিজেই গাড়ি থেকে নেমেছেন। পরিবারের কাউকে ফোন করেছেন। নার্সকে নিজের নাম বলেছেন। চিকিৎসককে নিজের কষ্টের কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

তারপর—সবকিছু বদলে গেল।

হঠাৎ বুকের ব্যথা বেড়ে গেল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হলো।
রক্তচাপ নেমে গেল।
হৃদ্‌যন্ত্র পর্যবেক্ষণের পর্দায় ছন্দ এলোমেলো হয়ে গেল।

আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই—

হৃদ্‌যন্ত্র থেমে গেল।

জরুরি বিভাগের নিস্তব্ধতা ভেঙে ছুটে এলেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

কেউ অক্সিজেন দিচ্ছেন।
কেউ শিরায় নল স্থাপন করছেন।
কেউ জরুরি ওষুধ প্রস্তুত করছেন।
কেউ শ্বাসনালি সচল রাখার ব্যবস্থা করছেন।
কেউ বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র প্রস্তুত করছেন।

আর একজন চিকিৎসক রোগীর বুকের ওপর হাত রেখে শুরু করলেন হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা—সিপিআর।

একবার।
দুবার।
বারবার।

ঘাম ঝরছে তাঁর কপাল দিয়ে।

তিনি জানেন—প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান।

কারণ যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগেও কথা বলছিলেন, তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র এখন আর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে কার্যকরভাবে রক্ত পৌঁছে দিতে পারছে না।

তাঁকে ফিরিয়ে আনতেই এই লড়াই।

এক মিনিট…

দুই মিনিট…

পাঁচ মিনিট…

দশ মিনিট…

চিকিৎসকের হাত থামে না।

নার্সের দৌড় থামে না।

হৃদ্‌যন্ত্র পর্যবেক্ষণের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা চোখগুলো অপেক্ষা করে—

একটা স্বাভাবিক ছন্দের জন্য।
একটা নাড়ির স্পন্দনের জন্য।
একটা শ্বাসের জন্য।
আরেকবার ফিরে আসার জন্য।

কখনো পর্দায় আবার হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দ ফিরে আসে।

কেউ বলে ওঠেন—

“নাড়ির স্পন্দন ফিরে এসেছে!”

সেই মুহূর্তে পরিবারের চোখে জল।

“আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।”

হ্যাঁ—জীবন-মৃত্যুর চূড়ান্ত মালিক মহান আল্লাহ।

চিকিৎসকেরাও সেই বিশ্বাস নিয়েই আবার পরের রোগীর কাছে ছুটে যান।

কিন্তু একই চিকিৎসক, একই নার্স, একই চেষ্টা, একই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া—সবকিছু করার পরও যদি আরেকজন মানুষ ফিরে না আসেন?

তখন কখনো শোনা যায়—

“সিপিআর দিয়েই আমার রোগীকে মেরে ফেলেছে!”

কী নির্মম পরিহাস!

যে হাতটি থেমে যাওয়া হৃদ্‌যন্ত্রের বিরুদ্ধে শেষ লড়াই করছিল, সেই হাতটিই অভিযুক্ত।

যে সিপিআর করা হয়েছিল মানুষটিকে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য, সেই সিপিআর-ই হয়ে গেল মৃত্যুর কারণ!


“আমার রোগী তো ভালোই ছিল!”

এই বাক্যটি আমাদের হাসপাতালগুলোতে আজ খুব পরিচিত।

“নিজের পায়ে হেঁটে এসেছে।”

“আমার সঙ্গে কথা বলেছে।”

“মুঠোফোনে কথা বলছিল।”

“হাসপাতালে আসার আগেও তো ঠিক ছিল!”

কিন্তু হাঁটতে পারা মানেই সুস্থ নয়।

কথা বলতে পারা মানেই বিপদমুক্ত নয়।

সচেতন থাকা মানেই মৃত্যু অনেক দূরে—এমনও নয়।

একজন মানুষ নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতালে ঢুকেই কয়েক মিনিটের মধ্যে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারেন।

একটি তীব্র ও ব্যাপক হার্ট অ্যাটাক মুহূর্তের মধ্যে একজন সচেতন মানুষকে হৃদ্‌যন্ত্রজনিত মারাত্মক রক্তসঞ্চালন ব্যর্থতায় নিয়ে যেতে পারে।

প্রাণঘাতী হৃদ্‌স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা কয়েক সেকেন্ডেই সবকিছু বদলে দিতে পারে।

ফুসফুসের রক্তনালিতে বড় রক্তজমাট, মহাধমনির দেয়াল ছিঁড়ে যাওয়া, শরীরের ভেতরে ব্যাপক রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তনালি বন্ধ হওয়া, সারা শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ—কোনোটিই রোগীকে আগে থেকে সময় দিয়ে বলে আসে না—

“আপনার পরিবারের সঙ্গে শেষ কথাটা বলে নিন, তারপর আমি আসছি।”

হার্ট অ্যাটাক বলে না—

“আর দশ মিনিট পর আপনার হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে।”

হৃদ্‌যন্ত্রের প্রাণঘাতী অনিয়মিত ছন্দ দরজায় কড়া নেড়ে অনুমতি নেয় না।

মানুষের শরীরে কখনো কখনো জীবন আর মৃত্যুর মধ্যকার দূরত্বটা এতটাই ছোট যে, একজন মানুষ একটি বাক্য বলা শেষ করার আগেই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

তাই—

“নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতালে এসেছিল”—এটি কোনো চিকিৎসা-প্রতিবেদন নয়।

এই একটি বাক্যের কাছে হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক পরীক্ষা হারতে পারে না।

রক্তচাপ হারতে পারে না।

রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা হারতে পারে না।

হৃদ্‌যন্ত্রের আল্ট্রাসনোগ্রাফি হারতে পারে না।

রক্ত পরীক্ষার ফল হারতে পারে না।

আর চিকিৎসাবিজ্ঞানও হারতে পারে না।



অথচ অভিযোগের যেন শেষ নেই

শিরায় নল দেওয়ার পর রোগী মারা গেলেন—

“নল দিয়েই শেষ করে দিল!”

ইনজেকশন দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলো—

“কী ইনজেকশন দিল যে সঙ্গে সঙ্গে শেষ!”

অক্সিজেন দেওয়া হলো—

“অক্সিজেন দেওয়ার আগেও তো কথা বলছিল!”

শ্বাসনালিতে নল দেওয়া হলো—

“গলায় নল দেওয়ার পরই তো মারা গেল!”

কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রে নেওয়া হলো—

“মেশিনে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তো মানুষটা বেঁচে ছিল!”

হৃদ্‌যন্ত্রে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হলো—

“বুকে কারেন্ট দিল কেন?”

সিপিআর করা হলো—

“এত জোরে বুক চাপল কেন? বুক চাপতে চাপতেই মেরে ফেলেছে!”

আবার সিপিআর না দিলে—

“ডাক্তার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল কেন?”

শক দিলে সমস্যা।

শক না দিলেও সমস্যা।

কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রে দিলে—

“মেশিনে দিয়েই শেষ।”

কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র না পেলে—

“মেশিনটা পেলে মানুষটা বেঁচে যেত।”

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিলে—

“নিবিড় পরিচর্যায় নেওয়ার পরই রোগী খারাপ হলো।”

নিবিড় পরিচর্যার শয্যা না থাকলে—

“এত বড় হাসপাতালে একটা নিবিড় পরিচর্যার শয্যাও নেই?”

অন্য হাসপাতালে পাঠালে—

“দায়িত্ব নিতে চায়নি।”

না পাঠালে—

“আগেই বড় হাসপাতালে পাঠালে বেঁচে যেত।”

পরীক্ষা করালে—

“শুধু পরীক্ষা করানোর ব্যবসা!”

আর জীবন বাঁচাতে পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা শুরু করলে—

“রিপোর্ট না দেখেই ওষুধ দিল কীভাবে?”

হৃদ্‌যন্ত্রের রক্তনালির পরীক্ষা করলে—

“এত তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা করল কেন?”

না করলে—

“সময়মতো রক্তনালির পরীক্ষা করলে তো বেঁচে যেত!”

রক্তনালিতে জালিকা বসালে—

“এটা সত্যিই দরকার ছিল?”

না বসালে—

“রক্তনালি বন্ধ থাকার পরও জালিকা বসাল না কেন?”

অস্ত্রোপচার করলে—

“অস্ত্রোপচার করেই শেষ করে দিল।”

অস্ত্রোপচার না করলে—

“অস্ত্রোপচার করলেই হয়তো বেঁচে যেত।”

চিকিৎসক তাহলে করবেনটা কী?



একবার সিপিআরের দৃশ্যটা চিকিৎসকের চোখ দিয়ে দেখুন

বিছানায় একজন মানুষ নিথর।

নাড়ির স্পন্দন নেই।

স্বাভাবিক শ্বাস নেই।

হৃদ্‌যন্ত্র পর্যবেক্ষণের পর্দার দিকে তাকিয়ে চিকিৎসক বুঝলেন—সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এখন দীর্ঘ আলোচনার সময় নেই।

এখন প্রতিটি সেকেন্ড একজন মানুষের মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বাঁচানোর সময়।

তিনি বুকের ওপর হাত রাখলেন।

চাপ দিলেন।

আবার চাপ দিলেন।

আবার।

আবার।

বুকের হাড়ে আঘাত লাগতে পারে—তিনি জানেন।

পাঁজরের হাড় ভেঙেও যেতে পারে—তিনি জানেন।

তবুও সিপিআর করতে হয়।

কারণ তখন প্রশ্নটি আর—

“পাঁজর ভাঙবে কি না?”

নয়।

প্রশ্নটি হলো—

“মানুষটিকে আরেকবার ফিরিয়ে আনা যাবে কি না?”

এটাই সিপিআর।

এটা আঘাত করার চেষ্টা নয়।

এটা মৃত্যুর বিরুদ্ধে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মরিয়া প্রতিরোধ।



অথচ হাসপাতালের মৃত্যু যেন অন্যরকম মৃত্যু

বাড়িতে মৃত্যু হলে—

“আল্লাহর হুকুম।”

রাস্তায় মৃত্যু হলে—

“সময় হয়ে গিয়েছিল।”

অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হলে—

“কপালে ছিল না।”

কিন্তু হাসপাতালে মৃত্যু হলে প্রথম প্রশ্ন—

“কী ইনজেকশন দিয়েছিল?”

আর সিপিআর হয়ে থাকলে—

“সিপিআর দিয়ে মেরে ফেলেছে!”

যেন হাসপাতালের দরজা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগের সমস্ত দায় শেষ হয়ে যায়।

যেন হার্ট অ্যাটাকের আর কোনো দায় নেই।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো দায় নেই।

সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক সংক্রমণের কোনো দায় নেই।

মারাত্মক রক্তসঞ্চালন ব্যর্থতার কোনো দায় নেই।

রোগীর আগে থেকে থাকা অসুস্থতার কোনো দায় নেই।

আর জীবন-মৃত্যুর শতভাগ দায় এসে পড়ে সাদা অ্যাপ্রন পরা মানুষটির কাঁধে।



এবার সেই চিকিৎসকের কথাটাও ভাবুন

হয়তো টানা অনেক ঘণ্টা তিনি দায়িত্বে আছেন।

হয়তো জরুরি বিভাগ রোগীতে পরিপূর্ণ।

একদিকে হার্ট অ্যাটাক।

অন্যদিকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া।

আরেকজনের তীব্র শ্বাসকষ্ট।

কেউ মারাত্মক রক্তসঞ্চালন ব্যর্থতায় চলে যাচ্ছেন।

হৃদ্‌রোগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শয্যা নেই।

সাধারণ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র পূর্ণ।

ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী।

একই সময়ে কয়েকজন সংকটাপন্ন মানুষ।

চিকিৎসক কাকে আগে দেখবেন?

নার্স কাকে আগে ওষুধ দেবেন?

কাকে হৃদ্‌রোগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেবেন, যখন একটি শয্যাও খালি নেই?

কাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠাবেন, যখন সেখানেও অপেক্ষমাণ রোগী?

তারপরও যদি কাউকে বাঁচানো না যায়—

ব্যবস্থার ব্যর্থতার কোনো মুখ নেই।

কিন্তু চিকিৎসকের মুখ আছে।

ব্যবস্থার কোনো জামার কলার নেই।

কিন্তু চিকিৎসকের জামার কলার আছে।

তাই বহু বছরের অব্যবস্থাপনা, শয্যাসংকট, জনবলসংকট, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার দুর্বলতা—সব ক্ষোভ কখনো কখনো এসে পড়ে সামনে দাঁড়ানো চিকিৎসকটির ওপর।

আমরা তখন প্রশ্ন করি না—

কেন পর্যাপ্ত হৃদ্‌রোগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র নেই?

কেন পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র নেই?

কেন জরুরি রোগীর জন্য পর্যাপ্ত শয্যা নেই?

কেন হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ এত বেশি?

কেন দেশজুড়ে শক্তিশালী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগের জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা ও সমন্বিত অ্যাম্বুলেন্স সেবা নেই?

এই প্রশ্নগুলো কঠিন।

তাই সহজ লক্ষ্য হয়ে যান চিকিৎসক।



কিন্তু এর পরিণতি আরও ভয়াবহ

ভাবুন, একজন চিকিৎসক হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া রোগীর বুকে হাত রাখছেন।

তাঁর সামনে একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ।

তাঁর মাথায় থাকার কথা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান—

হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দ কী?

বৈদ্যুতিক শক দেওয়া দরকার কি না?

কখন কোন ওষুধ দিতে হবে?

শ্বাসনালি ঠিক আছে কি না?

হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হওয়ার উল্টানো সম্ভব এমন কারণ কোনোটি আছে কি না?

কিন্তু এর পাশাপাশি যদি তাঁর মাথায় আরেকটি প্রশ্ন ঢুকে পড়ে—

“মানুষটাকে বাঁচাতে না পারলে আমার ওপর হামলা হবে না তো?”

সেদিন শুধু একজন চিকিৎসক ভয় পাবেন না।

সেদিন বিপদে পড়বে পরবর্তী রোগীটিও।

কারণ চিকিৎসকের কাছে যদি সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হয়ে যায়—

“রোগী খুব ঝুঁকিপূর্ণ, এখানে রাখা যাবে না। অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান”—

তাহলে শুরু হবে এক অন্তহীন যাত্রা।

উপজেলা থেকে জেলা।

জেলা থেকে বিভাগ।

এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল।

এক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের দরজা থেকে আরেক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের দরজা।

অ্যাম্বুলেন্স ছুটবে।

পরিবার ছুটবে।

আর সবচেয়ে দ্রুত ছুটবে—

সময়।

হার্ট অ্যাটাকে সেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে হৃদ্‌পেশি।

মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হলে হারিয়ে যাবে মস্তিষ্কের কোষ।

মারাত্মক রক্তসঞ্চালন ব্যর্থতায় একে একে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিডনি, মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

শেষ পর্যন্ত হয়তো আবার আমরা বলব—

“আর একটু আগে চিকিৎসা পেলে মানুষটা বেঁচে যেত!”

কিন্তু সেই “আর একটু আগে”-র সুযোগটাই হয়তো আমরা নিজেরাই নষ্ট করে দিয়েছি।



চিকিৎসক ভুল করতে পারেন

হ্যাঁ।

চিকিৎসকের ভুল হতে পারে।

অবহেলাও হতে পারে।

সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।

বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসার নথি দেখুন।

প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ হোক।

প্রয়োজন হলে জবাবদিহি হোক।

চিকিৎসক আইনের ঊর্ধ্বে নন।

কিন্তু একইভাবে এটাও সত্য—

প্রতিটি মৃত্যু চিকিৎসকের ভুল নয়।

প্রতিটি জটিলতা অবহেলা নয়।

প্রতিটি ব্যর্থ পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টা চিকিৎসাগত অপরাধ নয়।

আর—

সিপিআর মৃত্যু ঘটানোর চিকিৎসা নয়; সিপিআর হলো ইতিমধ্যে থেমে যাওয়া জীবনকে ফিরিয়ে আনার শেষ লড়াইগুলোর একটি।

শিরায় নল বসানো হত্যার অস্ত্র নয়।

অক্সিজেন হত্যার অস্ত্র নয়।

ইনজেকশন হত্যার অস্ত্র নয়।

বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র হত্যার অস্ত্র নয়।

কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র হত্যার যন্ত্র নয়।

আর সিপিআর তো নয়ই।

এসব ব্যবহার করা হয় তখন, যখন একজন মানুষের অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন যে চিকিৎসকের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মিনিটে নয়—কখনো কখনো সেকেন্ডে মাপতে হয়।


তাই কোনো দিন যদি আপনার প্রিয় মানুষটির বুকে সিপিআর চলতে দেখেন…

দৃশ্যটি ভয়ংকর।

স্বজন হিসেবে সেটি দেখা অসহনীয়।

আপনার মনে হতে পারে—

“এত জোরে বুক চাপছে কেন?”

কিন্তু সেই মুহূর্তে একটি কথা মনে রাখবেন—

চিকিৎসকের হাত পড়ার আগেই মানুষটির হৃদ্‌যন্ত্র থেমে গেছে অথবা শরীরে কার্যকর রক্তসঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেছে।

চিকিৎসক তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র থামাচ্ছেন না।

তিনি থেমে যাওয়া জীবনটাকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

তিনি হয়তো আপনার প্রিয় মানুষটির নাম জানেন না।

তাঁর পরিবারকে চেনেন না।

তাঁর জীবনের গল্পও জানেন না।

তবুও সেই অচেনা মানুষটির জন্য তিনি বুকের ওপর ঝুঁকে লড়ছেন।

কারণ সেই মুহূর্তে রোগীটি শুধু আপনার স্বজন নন—

তিনি চিকিৎসকেরও রোগী।

আর তাঁকে ফিরিয়ে আনাই তখন চিকিৎসক ও নার্সদের একমাত্র লক্ষ্য।

যদি হৃদ্‌যন্ত্র আবার সাড়া দেয়

আমরা সবাই বলব—

“আলহামদুলিল্লাহ, মানুষটা ফিরে এসেছে।”

আর যদি শত চেষ্টা করেও তাঁকে ফিরিয়ে আনা না যায়—

তাহলে অন্তত এতটুকু বলার মানবিকতা আমাদের থাকুক—

“তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মানুষটিকে আর ফিরিয়ে আনা যায়নি।”

শোক থাকবে।

কান্না থাকবে।

প্রশ্ন থাকবে।

সন্দেহও থাকতে পারে।

অবহেলার অভিযোগ থাকলে তদন্ত অবশ্যই হবে।

কিন্তু শোকের সেই মুহূর্তে চিকিৎসকের গায়ে হাত তুলে, নার্সকে অপমান করে, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ভেঙে কিংবা—

“সিপিআর দিয়ে মেরে ফেলেছে”

বলে আমরা যেন আরেকজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের চিকিৎসার পথ বন্ধ না করি।

কারণ পাশের বিছানায় হয়তো আরেকজন মানুষ অপেক্ষা করছেন।

তাঁরও হৃদ্‌যন্ত্র থেমে যেতে পারে।

তাঁরও সিপিআর লাগতে পারে।

তাঁর জন্যও দরকার হবে এমন একজন চিকিৎসক, যিনি ভয় নয়—চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুকের ওপর হাত রাখতে পারবেন।
-
শেষ কথাটি খুব সহজ

চিকিৎসকের কাজ অমরত্ব দেওয়া নয়।

চিকিৎসকের হাতে জীবনের নিশ্চয়তাও নেই।

তাঁর কাজ—

জীবন বাঁচানোর জন্য জ্ঞান, দক্ষতা, সময় ও সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করা।

সফল হলে রোগী ফিরে আসেন।

ব্যর্থ হলে চিকিৎসকের হাতও কখনো কখনো অসহায় হয়ে থেমে যায়।

সেই থেমে যাওয়া হাতের ভেতরেও কিন্তু একটি পরাজয়ের বেদনা থাকে।

কারণ একজন চিকিৎসকের কাছে মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যা নয়।

অনেক সময় সেটি একটি দীর্ঘ রাতের ব্যর্থ লড়াই।

হৃদ্‌যন্ত্র পর্যবেক্ষণের পর্দায় নিভে যাওয়া একটি ছন্দ।

একটি পরিবারের কান্না।

আর নিজের মনে বারবার ফিরে আসা একটি প্রশ্ন—

“আর কিছু কি করা যেত?”

তাই আমাদের প্রশ্নটি বদলানো দরকার।

প্রশ্ন যেন না হয়—

“আমার সুস্থ রোগীকে ডাক্তার কী করল?”

বরং প্রশ্ন হোক—

“আমার সংকটাপন্ন রোগীকে বাঁচানোর জন্য চিকিৎসক, হাসপাতাল এবং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যথাসময়ে সর্বোচ্চ সুযোগ দিতে পেরেছিল কি?”

এই একটি প্রশ্ন আমাদের অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।

চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনকে মুখোমুখি প্রতিপক্ষ না বানিয়ে একই পাশে দাঁড় করাতে পারে।

কারণ হাসপাতালের জরুরি কক্ষে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষ নেই।

একদিকে চিকিৎসক আর অন্যদিকে রোগীর পরিবার—এমন নয়।

পক্ষ একটাই।

সেই পাশে আছেন রোগীর স্বজন।

সেই পাশেই চিকিৎসক।

সেই পাশেই নার্স।

আর তাঁদের সবার সামনে একটাই প্রতিপক্ষ—

মৃত্যু।

তাই আসুন, চিকিৎসকের হাতটি ভয়ের কারণে থামিয়ে না দিই।

কারণ কোনো এক গভীর রাতে, কোনো এক জরুরি বিভাগে—

সেই হাতটিই হয়তো আমার, আপনার কিংবা আমাদের সবচেয়ে প্রিয় কোনো মানুষের থেমে যাওয়া হৃদ্‌যন্ত্রকে আবার ফিরিয়ে আনার শেষ চেষ্টা করবে।

চিকিৎসকের কাজ জীবন বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
জীবন-মৃত্যুর চূড়ান্ত মালিক তিনি নন।

অধ্যাপক ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম

এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি)
ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ
বিভাগীয় প্রধান, হৃদ্‌রোগ বিভাগ
পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা
সাহিত্য- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত