ইবিএলে শওকতের বেনামি নিয়ন্ত্রণ, নীরব বাংলাদেশ ব্যাংক

যায়াদি রিপোর্ট

আইন-আদালত

একটি ব্যাংকে একজন ব্যক্তি বা পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শেয়ার নিয়ন্ত্রণের আইনি সীমা ১০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে

2026-09-13T12:15:49+06:00
2026-09-13T12:15:49+06:00
বৃহস্পতিবার ● ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
আইন-আদালত
ইবিএলে শওকতের বেনামি নিয়ন্ত্রণ, নীরব বাংলাদেশ ব্যাংক
যায়াদি রিপোর্ট
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম  
ইবিএল’র চেয়ারম্যান মো শওকত আলী চৌধুরী।
একটি ব্যাংকে একজন ব্যক্তি বা পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শেয়ার নিয়ন্ত্রণের আইনি সীমা ১০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে দেখা গেছে, ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী নামে-বেনামে নিয়ন্ত্রণ করেছেন ব্যাংকটির ২০.৪৮ শতাংশ শেয়ার। পরিদর্শন দল তাঁকে বেনামি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার কয়েক মাস পার হলেও ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। শওকত এখনো ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) পরিচালক।

নথি বলছে, শওকতের বিরুদ্ধে বেনামি শেয়ারের মাধ্যমে ইবিএলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অভিযোগ পাওয়ার পর চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল ডেপুটি গভর্নর-৩-এর অনুমোদনে বিশেষ পরিদর্শন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শন দল ইবিএলের শেয়ার রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিকানা, আয়কর নথি, অর্থের উৎস ও পক্ষগুলোর পারস্পরিক লেনদেন পরীক্ষা করে প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করে।

সেই প্রতিবেদনে শুধু অতিরিক্ত শেয়ার নিয়ন্ত্রণের তথ্যই উঠে আসেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখেছে, শওকতের দৃশ্যমান পারিবারিক শেয়ারের বাইরে অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও বড় অংশ তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এগুলোর একটি আরুসা অ্যান্ড কোং (প্রাইভেট) লিমিটেড, অন্যটি আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত শওকত ও তাঁর পরিবারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মালিকানা মিলিয়ে ইবিএলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ২১.১০ শতাংশ। সাম্প্রতিক পরিদর্শনে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ২০.৪৮ শতাংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এক লাখ টাকার আরুসা, তিনশ কোটি টাকার শেয়ার: পরিদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আরুসা অ্যান্ড কোং।

২০০১ সালে মাত্র ১ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। নিবন্ধনের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় এটি ইস্টার্ন ব্যাংকের বড় অঙ্কের শেয়ার ধারন করে।

আরুসা অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ারে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ না করে কেবল ইবিএলের শেয়ার জমিয়েছে। ক্রয় ও স্টক ডিভিডেন্ড মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ইবিএলের শেয়ার দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার ২৯২টি, যা ব্যাংকটির মোট পরিশোধিত মূলধনের প্রায় ৯.৯৭ শতাংশ। বর্তমান বাজারদরে এসব শেয়ারের মূল্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

পরিদর্শনকালে আরুসার পোর্টফোলিওতে ইবিএল ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ার পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত শেয়ার কেনাবেচা করে মুনাফা করা নয়, বরং ইবিএলের শেয়ার নিয়ন্ত্রণে রাখাই ছিল এই বিনিয়োগের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিদর্শন দল।

মাত্র ১ লাখ টাকা মূলধনের কোম্পানিটি ২০০৩ অর্থবছরেই প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা মুনাফা এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্যাপিটাল রিজার্ভ দেখায়। এত অল্প মূলধনের একটি কোম্পানির এত দ্রুত বিপুল মুনাফা ও রিজার্ভ গঠনকে অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কাগজে মালিক নইমুল, নিয়ন্ত্রণ কার: 

আরুসা প্রতিষ্ঠার সময় এক হাজার শেয়ারের ৯৫০টি ছিল নইমুল হকের নামে। বাকি ৫০টি ছিল শওকতের শ্যালিকা আনিকা তেহজীবের নামে।

নথি অনুযায়ী, নইমুল হক শওকতের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংক নইমুলের আয়কর বিবরণী পরীক্ষা করে এমন কোনো সম্পদ বা আয়ের উৎস পায়নি, যা দিয়ে তাঁর পক্ষে ইবিএলের এত বিপুল শেয়ার কেনা বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা সম্ভব বলে ব্যাখ্যা করা যায়।

২০০২ সালে শেয়ার কেনার অর্থের উৎস হিসেবে আরুসার হিসাবে ‘ভেন্ডরস অ্যাকাউন্টে’ ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির নিজস্ব মূলধন, নইমুলের আর্থিক সক্ষমতা এবং শওকতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—সব মিলিয়ে এই বিনিয়োগের প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে পরিদর্শন দল। পারিবারিক যোগসূত্রও ছিল সরাসরি।

নথি বলছে, ২০১৪ সালে আরুসার ৫ হাজার শেয়ার শওকতের মেয়ে জারা নামরীনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত ওই শেয়ার তাঁর নামেই ছিল। পরে সেগুলো নইমুল হকের স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু তার আয়কর নথিতে এই শেয়ার প্রদর্শন করা হয়নি। অর্থাৎ শেয়ারগুলো শওকতের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। 

এই মালিকানা ইতিহাস, অর্থের উৎস, আর্থিক সক্ষমতার অসঙ্গতি এবং শওকতের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়—কাগজে মালিক অন্যরা হলেও আরুসার প্রকৃত বেনামি অর্থায়নকারী ও সুবিধাভোগী মালিক শওকত আলী চৌধুরী।

আরুসার টাকা গেল শওকতের কাছেই:

নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালে জমির বায়না বাবদ আরুসা থেকে ব্যক্তিগতভাবে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা নেন শওকত। কিন্তু ১৩ বছর পরও ওই জমি প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালে আরুসা থেকে আরও ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা যায় এসএন করপোরেশনে। এসএন করপোরেশনের ৫০ শতাংশের মালিক শওকত এবং বাকি ৫০ শতাংশ তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বেরিন।

অর্থাৎ কাগজে শওকতের মালিকানাধীন নয়—এমন প্রতিষ্ঠান আরুসা থেকেই শওকত ও তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে গেছে অন্তত ৩৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

এই অর্থপ্রবাহকেও বেনামি নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছে পরিদর্শন দল।


আরেক পথ আনিকা শেয়ারস:

শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের আরেকটি মাধ্যম হিসেবে আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির হাতে ইবিএলের ১.১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল। পরে সেই অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

কোম্পানিটির ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক হিসেবে জসিম উদ্দিন এবং ২ শতাংশের মালিক হিসেবে শওকতের শ্যালিকা আনিকা তেহজীবের নাম রয়েছে।

আনিকা এর আগে আরুসা অ্যান্ড কোংয়েরও শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক ছিলেন। আরুসার আরজেএসসি নথিতে তিনি চট্টগ্রামের যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন, শওকত ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও বিভিন্ন নথিতে একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।

পারিবারিক সম্পর্ক, আরুসায় আনিকার আগের মালিকানা এবং অন্যান্য নথি মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আনিকা শেয়ারসের কাছে থাকা ইবিএলের শেয়ারের ওপরও শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মালিকানা একত্র করেই শওকতের মোট নিয়ন্ত্রণ ২০.৪৮ শতাংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পরিদর্শন দল।


আইনের প্রয়োগ নেই:

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ক ধারায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা একই পরিবারের সদস্যদের একক বা যৌথভাবে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটি ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণের সুযোগ নেই।

১৪খ ধারায় শেয়ার কেনার সময় ক্রেতাকে ঘোষণা দিতে হয়, তিনি অন্য কারও মনোনীত ব্যক্তি বা বেনামি হিসেবে শেয়ার কিনছেন না।

মিথ্যা ঘোষণা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বিরুদ্ধে বাজেয়াপ্তিসহ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ও বেনামি শেয়ারের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা ও শেয়ারসংক্রান্ত বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২-এর আওতাধীন হওয়ায় শওকতের ১০ শতাংশের অতিরিক্ত শেয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ওই বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে বলার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু এরপরই থেমে গেছে প্রক্রিয়া।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় নির্দিষ্ট অনিয়মে একজন পরিচালককে অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে। অপসারণের পর তিন বছর পর্যন্ত আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়া থেকেও তাঁকে বিরত রাখার সুযোগ আছে।

কিন্তু  বাংলাদেশ ব্যাংক শওকতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, শওকতকে বেনামি শেয়ারগুলো বিক্রি করে দিয়ে সেভ এক্সিট দেওয়ার জন্যই কি বাংলাদেশ ব্যাংক কালক্ষেপণ করছে? 

এদিকে বিশেষ পরিদর্শনে শওকতের সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব  এবং যুক্তরাজ্যে শনাক্ত ২৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারে ব্যর্থতার বিষয়ও সামনে আসে। এসব বিষয়ে বিএফআইইউকে আরও তদন্ত করতে বলা হয়েছে।
আইন-আদালত- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত