প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা সুন্দরবনপাড়ের মানুষ

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

সারাদেশ

ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে নদীর পথে যাত্রা। গন্তব্য সুন্দরবনের কোনো খাল কিংবা গহিন অরণ্য। সঙ্গে মাছ ধরার জাল,

2026-09-25T12:33:37+06:00
2026-09-25T12:33:37+06:00
শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা সুন্দরবনপাড়ের মানুষ
কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম  
ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে নদীর পথে যাত্রা। গন্তব্য সুন্দরবনের কোনো খাল কিংবা গহিন অরণ্য। সঙ্গে মাছ ধরার জাল, কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম কিংবা মধু সংগ্রহের উপকরণ। সামনে অনিশ্চিত জীবিকা, আর পেছনে পরিবার-পরিজনের মুখ। এভাবেই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন সুন্দরবনপাড়ের অসংখ্য মানুষ।

সুন্দরবন তাদের কাছে শুধু একটি বন নয়—এটি জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। আবার সেই বনই তাদের জন্য ভয় ও শঙ্কারও নাম। নদীতে কুমিরের আতঙ্ক, বনের ভেতরে বাঘের ভয়, সঙ্গে নদীর স্রোত ও বৈরী আবহাওয়া। তবুও সংসারের প্রয়োজনে প্রতিদিন সেই ঝুঁকির পথেই পা বাড়াতে হয় তাদের।

উপকূলের এসব মানুষের জীবন যেন প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের এক নীরব যুদ্ধ। একদিকে জীবিকার তাগিদ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার চাপ। তারপরও থেমে থাকে না তাদের জীবনযাত্রা।

একেকটি দুর্যোগ, একেকটি নতুন লড়াই

ঘূর্ণিঝড় এলেই অনেকের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফসলি জমি তলিয়ে যায়, মাছের ঘের ভেসে যায়। দুর্যোগ চলে গেলেও থেকে যায় তার ক্ষত। ভাঙা ঘর মেরামত করে, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে আবার চাষের চেষ্টা করে কিংবা নতুন করে নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে তারা জীবন শুরু করেন।

সিডর, আইলা, আম্পান ও রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মানুষের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে।

লবণাক্ততায় কঠিন হচ্ছে কৃষিজীবন

লবণাক্ততার কারণে অনেক এলাকায় কৃষিকাজও কঠিন হয়ে পড়ছে। যে জমিতে একসময় ধানসহ বিভিন্ন ফসল ফলত, সেখানে এখন অনেক কৃষক উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। জমি অনাবাদি পড়ে থাকায় পরিবারের আয় কমছে।

ফলে কেউ মাছ ধরছেন, কেউ দিনমজুরি করছেন, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ না থাকায় অনেক পরিবারকে মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

চারদিকে পানি, তবুও সুপেয় পানির সংকট

উপকূলের মানুষের আরেকটি বড় সংকট নিরাপদ পানি। চারপাশে নদী-খাল থাকলেও সব পানি পানযোগ্য নয়। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে দূরের উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

পানি সংগ্রহের এই দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ওপরই পড়ে। প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি আনা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে সময় ও শ্রমের পাশাপাশি শারীরিক চাপও বাড়ছে।

নারীদের জীবনেও বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

উপকূলের প্রতিকূল পরিবেশের প্রভাব নারীদের জীবনেও গভীরভাবে পড়ছে। লবণাক্ত পানি, নিরাপদ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং দুর্যোগের পর চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে নারীরা নানা স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।

বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, কিশোরী ও বয়স্ক নারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

পানির সংকটের কারণে নারীদের দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হয়। আবার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য কম থাকলে অসুস্থ হলেও অনেকেই সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। ফলে জীবিকার সংকটের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।

নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা

নদীভাঙন উপকূলের মানুষের কাছে আরেকটি নীরব আতঙ্ক। আজ যে জায়গায় ঘর, কাল সেখানে হয়তো নদী। একটি পরিবার যখন বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা বসতভিটা হারায়, তখন শুধু একটি ঘরই হারায় না—হারায় স্মৃতি, নিরাপত্তা ও পরিচিত পরিবেশ।

অনেকে বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যান। কেউ জেলা শহরে, কেউ বড় শহরে গিয়ে কাজের সন্ধান করেন। কিন্তু নতুন জায়গায়ও জীবন সহজ হয় না। কাজের নিশ্চয়তা, বাসস্থান, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়।

সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে উপকূল

সুন্দরবন উপকূলের মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি যেমন মাছ, কাঁকড়া, মধুসহ নানা সম্পদের উৎস, তেমনি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয়।

তাই সুন্দরবন রক্ষা মানে শুধু বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।

প্রয়োজন টেকসই উদ্যোগ

উপকূলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, লবণসহিষ্ণু কৃষি, টেকসই মৎস্যচাষ, নারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নদীভাঙন রোধ, টেকসই বাঁধ ব্যবস্থাপনা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

সন্ধ্যা নামে সুন্দরবনের নদীতে। ঘাটে দাঁড়িয়ে পরিবারের কেউ অপেক্ষা করেন নৌকাটির জন্য। দূরে নৌকা দেখা গেলেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কারণ সেই নৌকা শুধু একজন মানুষকে নিয়ে ফিরছে না—ফিরছে একটি পরিবারের রাতের খাবার, সন্তানের পড়াশোনার খরচ আর আগামী দিনের ছোট্ট আশাও।

বাঘ-কুমিরের ভয়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়—সবকিছুর মধ্যেও তাই থামে না উপকূলের জীবন।

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেই তারা বেঁচে আছেন, আর প্রতিটি নতুন সকাল তাদের সামনে এনে দেয় আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন লড়াই।
  বিষয়:   কয়রা  সুন্দরবন  যুদ্ধ 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত