ছবি-যাযাদি বাবার ঘরে যে মেয়েটি একদিন স্বপ্ন দেখে ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা প্রতিষ্ঠিত মানুষ হওয়ার, বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলে সেই স্বপ্নই যেন মুহূর্তে নিঃশব্দ হয়ে যায়। শৈশবের হাসি, স্কুলের ঘণ্টা আর বান্ধবীদের সঙ্গে কাটানো দিনগুলো তখন পরিণত হয় সংসারের দায়িত্ব আর অকাল পরিণতির গল্পে।
বাল্যবিবাহ একটি শিশুর জীবন থেকে কেড়ে নেয় শুধু কয়েকটি বছর নয় কেড়ে নেয় নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকারও। তাই একটি বাল্যবিবাহ ঠেকানো মানে শুধু একটি বিয়ে বন্ধ করা নয়; বাঁচিয়ে রাখা একটি জীবন, একটি স্বপ্ন এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। কক্সবাজারে সেই স্বপ্ন রক্ষার লড়াইকে আরও বিস্তৃত করতে বেসরকারি উদ্যোগে চলছে ধারাবাহিক সচেতনতা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার কর্মযজ্ঞ।
লক্ষ্য বাল্যবিবাহের অন্ধকার পেরিয়ে প্রতিটি কিশোরীর জন্য তৈরি করা শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্বপ্নপূরণের আলোকিত পথ।বাল্যবিবাহের এই অন্ধকার থেকে কক্সবাজারকে মুক্ত করে শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এক দৃঢ় অঙ্গীকার ধ্বনিত হলো শহরের সমুদ্রপাড়ের হোটেল সি-গালের কনফারেন্স হলে। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার) সকাল ১০টায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারের অভিজাত হোটেল সি-গাল এর কনফারেন্স হলে বাল্যবিবাহ সমূলে নির্মূলের অনমনীয় প্রত্যয়ে এই বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং সেন্টার ফর কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘বিগ ড্রিম’ ও ‘চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট’ এর এই সমন্বয় সভাটি আয়োজিত হয়।
অনুষ্ঠানে মূল বিষয়বস্তুর ওপর বিস্তারিত বক্তৃতা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি’কস্তা। তিনি তার সাবলীল উপস্থাপনায় ও শুভেচ্ছা বক্তৃতায়বলেন, একটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়। সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে হলে সমষ্টিগত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের 'বিগ ড্রিম' ও 'চাইল্ড সেফটি নেট' প্রকল্প মূলত শিশুদের সেই সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে, যা তাদের অধিকার রক্ষায় প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সহকারী কমিশনার ও বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো: আজাহার উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাল্যবিবাহ কেবল একটি সামাজিক অপরাধই নয়, এটি একটি মেয়ের মৌলিক অধিকার ও স্বপ্নের ওপর নির্মম কুঠারাঘাত। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বাত্মক ভূমিকা রাখছে এবং আগামীর দিনগুলোতেও আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা বজায় থাকবে । তিনি আরো বলেন, আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের এই মহতী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই এবং যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করছি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিভিল সার্জন প্রতিনিধি আসিফ আহমেদ চৌধুরী, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মহাম্মদ সরওয়ার আকবর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুব্রত বিশ্বাস এবং জেলা তথ্য অফিসার মো: আব্দুছ ছাত্তার তারা বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার লড়াই কেবল একটি বিয়ে ঠেকানোর লড়াই নয়; এটি একটি শিশুর শৈশব, শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। একটি কিশোরীর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে বিদ্যালয়ে পাঠানো নয় একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়া। তাই ২০২৭ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, অভিভাবক এবং শিশু-কিশোরদের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারা সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের কক্সবাজার অপারেশনস-এর সিনিয়র ম্যানেজার রোনাল্ড প্রবীর চিসিক। সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের সুন্দর ও নিরাপদ আগামী উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি আমাদের চোখের সামনে আর কোনো শিশুর স্বপ্ন বাল্যবিবাহের বলির পাঁঠায় পরিণত হতে দেব না।
কর্মশালায় মুক্ত আলোচনা পর্বে বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা, শিশু ফোরাম ও যুব ফোরামের সদস্যরা তৃণমূলের বাস্তব চিত্র এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেন। অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং স্পষ্টীকরণ করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন পক্ষ থেকে।
উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী এবং চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্টের অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর জয়শ্রী পিউরিফিকেশন।