সংগৃহীত ছবিপাহাড়ি কৃষির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও তার সুফল কতটা মাঠের কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বান্দরবান পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রকে ঘিরে। গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট, মাঠপর্যায়ে গবেষণার সীমিত কার্যক্রম, কৃষি উপকরণ বিতরণে নথির সঙ্গে বাস্তবতার অসঙ্গতি এবং প্রকল্পের বিল-ভাউচার নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এক দাগে এবং ৬০ লাখ টাকা আরেক দাগে ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার অংশে ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগ উঠেছে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সেলিমের বিরুদ্ধে। এর সঙ্গে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইমাম হোসাইন, বৈজ্ঞানিক সহকারী সুজন দাশ এবং অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক উজ্জ্বল বড়ুয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মচারী বলেন, পাটনার প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি খাতে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং অপর একটি খাতে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করে অবশিষ্ট অর্থের বড় একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, কফি ও কাজুবাদাম প্রকল্পে কর্মরত সাইফুল ও পিয়ালের নিয়োগের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুনে শেষ হয়েছে। তবে নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তারা নিয়মিত অফিসে এসে বিভিন্ন বিল-ভাউচার প্রস্তুত ও স্বাক্ষর করছেন। এসব ক্ষেত্রে আগের তারিখ (ব্যাকডেট) ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ওই কর্মচারী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃষি উপকরণ বিতরণের জন্য সংরক্ষিত রেজিস্টারে অনেক ক্ষেত্রে কোন কৃষককে কী ধরনের এবং কত পরিমাণ উপকরণ দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য লেখা নেই। সংশ্লিষ্ট ঘরগুলো ফাঁকা থাকলেও সেখানে কৃষকদের স্বাক্ষর রয়েছে। বিষয়টি যাচাই করতে রেজিস্টারে স্বাক্ষর থাকা কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো কৃষি উপকরণ দেওয়া হয়নি।
পৌরসভার হাফেজ ঘোনা এলাকার মো: নুরুল আমিন বলেন, স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কী দেওয়া হয়েছে বা কতটুকু দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের জানানো হয়নি। বাস্তবেও কোনো কৃষি উপকরণ পাইনি। আরেক কৃষক জানান, গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের বিভিন্ন উপকরণ দেওয়ার কথা শুনলেও তারা নিয়মিতভাবে তা পান না।
ফলে রেজিস্টারে কৃষকদের স্বাক্ষর থাকা এবং তাদের উপকরণ না পাওয়ার বক্তব্যের মধ্যে যে অসঙ্গতি রয়েছে, সেটি তদন্তের দাবি রাখে। কোন কৃষককে কী উপকরণ দেওয়ার কথা ছিল, তার তালিকা, ক্রয় রেকর্ড, স্টক রেজিস্টার এবং বিতরণের সময়কার নথি যাচাই করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
বান্দরবান জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং মারমা বলেন, পাটনার প্রকল্পের কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প অনুমোদনপত্র, বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়ের কাগজ, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, দরপত্র বা কার্যাদেশ, সরবরাহকারীর বিল, ভাউচার, পণ্য গ্রহণ রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার, কৃষি উপকরণ বিতরণ রেজিস্টার, কৃষক তালিকা, প্রশিক্ষণের উপস্থিতি তালিকা, ফিল্ড ট্রায়াল প্রতিবেদন, প্রকল্পের অগ্রগতি ও সমাপনী প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব নথি ও প্রতিটি বিল-ভাউচার আলাদাভাবে যাচাই করা হলে প্রকল্পের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সেলিমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার অফিসে গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বৈজ্ঞানিক সহকারী সুজন দাশ বলেন, অভিযোগ ও বিল-ভাউচারের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এ বিষয়ে জানতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক উজ্জ্বল বড়ুয়া বিল-ভাউচার প্রস্তুত ও এ বিষয়ে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। তিনি এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
বৈজ্ঞানিক সহকারী পিয়াল নিয়োগের মেয়াদ, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অফিস করা, প্রায় ৬০ লাখ টাকার অংশের বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর এবং ব্যাকডেটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইমাম হোসাইন বলেন, আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি আমার সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেন। অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।