খুলনার বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপে প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানের দানা দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা । ছবি: যাযাদিখুলনায় প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুড়া ধানের দানা দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপে চার ভাস্করের দেড় মাসের পরিশ্রমে নির্মিত এই প্রতিমায় ফুটে উঠেছে কৃষি, প্রকৃতি ও বাংলার ঐতিহ্যের অনন্য মেলবন্ধন। খুলনা নগরীর পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসছেন ব্যতিক্রমী এই শিল্পকর্ম দেখতে।
প্রচলিত মাটি, খড় ও রঙের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধানের দানা ব্যবহার করে দেবী দুর্গার অবয়ব ও প্রতিমার বিভিন্ন কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, খুলনা জেলায় ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির এমন আয়োজন এবারই প্রথম। অভিনব নির্মাণশৈলী ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করেছে।
খুলনা নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজামণ্ডপে প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীদের ভিড়। খুলনার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও কয়রা, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ ও বরিশাল থেকে মানুষ প্রতিমাটি দেখতে আসছেন।
পাইকগাছা থেকে আসা দর্শনার্থী ইন্দ্রারানী সাহা রিতু বলেন, চিনিগুড়া ধান দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করা হয়েছে, বিষয়টি আমার কাছে বেশ ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। প্রতিমার কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বাংলার কৃষি ও ঐতিহ্যকে এভাবে তুলে ধরার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
সাতক্ষীরা থেকে আসা দর্শনার্থী শোভন দেবনাথ বলেন, সাধারণত মাটি দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা দেখা হয়। তবে ধানের দানায় তৈরি এমন প্রতিমা এবারই দেখলাম। প্রতিমার নির্মাণশৈলী ও সৃজনশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এমন আয়োজন দুর্গোৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।
মন্দির পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি রনজিত কুমার রায় বলেন, ধান শুধু খাদ্য নয়, এটি বাংলার মানুষের জীবন, জীবিকা, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সোনালি ধান দিয়ে দেবীর প্রতিমা নির্মাণের মাধ্যমে বাংলার কৃষি ও সংস্কৃতিকে দেবী আরাধনার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সোনালি ধানে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তির প্রতীক নয়, এটি কৃষি, প্রকৃতি ও গ্রামীণ সংস্কৃতিরও অনন্য প্রকাশ। ধান এ দেশের মানুষের জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রনজিত কুমার রায় আরও বলেন, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কৃষকসমাজের অবদানকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, দুর্গোৎসব ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সামাজিক মিলনেরও উপলক্ষ। “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার এই চেতনায় সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করেন তারা। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজামন্দিরে প্রতিবছর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ব্যতিক্রমী আয়োজনের ক্ষেত্রেও মন্দিরটির রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে প্রতিমার সঙ্গে সিংহের গর্জনের শব্দ যুক্ত করে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছিল। সে সময়ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
এবার চিনিগুঁড়া ধানের দানা দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের মধ্য দিয়ে মণ্ডপটি আবারও সৃজনশীল আয়োজনের পরিচয় দিয়েছে। কৃষিপ্রধান বাংলার পরিচিত উপকরণকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরায় প্রতিমাটি দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
এদিকে শনিবার মহাসপ্তমী উপলক্ষে খুলনার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী নবপত্রিকা স্নান ও পূজামণ্ডপে স্থাপনের মধ্য দিয়ে দিনের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকা ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত।
কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদ গাছ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ, এই নয়টি উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। দুর্গাপূজার এই আচারেও প্রকৃতি ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে দেবী আরাধনার যোগসূত্র প্রতিফলিত হয়। মন্ত্রপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ ও আরতির মধ্য দিয়ে দেবীর প্রতি ভক্তি নিবেদন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সন্ধ্যায় ধূপ-প্রদীপ, ঘণ্টা, শঙ্খ ও ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপগুলো।
চিনিগুড়া ধানের দানায় নির্মিত দুর্গাপ্রতিমাটি এবারের শারদীয় উৎসবে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি কৃষি, প্রকৃতি, সৃজনশীলতা ও বাংলার ঐতিহ্যকে একসঙ্গে তুলে ধরার এই উদ্যোগ দর্শনার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।