একই মাঠে মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত গৌরনদীতে

গৌরনদী প্রতিনিধি

সারাদেশ

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজারে একই মাঠে পাশাপাশি দাড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। মাত্র ১০ ফুট

2026-10-20T15:40:17+06:00
2026-10-20T15:40:17+06:00
মঙ্গলবার ● ২০ অক্টোবর ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
একই মাঠে মসজিদ-মন্দির, ৫৪ বছর ধরে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত গৌরনদীতে
গৌরনদী প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৪০ পিএম  
ছবি: যাযাদি
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা এলাকার শেনেরহাট বাজারে একই মাঠে পাশাপাশি দাড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫৪ বছর ধরে চলছে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় কার্যক্রম। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এ সহাবস্থান স্থানীয়ভাবে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মসজিদে আজান শুরু হলে মন্দিরের ঢাকঢোল ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার্চনা। দুর্গাপূজার আয়োজনেও সহযোগিতা করেন স্থানীয় মুসলমানরা। অন্যদিকে ঈদ, বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিবেশীরাও।

সরেজমিনে দেখা যায়, একই মাঠে পাশাপাশি রয়েছে মসজিদ ও মন্দির। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে চলছে পূজার আয়োজন। ঢাকঢোল, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তবে মসজিদে আজান শুরু হলে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় বিরতি দেওয়া হয়। নামাজ শেষে আবার শুরু হয় ধর্মীয় কার্যক্রম।

মন্দিরের পূজারি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, মসজিদে আজান শুরু হলেই আমরা পুরো অনুষ্ঠানে বিরতি দিই। নামাজ শেষ হলে আবার আমাদের কার্যক্রম শুরু করি। আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানে কেউ কারও বিরক্তির কারণ হননি। বরং দুই ধর্মের মানুষই নিজেদের উপাসনালয়কে আগলে রেখেছেন।

স্থানীয় সমাজসেবক মাকসুদ মৃধা বলেন, এখানে সবাই মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করেন। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এভাবেই চলেছেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা পূজা দেখতে মণ্ডপে যাই। আবার ঈদ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরাও আসেন। এটাই আমাদের এলাকার দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধন।

মন্দির কমিটির সভাপতি শংকর চন্দ্র দাস জানান, ১৯৭২ সালে আধুনা শেনের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে একই মাঠে নির্মিত হয় জামে মসজিদ। এরপর থেকে দুই ধর্মের মানুষ পাশাপাশি নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

তিনি বলেন, মন্দিরের মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ। কিন্তু পাশাপাশি অবস্থানের কারণে আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, মুসলমান ভাইয়েরা তাদের ধর্ম পালন করেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে আসছে।

আধুনা শেনের বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কামরুল ইসলাম বলেন, এখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। মসজিদে আজান হলে হিন্দু ভাইয়েরা ঢাকঢোলের আওয়াজ বন্ধ রাখেন। আজান ও নামাজ শেষ হলে আবার তাদের কার্যক্রম শুরু করেন। বছরের পর বছর ধরে এখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন।

স্থানীয়দের মতে, এ সহাবস্থান শুধু দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক আস্থার দীর্ঘ ইতিহাস। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে একে অন্যের পাশে দাড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে সম্প্রীতির শিক্ষা।

গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম বলেন, উপজেলার সরিকল ইউনিয়নের আধুনা গ্রামের একই স্থানে মসজিদ ও মন্দির দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, আমরা এমন একটি সমাজব্যবস্থা চাই, যেখানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ মিলেমিশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করবেন।

আধুনা এলাকার এ চিত্রে ফুটে উঠেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অটুট রেখেও অন্যের বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো সম্ভব, এ এলাকার দীর্ঘদিনের চর্চা তারই উদাহরণ।

প্রায় ৫৪ বছরের এই সহাবস্থান তাই শুধু একটি এলাকার গল্প নয়, বরং সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনের শিক্ষা। আজানের সময় বিরতি দেওয়া কিংবা পূজার আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এখানকার মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় দিয়ে আসছেন।
  বিষয়:   গৌরনদী  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি  মসজিদ  মন্দির  বরিশাল 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
লাভ রোড, ৪৪৬/ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত