ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোফ্রান্সে রাস্তায় চলমান অস্থিরতা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিদেশি নেতা স্টুপিড মন্তব্য করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো। চলতি সপ্তাহান্তে আরো বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি।
কাতার সফরের সময় ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট নির্দিষ্ট করে কারো নাম উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, শনিবারের দাঙ্গার পর তথ্য নিয়ে কারসাজির মাধ্যমে অনেকের কাছ থেকে, এমনকি বিদেশি নেতাদের কাছ থেকেও এমন মন্তব্য এসেছে, যা একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য ও স্টুপিড। এসব মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে ম্যাক্রো বলেন, ‘অন্যদের মধ্যে তিনিও রয়েছেন।’
আমেরিকার মিডটার্ম ইলেকশন সামনে রেখে নিজের রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে প্রচার চালানোর সময় ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য ইমিগ্রান্ট, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের দায়ী করেছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট।
দোহার সাংবাদিকদের ম্যাক্রো বলেন, ‘এ অঞ্চলে কিংবা আটলান্টিকের অন্য পারে— ইলেকশন ক্যাম্পেইনের মধ্যে থাকা কিছু নেতা সরলভাবে এমন সব বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যেগুলো নির্দিষ্ট কিছু মহল স্পষ্টতই ছড়াতে চাইছে। তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারের জন্য আমাদের দেশকে ব্যবহার করছেন। আর আমাদের এর প্রয়োজন নেই। আমাদের এমনিতেই মোকাবিলা করার মতো অনেক সমস্যা রয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি এমন কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে ফ্রান্সে কখনো ঘটেনি— এমন ঘটনার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, ইমিগ্রান্ট ও ইসলামপন্থিদের বিশাল ঢল আমাদের দেশে ঢুকে পড়েছে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
ইসরেলের প্রধান মন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, ফ্রান্স চরমপন্থি ইসলামের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। আগামী সপ্তাহান্তে তার দেশেও ইলেকশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিশ্লেষকরা অবশ্য ফ্রান্সের বিক্ষোভের জন্য ইমিগ্রান্টদের প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করার দাবিগুলো নাকচ করেছেন।
নিজের উত্তরসূরি বেছে নিতে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট ইলেকশনের মাত্র ছয় মাস আগে শুরু হওয়া সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ম্যাক্রো ও তার সরকার। শনিবার দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক দাঙ্গার সময় পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে স্বীকার করেছে সরকার।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভের বেশির ভাগই ছিল শান্তিপূর্ণ। তবে দ্রুতই তা ব্যাপক সহিংসতা ও ব্যাপক লুটপাটে রূপ নেয়। বিশেষ করে প্যারিস, মার্সেই, লিও ও লিমোজ শহরে এই পরিস্থিতি দেখা যায়। লিমোজে শহরের মিউনিসিপালিটি বিল্ডিংয়ে আগুন দেয়া হয় এবং বিল্ডিংটির একাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। আরো বিক্ষোভের আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ।
সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। এর আওতায় থাকবে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এলিসি প্যালেস, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ এবং লুভ মিউজিয়াম ও শজেলিজের মতো টুরিস্টদের কাছে জনপ্রিয় স্থানগুলো। বাস্তিল ও রেপুবলিক স্কয়ার এবং শাতলে-লে-আল শপিং এলাকাতেও সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। গত সপ্তাহান্তে এসব এলাকার মধ্যে শাতলে-লে-আল লুটপাটকারীদের ব্যাপক তাণ্ডবের শিকার হয়েছিল।
এই অস্থিরতার কারণে কয়েকটি দেশ ফ্রান্সে ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে এরই মধ্যে উদ্বিগ্ন আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার ফরাসি সরকারের ১০ বছর মেয়াদি বেঞ্চমার্ক বন্ডের ইল্ড পাচ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ।
গত সপ্তাহান্তের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর অঙ্গীকার করেছেন ম্যাক্রো। তবে এরই মধ্যে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ নামে পরিচিত তৃণমূল পর্যায়ের আন্দোলনকারীরা আগামীকাল শনিবার প্যারিসের কেন্দ্রস্থল দিয়ে মিছিল করার প্ল্যান আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছে। এটি সরকারের জন্য পরবর্তী বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
শিক্ষায় আরো বিনিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনও একই দিনে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া দেশব্যাপী আন্দোলন আবারো জোরদার করতে চাইছেন। তথ্যসূত্র : গার্ডিয়ান