শুক্রবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প -রয়টার্সএক ইলেকশন ক্যাম্পেইনে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুসারীদের বলেন, প্রেসিডেন্ট পদে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার তার রয়েছে। অসংবিধানিক হওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে নামার যে দাবি তিনি বারবার করে আসছেন, আবারো তারই পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি।
আইওয়া স্টেটের সিউ সিটিতে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি না আপনাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হতে যাচ্ছেন। আমার মনে হয় আইনে বলা আছে— যদিও আমি শতভাগ নিশ্চিত নই, কিন্তু আমার মনে হয় আইনে বলা আছে যে আমার আর ইলেকশনে দাড়ানোর অনুমতি নেই।’
ট্রাম্প মূলত আমেরিকান সংবিধানের ২২ নাম্বার সংশোধনীকে মেনে নেন— যা এক জন প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নিষেধ করে— কিন্তু এরপরই তিনি আবারো তার সেই পুরনো ভিত্তিহীন দাবি তোলেন, ডেমক্রেটরা ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে তার কাছ থেকে জয় চুরি করেছিল।
ট্রাম্প হেসে বলেন, ‘তবে একটি বিষয় ভিন্ন : দ্বিতীয়বার ওরা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল, কারণ আমরা মূলত তিনবারই জয়ী হয়েছি। তাই আমার মনে হয় আবার ইলেকশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার আমার আছে। ওরা জালিয়াতি করেছিল বলেই আমার মনে হয় আবারো ইলেকশনে দাড়ানোর অধিকার আমার আছে।’
ট্রাম্প ক্রমাগত ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন যে তিনি আবারো প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন— যা আমেরিকান সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন হবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি তৃতীয় মেয়াদে লড়তে খুবই পছন্দ করবেন। ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসে এক জনসভায় ট্রাম্প উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সম্ভবত আমাদের আরো একটি মেয়াদ পূর্ণ করা উচিত’, এবং দাবি করেন যে এর অধিকার তার রয়েছে।
গত বছর, ট্রাম্পের অফিশিয়াল স্টোর ‘ট্রাম্প ২০২৮’ লেখা ক্যাপ বিক্রি করা শুরু করে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এমনকি জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে সেই ক্যাপটি পরে হাজির হন। তার সহযোগীরা অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দাবিগুলোকে নিছকই কৌতুক হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন।
আমেরিকান হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার মাইক জনসন গত বছর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে লড়ার দাবি তুলে ডেমক্রেটদের পেছনে লাগতে বা ট্রোল করতেই বেশ মজা পান। জনসন আরো জানান, ট্রাম্পকে আবার ইলেকশনে লড়ার অনুমতি দেয়ার জন্য সংবিধানে সংশোধন আনার কোনো সুযোগ তিনি দেখছেন না। কিন্তু ট্রাম্পের বিরোধীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে সত্যিই ভাবতে পারেন।
ট্রাম্প নিজেও আমেরিকান সংবিধান আরোপিত বিধিনিষেধগুলোর কথা স্বীকার করেছেন। এমনকি বৃহস্পতিবার রাতের সমাবেশেও তিনি বলেন, ‘আমি এই বাক্যটি চিরকাল ধরে বিশ্লেষণ করেছি। দুর্ভাগ্যবশত এটি খুবই সংক্ষিপ্ত। এতে অন্য অর্থ বের করার বা ফাকফোকর খোজার সুযোগ নেই বললেই চলে। এতে বলা আছে যে কোনো পরিস্থিতিতেই এবং কোনো কারণেই আপনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ভাবতেও পারবেন না যদি আপনি...।’
ট্রাম্প তার অনুগত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকদের ব্যাপক সমর্থন উপভোগ করেন, নভেম্বর মাসের আমেরিকান মিডটার্ম ইলেকশনে রিপাবলিকানদের আরো বেশি আসন পেতে সাহায্য করার জন্য অনুসারীদের এমনভাবে ভোট দিতে বলেছেন যেন তিনি নিজেই ব্যালটে আছেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নতুন করে তলানিতে গিয়ে ঠেকায় এই ব্যতিক্রমী কৌশলের প্রভাব শেষ পর্যন্ত কি দাড়ায়, তা এখনো দেখার বিষয়।
২৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকিতে ইনডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধ থামিয়েছিলাম, তাও নোবেল পেলাম না
২০২৫ সালে ইনডিয়া ও পাকিস্তানকে যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে আবার দাবি করেছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী এই দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাতের বড় ধরনের বিস্তার তিনি ঠেকিয়েছিলেন উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে।
আগামী ৩ নভেম্বরের মিডটার্ম ইলেকশনের আগে শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক ইলেকশন ক্যাম্পেইনে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি আটটি যুদ্ধ মীমাংসা করার দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমি ইনডিয়া ও পাকিস্তানকে থামিয়েছি। দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ— আমি তাদের থামিয়েছি। বাণিজ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছি। আমি বলেছিলাম, ‘আপনারা যদি এমনটা করেন, তাহলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবেন না, বিপুল অর্থও আয় করতে পারবেন না। আমি আপনাদের উভয়ের ওপর ২৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব, যাতে আপনারা কোনো ব্যবসাই করতে না পারেন।’ এতে তারা খুব বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিল। এরপর তারা গুলি চালানো বন্ধ করে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটে।”
তথাকথিত এই ডিপ্লোম্যাটিক অর্জনের জন্য নোবেল পিস প্রাইজ না পাওয়ার ক্ষোভও তিনি এই সমাবেশে আবারো প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি কি নোবেল প্রাইজ পেয়েছি না।’
গত বছর পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ইনডিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যকার সশস্ত্র সংঘাত তিনি থামিয়েছিলেন বলে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন। তবে নিউ দিল্লি বরাবরই কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার কথা অস্বীকার করেছে।
ইনডিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন সিন্দুর’ চলাকালে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার জন্য পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস (ডিজিএমও) তার ইনডিয়ান সমকক্ষকে অনুরোধ করার পরই ইনডিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল।
গত বছরের ৭ মে ইনডিয়া ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু করেছিল। সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল ইনডিয়ান বাহিনী। ইনডিয়ার সেই হামলায় মূল সন্ত্রাসী লঞ্চপ্যাডগুলোতে আঘাত হানা হয়েছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তানের অনুরোধ পাওয়ার পর ১০ মে এই অভিযান স্থগিত করে ইনডিয়া।
ইরানে আবারো সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত ট্রাম্পের
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা আবারো সামরিক অভিযান চালাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো আবারো ছোটখাটো এপিক ফিউরি অভিযান চালাতে পারি।’
নিউজ এজেন্সি রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের আট মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এদিকে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমেরিকার মিডটার্ম ইলেকশনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এ মন্তব্য করলেন।
এর আগে শুক্রবার হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, আমেরিকা চাইলে দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা হবে, নাকি সংঘাতকে ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে দেয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যা চাই, সবই পাচ্ছি।’
রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের লক্ষ্য ও সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, আমেরিকা মিডটার্ম ইলেকশনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না। এই ইলেকশনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। ইরানে আমেরিকা ও ইসরেলের হামলা এবং লেবাননে ইসরেলি হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তথ্যসূত্র : গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আরব নিউজ