পারস্য উপসাগরের সমুদ্রগর্ভস্থ যোগাযোগ সাবমেরিন ক্যাবলআমেরিকা ও ইসরেল যদি ইরানে আবার হামলা চালায়, তবে পারস্য উপসাগরের সমুদ্রগর্ভস্থ যোগাযোগ সাবমেরিন ক্যাবলে হামলার বিস্তারিত প্ল্যান তৈরি করেছে তেহরান। ইরানের দুই সিনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিউজ এজেন্সি রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ডিপ্লোম্যাটিক আলোচনা ভেস্তে গেলে নতুন কোনো সংঘাতে এই অঞ্চলের সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলগুলো নিশানা হতে পারে বলে ইরানি কর্মকর্তাদের হুশিয়ারি দেয়ার পর এই বক্তব্য এলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের ওই দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা খুব বেশি বিস্তারিত তথ্য দেননি এবং তেহরান কিভাবে বা ঠিক কোথায় এ ধরনের হামলা চালাবে তা বলেননি। তবে তাদের এক জন জানান, হামলার পর মেরামত কাজ ব্যাহত করাই হবে ইরানের লক্ষ্য, যাতে ইন্টারনেট সংযোগসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করা যায়। ওই কর্মকর্তাদের এক জন বলেন, ‘ইরানে হামলা চালানো হলে আর কোনো রেড লাইন থাকবে না... সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবল থেকে শুরু করে গোপন ঘাটিসমেত সামরিক ঘাটি পর্যন্ত।’
ওয়াশিংটনকে আগুন নিয়ে খেলা না করার হুশিয়ারি দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলগুলোতে ইরানের সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং তারা সহজেই এগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদুল্লাহ জাভানি বুধবার (২১ অক্টোবর) জানান, ইরানের অবকাঠামোতে হামলা হলে হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা সাতটি প্রধান ইন্টারনেট ক্যাবল লক্ষ্যবস্তু করতে পারে ইরান।
জাতি সংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) মতে, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। তবে টেলিযোগাযোগ গবেষণা সংস্থা টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক এলান মল্ডিন জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের মাত্র এক শতাংশেরও কম চলাচল করায় ইরানের এমন হামলার বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানকে পৃথক করেছে এবং পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এই বক্তব্যের বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতর ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলে সম্ভাব্য হামলার এই প্ল্যান থেকে বোঝা যায়, ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে এই বিশ্বাস কাজ করছে যে আমেরিকার নতুন সামরিক অভিযানের জবাব আগের চেয়ে আরো কঠোরভাবে দিতে হবে।
শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই চলতি মাসে সতর্ক করে বলেছিলেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণাগারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল অবকাঠামোকে নিশানা করা হতে পারে।
ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্ররা এ ধরনের অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং তাদের সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলের যেকোনো ক্ষতির জন্য তেহরানকে নয়, ওয়াশিংটনকে দায়ী করা উচিত বলে মন্তব্য করেন ইরানের দ্বিতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক এলেক্স ভাতানকা বলেন, নতুন সংঘাত ঠেকানো এবং এই অঞ্চলে উপসাগরীয় সরকার ও আমেরিকান কম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ঝুকিতে পড়ার ভীতি তৈরি করে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এসব হুমকির মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘তেহরান চায় উপসাগরীয় দেশগুলো ও করপোরেট সিইওরা যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন, যাতে তার নীতি তাদের বিনিয়োগ প্ল্যানে যে ঝুকি তৈরি করছে তা তুলে ধরা যায়।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, একাধিক ক্যাবল কেটে দেওয়া হলে ইন্টারনেট সার্ভিস ধীরগতির হতে পারে এবং আর্থিক লেনদেন, ই-কমার্স ও ক্লাউড কম্পিউটিং বিঘ্নিত হতে পারে। মল্ডিন জানান, এর প্রভাব নির্ভর করবে অপারেটররা কিভাবে ইন্টারনেট ট্রাফিক বিকল্প পথে ঘুরিয়ে নেয় এবং বিকল্প সংযোগে কতটা ধারণক্ষমতা রয়েছে তার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধকালীন সময়ে সংযোগ পুনরুদ্ধার করা কঠিন হতে পারে; এ ছাড়া বর্ধিত ইন্সুরেন্স খরচ এবং জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি পেতে বিলম্ব মেরামত কাজকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
হরমুজ প্রণালির তুলনায় লোহিত সাগর আরো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, বিশেষ করে যদি ইরানের সঙ্গে ইয়েমেনের মিত্র হুথিদের সমর্থন থাকে। যদিও তেহরান সেখানে ক্যাবল লক্ষ্যবস্তু করার কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য দেয়নি।
মল্ডিন জানান, ইওরোপ, পূর্ব আফৃকা এবং এশিয়ার মধ্যে ডেটা বহন করে লোহিত সাগর; যার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক চাহিদার প্রায় তিন শতাংশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী ট্রাফিকের প্রায় ১০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
উপসাগরীয় সরকারগুলো তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক হাব হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে প্রযুক্তিতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে, যা আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরো গভীর করেছে। মার্চে ইরানের হামলায় সরাসরি ইউনাইটেড আরব এমিরেটসের দুটি এমাজন ওয়েব সার্ভিসেস স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছিল এবং বাহরাইনে এর একটি স্থাপনার সংলগ্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মার্চে যুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় আইআরজিসি মাইক্রোসফট, গুগল, এপল এবং এনভিডিয়াসহ আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
স্থলভিত্তিক সংযোগগুলো ইন্টারনেট ট্রাফিকের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে; ফলে সক্ষমতা বাড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলো ও আমেরিকান প্রযুক্তি কম্পানিগুলো অতিরিক্ত অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করছে। মাইক্রোসফটের প্ল্যান রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে মিডল ইস্ট জুড়ে সমুদ্রগর্ভস্থ ও স্থলভিত্তিক সংযোগে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করার। তথ্যসূত্র : রয়টার্স