সংগৃহীত ছবিআমেরিকার মিডটার্ম ইলেকশনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে সুনির্দিষ্ট প্ল্যান তৈরি করেছে আমেরিকান ও ইসরেলি সামরিক বাহিনী। আমেরিকান কর্মকর্তারা এবং প্ল্যান সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি আমেরিকান নিউজ মিডিয়া নিউ ইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছে।
স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক ও তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর প্ল্যান এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরেলের সামরিক বাহিনী তাদের সামরিক মহড়াও বাড়িয়েছে। হামলার কৌশল অনুশীলনের জন্য তারা ইরাকের আকাশসীমার ওপর দিয়ে ফাইটার জেট উড়িয়েছে। আমেরিকান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন হামলার বিষয়ে আলোচনা করতেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে ইসরেলে প্রধান মন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিটিং করেন।
সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং মিসাইল ও ড্রোনের ভাণ্ডার। কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, আরো এক দফা বড় ধরনের হামলা ইরানের অর্থনীতিকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাতের পর তেহরান ডিপ্লোম্যাটিক আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা ফেব্রুয়ারি থেকে এপৃল পর্যন্ত চলা আমেরিকা ও ইসরেলের প্রথম দফার তীব্র হামলার চেয়ে বেশি সফল হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ওই সময়ের সংঘাত বিশ্ব জুড়ে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছিল, মিডল ইস্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল করেছিল এবং মিসাইল প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতের ওপর পেন্টাগনের চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হামলার অনুমোদন দেবেন কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। চলতি বছর তিনি একাধিকবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর প্ল্যানে ভেটো দিয়েছেন। চলতি মাসেও এমনটি ঘটেছে, যখন আমেরিকান ও ইসরেলি সামরিক বাহিনী হামলা চালানোর জন্য প্রায় পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
অক্টোবরের শুরুতে ইরানে হামলার প্ল্যান ছিল নেতানিয়াহুর, বানচাল করেন ট্রাম্প
বাইডেন প্রশাসনের সময় পেন্টাগনের মিডল ইস্ট বিষয়ক নীতির শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডানা স্ট্রুল বলেন, ‘যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে বিষয়টি স্পষ্ট যে, এখন পর্যন্ত পরিচালিত প্রচলিত সামরিক অভিযান, বর্তমানের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আমেরিকান নৌ অবরোধ কোনোটিই ইরানি সরকারকে অর্থবহভাবে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।’
বর্তমানে ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসিতে কর্মরত স্ট্রুল বলেন, ‘ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু কেউই এখনো এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি তুলে ধরতে পারেননি, যা ব্যাখ্যা করে যে— আরো যুদ্ধ কিভাবে এই কৌশলগত সংকটের সমাধান করবে, বিশেষ করে এমন এক অঞ্চলে যেখানে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে।’
ইসরেলের ইলেকশন নতুন যুদ্ধের প্ল্যানে জটিলতা তৈরি করতে পারে
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরেলে ইলেকশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই ইলেকশন নতুন সামরিক প্ল্যানে জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু ইলেকশনে হেরে গেলে তিনি অন্তর্বর্তী প্রধান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সে অবস্থায় তার পক্ষে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা কঠিন হবে।
তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, আমেরিকা ও ইসরেলের আসন্ন যৌথ হামলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য হতে পারে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা, যার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ আরো দীর্ঘ করতে পারবেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরেলে হামলা চালানোর পর নেতানিয়াহু একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেছিলেন। সে সময় বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে যুদ্ধকালীন মন্ত্রী সভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে তারা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারেন।
ইসরেলি রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং নেতানিয়াহুর জীবনী গ্রন্থের লেখক মাজাল মুয়ালেম বলেন, ‘তিনি এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি বৃহত্তর জরুরি সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন। তবে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে গভীরভাবে সন্দেহ করবেন। ইরান যদি হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতি এক রকম হবে। কিন্তু নিজে থেকে আক্রমণ শুরু করা তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।’
আমেরিকার হুমকির জবাবে এবার ‘ফাদার অফ অল বোম্বস’ আনার ঘোষণা ইরানের
ইরানের ইসলামি রিভলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরান ‘ফাদার অফ অল বোম্বস’ নামে নতুন অস্ত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) তিনি এ কথা জানান। ইরানের ইয়ুথ জার্নালিস্টস ক্লাব নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বক্তব্যে হোসেইন মোহেবি বলেন, “আমরা ‘ফাদার অফ অল বোম্বস’ এর শেষ ধাপে রয়েছি। এটি শত্রুর জন্য একদম নতুন একটি চমক হতে যাচ্ছে।” তবে এই অস্ত্র সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য জানাননি।
এর আগে গত শুক্রবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার জন্য জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোম— বা ‘মাদার অফ অল বোম্বস’ ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। প্রায় নয় হাজার ৮০০ কেজি ওজনের এই জিবিইউ-৪৩/বি আমেরিকান সামরিক বাহিনীর অন্যতম সর্ববৃহৎ নন-পারমাণবিক বোমা। ২০১৭ সালের এপৃলে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে আইএস (দায়েশ) জঙ্গি গোষ্ঠীর একটি টানেল নেটওয়ার্কে এটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছিল।
কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করে মোহেবি আরো জানান, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরেলের মধ্যে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের মিসাইলের সংখ্যা দেড় গুণ বেড়েছে। তিনি যোগ করেন, ‘মিসাইলের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং এগুলোর পাল্লা, ধ্বংস ক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুতে নিখুত আঘাত হানার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না শিগগিরই কিছু একটা ঘটবে : ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা কোনো ধরনের সমঝোতা আলোচনায় বসছে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে খুব শিগগিরই এক বা অন্যভাবে কিছু একটা ঘটবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। বুধবার (২১ অক্টোবর) সাউথ ক্যারোলাইনায় এক ইলেকশন ক্যাম্পেইন শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমার মনে হয় আমরা কোনো আলোচনা করছি না। তবে শিগগিরই কোনো না কোনোভাবে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’ ইলেকশনের ইঙ্গিত টেনে তিনি আরো বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষই মনে করছে, যা ঘটার তা ইলেকশনের পরই ঘটবে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়।’ তথ্যসূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস, আনাদোলু এজেন্সি, সিএনএন, আল জাজিরা