পাচ জেলায় সিড ভিলেজ তৈরির উদ্যোগ

যাযাদি রিপোর্ট

বিজনেস

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাত পুনরুদ্ধার, কৃষকের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে

2026-10-25T00:00:00+06:00
2026-10-25T15:39:05+06:00
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
বিজনেস
পাচ জেলায় সিড ভিলেজ তৈরির উদ্যোগ
যাযাদি রিপোর্ট
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৫.১০.২০২৬ ৩:৩৯ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাত পুনরুদ্ধার, কৃষকের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা বাড়াতে দেশের পূর্বাঞ্চলে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘বীজ প্রযুক্তি গ্রাম’ বা ‘সিড ভিলেজ’। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) বাস্তবায়িত ‘বাংলাদেশ সাসটেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি পৃপেয়ার্ডনেস এন্ড রেসপন্স প্রজেক্ট (বি-স্ট্রং)-এগৃকালচারাল সিস্টেম রিস্টোরেশন কমপোনেন্ট’-এর আওতায় নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৪০টি উপজেলায় এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের নিজস্ব বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় বীজ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পূর্বাঞ্চলের বন্যা কবলিত এলাকার কৃষকদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে সহায়তা করা। এ লক্ষ্যে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন ২ শতাংশ বৃদ্ধি, অন্তত ৩০ শতাংশ নারীসহ কৃষক ও উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা উন্নয়ন এবং জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুকি হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বীজ গ্রামের কাঠামো
যেসব এলাকায় দুই মৌসুমে ধান এবং এক মৌসুমে গম, ডাল, তেল ও মসলা ফসল চাষের সুযোগ রয়েছে, সেসব এলাকাকে বীজ প্রযুক্তি গ্রাম স্থাপনের জন্য নির্বাচন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় ধান, গম, ডাল, তেল ও মসলা ফসলের জন্য প্রাথমিক ভাবে অন্তত তিনটি করে বীজ প্রযুক্তি গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। বীজ উৎপাদনে উন্নত মানের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন বীজ এবং বারি, বৃ, বিনা, বিএডিসি ও বিএইউ সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত জাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এর ফলে কৃষকরা উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন, ব্যবহার ও সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন।

ফসল-ভিত্তিক প্রদর্শনী ও কৃষকের অংশগ্রহণ
বীজ উৎপাদনের প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য ফসল-ভিত্তিক প্রদর্শনীর জমির পরিমাণ এবং কৃষকের অংশগ্রহণ নির্ধারণ করা হয়েছে। ধানের ক্ষেত্রে ১০ বিঘা জমিতে দুই মৌসুমে মোট ২০ বিঘা জমিতে আবাদ করা হবে, যেখানে অংশ নেবেন ৫-১০ জন কৃষক। গম, ডাল ও তেল জাতীয় ফসলের প্রতিটির জন্য ৩ বিঘা জমি নির্ধারণ করা হয়েছে; প্রতিটি প্রদর্শনীতে অংশ নেবেন ১-৩ জন কৃষক। ডাল জাতীয় ফসলের মধ্যে রয়েছে মসুর, মাষকলাই, মুগ, খেসারি ও ফেলন; তেল জাতীয় ফসলের মধ্যে রয়েছে সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য ফসল। অন্যদিকে পেয়াজ, মরিচ, ধনিয়াসহ মসলা ফসলের প্রদর্শনীর জন্য ১ বিঘা জমি নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে অংশ নেবেন ১-২ জন কৃষক। এ ধরনের প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকরা উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন, ফসল ব্যবস্থাপনা এবং বীজের গুণগত মান বজায় রাখার আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।

বীজের গুণগত মান ও উৎপাদনমান বজায় রাখতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (এসসিএ) এবং প্রকল্পের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছেন। প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে অন্তত তিন বার রোগিং বা অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের গাছ অপসারণ, সঠিক দূরত্ব বজায় রেখে চারা রোপণ, আইসোলেশন ডিস্ট্যান্স বা স্বাতন্ত্র্যকরণ দূরত্ব নিশ্চিত করা, আগাছা দমন এবং সুষম সার প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কার্যক্রম অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্য মতে, অনুকূল আবহাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে নির্ধারিত বীজ উৎপাদন কার্যক্রম থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানসম্মত বীজ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাক্কলিত উৎপাদনের হিসাব অনুযায়ী, ২ হাজার ৪০০ বিঘা জমি থেকে ধানের বীজ ১ হাজার ৪৪০ মেটৃক টন, ৩৬০ বিঘা থেকে গমের বীজ ১৩৫ মেটৃক টন, ৩৬০ বিঘা থেকে ডাল জাতীয় ফসলের বীজ ৭২ মেটৃক টন এবং ৩৬০ বিঘা থেকে তেল জাতীয় ফসলের বীজ ৫৭.৬০ মেটৃক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ ছাড়া ১২০ বিঘা জমি থেকে মসলা ফসলের বীজ ৪.৮ মেটৃক টন এবং ১২০ বিঘা জমি থেকে ১২০ মেটৃক টন কন্দ উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বীজ সংরক্ষণে আধুনিক সরঞ্জাম ও তথ্য ব্যবস্থাপনা
উৎপাদিত বীজের গুণগত মান বজায় রাখা এবং দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে ময়েশ্চার মিটার, বীজ সংরক্ষণ পাত্র, ত্রিপাল, বস্তা সেলাই যন্ত্র, সিলার মেশিন, ওজন পরিমাপক যন্ত্র এবং বস্তা বা প্যাকেট সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নির্ধারিত সংরক্ষণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বীজ প্রযুক্তি গ্রামে অন্তত ২ হাজার ৫০০ কেজি ধান বীজ, ৬০০ কেজি গম বীজ, ২০০ কেজি ডাল বীজ, ১০০ কেজি তেল বীজ এবং ২ কেজি পেয়াজ বীজ অথবা ২০০ কেজি পেয়াজের কন্দ সংরক্ষণ করবেন কৃষকরা।
এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বীজের লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ। কোন কৃষক কার কাছে কত পরিমাণ বীজ বিক্রি বা বিনিময় করছেন, তা নিবন্ধনে লিপিবদ্ধ করবেন সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও)। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ত্রৈ মাসিক ভিত্তিতে প্রকল্প কার্যালয়ে পাঠানো হবে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিক্রি ও বিনিময়ের একটি তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে। ভবিষ্যতে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বীজের সংকট দেখা দিলে সরকারের পক্ষে স্থানীয় পর্যায় থেকেই বীজ সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কোন কৃষক কার কাছে কত বীজ বিক্রি বা বিনিময় করছেন, তা নিবন্ধনে লিপিবদ্ধ করবেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (এসএএও)। ত্রৈ মাসিক ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রকল্প কার্যালয়ে পাঠানো হবে, যা পরবর্তীতে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সরকারের জন্য স্থানীয় পর্যায় থেকে সরাসরি বীজ সংগ্রহের দারুণ সুযোগ তৈরি করবে। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির খান বলেন, এই উপজেলাটি লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার মাটি কৃষি কাজের জন্য খুবই উপযোগী এবং এখানকার ফসলের নিবিড়তা অনেক বেশি। কৃষকরা এসব জমিতে স্বাভাবিকভাবেই দুই থেকে তিনটা ফসল আবাদ করে থাকে। সঠিক পরামর্শ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া গেলে- তা আরো বাড়ানো সম্ভব। যেহেতু ভালো মানের বীজ প্রাপ্তি সকল মৌসুমেই কৃষকের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। তাই কৃষক যদি নিজের উৎপাদিত ফসল হতে নিজেই বীজ সংরক্ষণ করে তবে ভালো মানের বীজ প্রাপ্তি নিয়ে যে সমস্যা তা নিরসন হবে। একই উপজেলার কৃষক আবু আহম্মেদ বলেন, আমরা এখন নিজেই নিজেদের বীজের চাহিদা পূরণ করে অন্য কৃষকদের বীজ সরবরাহ করতে পারছি। কৃষক আরো বলেন,এই সীড ভিলেজের মাধ্যমে ভালো মানের বীজের ঘাটতি পূরণ হবে। আগে আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ কিনে প্রতারিত হতাম। এখন এই সমস্যাটি এক মাত্র বীজ প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব।

বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বীজ প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে গুণগত ও মানসম্মত বীজ উৎপাদক গ্রুপ গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি শুধু একটি সাময়িক কৃষি উদ্যোগ নয় বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় কৃষকদের নিজস্ব বীজ উৎপাদক ও বিক্রেতা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।’

বিজনেস- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত