ছবি-যাযাদি সাভারের একটি মহিলা মাদ্রাসার ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক পলাতক থাকলেও সহযোগিতার অভিযোগে তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রীর দাদা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। তবে এর একদিন পরই মাদ্রাসায় ভাংচুর, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ এনে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছেন পলাতক শিক্ষকের ছেলে মো. উমায়ের।
২১ অক্টোবর রাতে ঘটনার পর ২৫ অক্টোবর (রোববার) দুপুরে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা বোর্ড বেফাক এর উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ পরিদর্শন করেন সাভারের কালিয়াকৈর এলাকার তোহফাতুল জান্নাহ মহিলা মাদ্রাসাটি।
এর পরের দিন ২৬ অক্টোবর (সোমবার) সকালে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের ছোট কালিয়াকৈর বাজার এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বিভিন্ন প্লেকার্ড ও ব্যানার হাতে নিয়ে মানববন্ধন করেন। এ সময় স্থানীয়রা ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে, এর আগে পার্শ্ববর্তী এলাকা বাগনি বাড়ি সহ দুটি এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন।
ধর্ষণের মামলার বিবরণ মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার সকাল ১০টার দিকে ভুক্তভোগী শিশুটি জুতা আনতে নিচতলায় গেলে মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক (৫০) তাকে একটি কক্ষে নিয়ে মুখ চেপে ধরে ধর্ষণ করেন এবং শিক্ষকের স্ত্রী (৪০) ঘটনাটি কাউকে না জানাতে হুমকি দেন। পরবর্তীতে শিশুটি কান্নাকাটি করে বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে ঘটনাটি জানালে স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসায় এসে শিক্ষকের স্ত্রীকে আটক করেন। তবে এর আগেই প্রধান শিক্ষক পালিয়ে যান। এ ঘটনায় বুধবার দিবাগত রাতে শিশুটির দাদা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষকের স্ত্রীকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে।
পাল্টা মামলার অভিযোগ অন্যদিকে, পলাতক শিক্ষকের ছেলে মো. উমায়েরের দায়ের করা মামলায় দাবি করা হয়েছে যে, গত বুধবার সন্ধ্যায় আক্তার, মনসুর, আব্দুর রহিম, সালমা, শাহ আলম ও শাহাজউদ্দিনসহ ১০-১৫ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসায় হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করেন। হামলায় নগদ ৪৭ লাখ টাকা, ১২ ভরি সোনা, জমির দলিল, পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ মোট ৭৭ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইস্রাফিল খোকন যায়যায়দিনকে বলেন, 'গতকালকে এ ব্যাপারে যারা ইসলামিক ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ আসছে,— উনাদের উচিত ছিল আগে ভিকটিম মেয়েটিকে দেখার। ভিকটিম মেয়েটির পরিবারকে আগে সান্ত্বনা দেওয়া। তাদের যাওয়া উচিত ছিল বক্তব্য কি পরিবারের কাছে, উনারা যায় নাই। না যাইয়া কী করছে? উনারা আসছে মাদ্রাসা পরিদর্শনের জন্য। এই মানুষটির জঘন্যতম কর্মকান্ড ঘটিয়েছে। এটা কিন্তু আসলে আমরা মেনে নিতে পারি না। ইসলামের বড় কর্তৃপক্ষ যারা উনাদের উচিত ছিল যে আগে ভিকটিমের কাছে যাওয়া। কিন্তু এই কাজটা করে নাই। আমাদের এলাকাবাসী এজন্য উনাদের প্রতি খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করছি। উনাদের এই কাজটা করা ঠিক হয় নাই'।
স্থানীয় আরেক নারী বাসিন্দ এবং এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর মা বলেন, "আমি একজন কন্যা সন্তানের মা হিসেবে বলছি। আমার কন্যা সন্তানও এই মাদ্রাসায় পড়ে। এখানে এরকম জঘন্য ঘটনা এগুলা আমরা নিন্দা জানাই। এর ফাঁসি চাই। ধর্ষক এখনো গ্রেপ্তার হয় নাই। আর ধর্ষক গ্রেপ্তার না হলে আমরা মেয়ের মা ও মেয়ের বাবা যারা আছি আন্দোলন চালিয়ে যাবো। ধর্ষককে পাও মাত্র ইসলামিক আইনে বিচার করা হোক সেই দাবি জানাচ্ছি। কারণ উনি একজন লেবাসধারী ইসলামিক। আমাদের নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পোশাকধারী, দাড়ি সুন্নাহর পোশাকধারী হয়ে কেন এ সব কাজ করছে? তাকে ইসলামিক সুন্নাহ মতাবেক বিচার করা হোক'।
তোহফাতুল জান্নাহ মাদ্রাসার পাশের বাড়ির একজন প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় নারী যায়যায়দিনকে বলেন, 'রাত্রে বেলা প্রায়ই কালো প্যারাডো, হাইজ গাড়ি আসে। রাইত দুইটা থেকে তিনটা এরকম সময়ে প্রায়ই গাড়ি আহে।আবার ফজরের আজান দেয়ার আগেই গাড়ি চইলা যায়। এই প্রতিবেশী নারী বলেন, 'বাড়ীর পাশে তো শব্দ পাই গাড়ি আইলে। তখন দরজা খোইলা দেখি হাইজ গাড়ি। সাদা একবার আহে, আরেকবার কালো আহে। পরে অনেক রাত্রে চিৎকারের শব্দও আহে।
তিনি বলেন, 'আমরা অবাক হই যে, এতো রাত্রে এরকম মাদ্রাসায় এতো বাত্তি জ্বালায়, আবার মাঝেমধ্যে হাওমাও শব্দ আসে। মেয়েদের শব্দ আসে। এরকম মাদ্রাসা শুরু হইছে থেকে আমরা দেখতাছি এই গাড়ি আসা।
তিনি বলেন, 'যদি জিজ্ঞেস করি, ম্যাডাম কিসের জন্য গাড়ি আসে এত রাত্রে? কয়, আমার বাসায় মেহমান আসে'। প্রত্যক্ষদর্শী ঐ নারী বলেন, 'আমার মেয়েরে এই মাদ্রাসায় দিছি, ম্যাডামের ব্যবহারটা অনেক খারাপ, মানে বলার বাহিরে। খুব খারাপ ব্যবহার করে। জীবনে হাসি দেখি নাই'।
তোহফাতুল জান্নাহ মাদ্রাসার সাবেক নারী শিক্ষার্থী মানববন্ধনে যোগ দিয়ে দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, "আমি তখন ষষ্ঠ ক্লাসের ছাত্রী ছিলাম। এরকম ঘটনা আগেও ঘটেছিল। এই কারণে আমরা মূলত মাদ্রাসা ত্যাগ করেছি। আমরা ঐ হুজুরের ফাঁসি চাই। আমরা চাই এগুলা মাদ্রাসা থেকে মুক্ত হোক। সে আরও বলেন, যখন আমি এখানে পড়তাম তখন হুজুর বিভিন্ন ছাত্রীকে ঘরে নিয়ে যাইতো, আর চুমু দিতো, গায়ে হাত দিয়েন। এরকম ঘটনা ঘটছে আমরা শুনেছি, এবং আমরা নিজ চোখেও দেখছি'।
এছাড়া এলাকার তরুণ শাওন মানববন্ধনে যোগ দিয়ে জানান, এলাকার বিভিন্ন মেয়েদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় এবং এর প্রতিবাদ করায় উল্টো এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রায় ৭৪ লক্ষ টাকা ক্যাশ, ১০ ভরি স্বর্ণ ও প্রায় ৭০ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র লুটের অবাস্তব অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ধরনের মিথ্যা মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া লোকজন প্ল্যাকার্ড হাতে বিভিন্ন স্লোগান দেন, যার মধ্যে ছিল—“আমার সোনার বাংলায় ধর্ষকদের ঠাই নাই”, “ধর্ষণের চামড়া তুলে নেব আমরা”, “অবিলম্বে ধর্ষকের ফাঁসি চাই”, এবং “ধর্ষণ নয়, সম্মান চাই”। স্থানীয়রা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।
মাদ্রাসায় নিয়মিত ধোয়া মোছার কাজ করেন তানজিলা, সে দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, "আমি ঘটনার দিন নিচতলায় কাপড় ধুতে আসছি। যেই রুমে আমি কাপড় ধুই, এই রুমেই এই ঘটনা ঘটছে। কাপড় ধুইতে যাইয়া দেখি ঘর ছিটকানি মারা ভিতর দিয়ে। ডাকাডাকির ১০ মিনিট পরে দরজা খুলছে। খুইলা বড় হুজুর কয়— 'কী হইছে?' দেখি সেই সময় অস্থির হয়ে হাঁপাইতাছে হুজুরে। কয়— 'আমি ১০ মিনিট পরে বাইর হইতাছি, তুমরা উপরে যাও।' আমি কিছুদূর আইয়া হেয়ানে আবার ঘুইরা গেছি। কারণ এর আগে একটা মেয়ের সাথে এরকম করছে, ঐ মেয়ে আমারে বলছিল জাকিয়া নাম, গাজীপুর থাকে, এখন চইলা গেছে ও।
এসময় গৃহ পরিচালিকা তানজিলা বলেন, 'আমি হুজুরের হাবভাব দেখে ভয় পাইয়া গেছি। পরে পর্দার আড়ালে দাঁড়াইয়া, দেখি মারুফারে ঘর থেকে বাইর কইরা দিছে হুজুরে। মারুফা আইসা আমার কাছে দাঁড়াইছে, মারুফার শরীরে ধুলা। খাটের নিচে ঢুকায়ে দিছিল, যেই সময় আমি দরজায় নক করছিলাম।
তানজিলা বলেন, 'মারুফারে জিজ্ঞাসা করি— 'কিরে মারুফা, তুই ওইদিক কই গেছিলি? তোর শরীরে এত ধুলা কেন? এহানে তো ময়লার কোনো কাজ নাই। তুই কী কাজ করতে গেছিলি ওইদিক?' আমি বলছি, 'বল, সমস্যা নাই, আমারে বল, কী হইছে?' তখন আমারে জড়াইয়া ধরে কাইন্দা কয় 'হ বড় হুজুর আমার সাথে অনেক কিছু করছে।' পরে আমি ডাইরেক্ট জিগাইছি, 'তোর কি পায়জামা খুলছে? তোর সাথে কিছু করছে?' ও ডাইরেক্ট বলছে, 'হ, পায়জামা খুলছে, আমার সাথে করছে।' তো আমি কই, 'তুই কি কি কিছু বুঝছস? তোর ভিতরে কিছু গেছে?' কয়, 'এইডা আমি কইতে পারি না, কিন্তু আমার সাথে অনেকক্ষণ করছে।' পাঁচ-দশ মিনিটের মতো আমার সাথে করছে।
গৃহকর্মী তানজিলা বলেন, 'পরে বড় ম্যাডামরে ডাইকা আনছি, আর বলছি এই মাইয়ার লগে এমন কাম কেমনে করল?' দেখেন তো এই মাইয়াডার শরীরডারে কী করছে? মাইয়াডা সোজা হইয়া দাঁড়াইতেই পারে না, বাঁকা হইয়া রইছে। এইডা কোনো কাম করল?
হুজুরের বউ ম্যাডাম মাইয়াটারে ধইরা কয়, 'খালাম্মার সম্মানটা তুমি রাখো, খালাম্মার সম্মানটা রাখো। তুমি কারোরে কিচ্ছু কইও না।' চুপ করে থাকো, কাইন্দো না। চুপ করে থাকো, খালাম্মার সম্মানটা রাখো। আমি দেখতাছি। পরে বড় হুজুর ডাইরেক্ট অস্বীকার। কয়, 'আমি এগুলা কিচ্ছু করছি না।' কুরআন মাথায় দিয়া কয়, 'আমি এগুলা কিচ্ছু করছি না।' আমি গোসল করতে গেছিলাম, গোসল থেকে বাইর হইছি— সব ষড়যন্ত্র'।
মানববন্ধনে উপস্থিত স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, শিশু ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে মাদ্রাসার অফিস কক্ষসহ কিছু আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে এবং শিক্ষকের স্ত্রী ও সন্তানকে একটি কক্ষে আটকে রেখে পরে পুলিশের জিম্মায় দেন।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, শিশুটির দাদার দায়ের করা ধর্ষণ মামলায় মাদ্রাসার মালিকের স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে মালিকের ছেলের দায়ের করা ভাংচুর ও লুটপাটের মামলাটিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে।