ছবি-যাযাদি নিরাপদে মহাসড়ক পারাপারের জন্য নির্মিত ফুটওভার ব্রিজ। অথচ সেই ব্রিজের ওপরই বসেছে দোকানের সারি। কোথাও কাপড়, কোথাও জুতা, ফল, কসমেটিকস, খেলনা কিংবা খাবারের পসরা। পণ্যসামগ্রী আর দোকানের ফাঁক গলে কোনোমতে চলাচল করছেন পথচারীরা। ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নিরাপত্তার কথা ভেবে যে ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিই এখন সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডের পেন্নাই এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নির্মিত ফুটওভার ব্রিজের চিত্র এটি। আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) সরেজমিনে ব্রিজটিতে কসমেটিকস, ফ্লেক্সিলোড, ফল, ব্যাগ, কাপড়, জুতা, খেলনা ও খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান নিয়ে প্রায় ১৫ জন হকারকে ব্যবসা করতে দেখা যায়।
ব্রিজটির আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং একাধিক সড়কের সংযোগস্থল। এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী, রোগী, স্বজন ও কর্মজীবী মানুষের একটি অংশের চলাচলের জন্য ব্রিজটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দোকানপাটের কারণে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারীরা। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে ব্রিজ পার হতে গিয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
তবে এই দখল ঘিরে শুধু জনদুর্ভোগ নয়, উঠেছে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন হকার জানান, ব্রিজের ওপর দোকান বসিয়ে ব্যবসা করতে তাঁদের কেউ দৈনিক ১০০ টাকা, কেউ ২০০ টাকা দেন। তবে কাকে এই টাকা দেওয়া হয়, তা প্রকাশ করতে চাননি তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
হকারদের এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্মিত একটি ব্রিজে দিনের পর দিন দোকান বসানোর সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে? যদি নিয়মিত অর্থের বিনিময়ে এই সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ কারা নিচ্ছেন? কার প্রশ্রয়ে উচ্ছেদের পরও একই পরিস্থিতি ফিরে আসছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।
এর আগে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের পাশের অবৈধ দখল সরাতে প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযান চালানো হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। এতে উচ্ছেদ কার্যক্রমের স্থায়িত্ব ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ফুটওভার ব্রিজ থেকে ভাসমান দোকান উচ্ছেদের আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষ যাতে স্বস্তিতে ও নির্বিঘ্নে ব্রিজটি ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর দাউদকান্দি কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় কয়েকবার হকারদের সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশও একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁরা আবার ফিরে আসেন। মানুষের চলাচলের পথ সংকুচিত না করে নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা করা উচিত।
পথচারীদের প্রত্যাশা, শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা নয়, দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠার কারণ অনুসন্ধান এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প ব্যবসাস্থলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগ এখন জরুরি। পথচারীদের প্রশ্ন, ফুটওভার ব্রিজটি দখলমুক্ত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কবে? তাঁরা চান, আশ্বাস কিংবা সাময়িক অভিযানে সীমাবদ্ধ না থেকে এমন স্থায়ী সমাধান আসুক, যাতে ব্রিজটি আবারও সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের পথ হয়ে ওঠে।