ছবি-যাযাদি মুক্তিযুদ্ধের সূচনা সময়ে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে প্রথম যে সামরিক কর্মকর্তা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি মেজর জিয়াউর রহমান। সেই মুহূর্তে তার সহকর্মীদের সামনে তিনি বলেন ‘উই রিভোল্ট’ বা ‘আমরা বিদ্রোহ করলাম।’ এই সাহসী উচ্চারণ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেজর জিয়া, যিনি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হন তার জীবনীসহ আওয়ামী লীগ শাসন আমলে ২০১২ সালে সাংবাদিক শফিক রেহমান রচিত আটটি বই নিয়ে রাজনৈতিক থিংক ট্যাংক জি-৯ (গ্রুপ ২০০৯) একটি প্রকাশনা উৎসবের উদ্যোগ নেয়। ভিন্ন মত দমনে অভ্যস্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার কিছুতেই বইগুলোর প্রকাশনা উৎসব করতে দিতে চায় নি। অনেক বাধা পেরিয়ে ৭ এপৃল ২০১২ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে বইগুলোর মোড়ক উন্মেচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন। বই লেখার প্রেক্ষাপট ও অনুষ্ঠানটির পেছনের ঘটনা জানিয়ে সেদিন শফিক রেহমান যে ভাষণটি দিয়েছিলেন তাই এখানে প্রকাশ করা হলো। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এই লেখার শিরোনামও প্রতীকী ভাবে করা হয়েছে, ‘উই রিভোল্ট! আমরা বিদ্রোহ করলাম!’ আগামী ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু দিবস উপলক্ষে লেখাটি ছাপা হলো। এর আগে কোনো সংবাদ মাধ্যমে ভাষণটি প্রকাশিত হয়নি।
উপস্থিত সংগ্রামী নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া, লেখকবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কর্মী-সমর্থকবৃন্দ এবং সুধীবৃন্দ।
হ্যালো, ওয়েলকাম, গুড আফটারনুন।
আজ আপনারা সবাই যে এখানে এসেছেন সে জন্য মিলিয়ন ধন্যবাদ।
আপনারা জানেন, আজ আটটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপির চেয়ারপারসন ম্যাডাম খালেদা জিয়া। এরই মধ্যে আপনারা এটাও জেনেছেন, এই প্রকাশনা উৎসব করতে ক্ষমতাসীন সরকার আরোপিত বিভিন্ন বাধা আমাদের পেরোতে হয়েছে।
প্রথমে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল ২৭ মার্চ ২০১২-তে সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে। এই অনুষ্ঠানের আয়োজক গ্রুপ ২০০৯, সংক্ষেপে জি-৯ এ জন্য এক মাস আগে ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ওই হোটেলে এডভান্স পেমেন্ট করেছিল এবং প্রায় ১,০০০ অতিথির নামে কার্ড বিলি করেছিল। এই দেখুন সেই কার্ড। কিন্তু ১৮ মার্চে সোনারগাঁও হোটেল কর্তৃপক্ষ সেই বুকিং ক্যানসেল করে জানায়, প্রধান মন্ত্রীর অফিস ঠিক সেই দিন, সেই সময়ে বুকিং চেয়েছে। তাই বিরোধী দলীয় নেত্রীর অনুষ্ঠানের বুকিং ক্যানসেল করতে তারা বাধ্য হয়েছে।
এই বুকিং বাতিল হয়ে যাওয়ার পরে জি-৯ সাবেক শেরাটন, বর্তমানে রূপসী বাংলা হোটেলের উইন্টার গার্ডেন হল রুমটির বুকিং দেয়, দিন ও সময় অপরিবর্তিত রেখে। জি-নাইন নতুন কার্ড ছেপে আবারো বিলি করে। এই দেখুন সেই দ্বিতীয় কার্ড।
অনুষ্ঠানের আগের রাতে। ২৬ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় আমি রূপসী বাংলা হোটেলে যাই বিভিন্ন প্রস্তুতি কাজ সুসম্পন্ন হয়েছে কি না দেখার জন্য। তখন আমাকে বলা হয়, হোটেল কর্তৃপক্ষ ফোনে জানতে চেয়েছেন বইগুলোর বিষয়বস্তু কি এবং প্রকাশিত পাচটি বই তাদের কাছে পর দিন সকাল ১০টায় জমা দিতে হবে। তারপর বইগুলো পরীক্ষা করে তারা জানাবেন, এই হোটেলে এ প্রকাশনা উৎসব করা যাবে কি না।
আমি অবাক হয়ে বললাম, পর দিন সকাল ১০টায় যদি বলা হয় এই হোটেলে অনুষ্ঠান করা যাবে না তাহলে আমরা কিভাবে অতিথিদের জানাব যে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়ে গিয়েছে?
অতিথিরা হোটেলে এসে যদি বাতিল হওয়ার সংবাদটি পান তাহলে সেটা হবে হোটেল কর্তৃপক্ষের জন্য নিন্দাজনক এবং আয়োজক জি ৯-নাইনের জন্য বিব্রতজনক। সুতরাং রূপসী বাংলায় অনষ্ঠান হতে পারবে কি না সেটা রাতের মধ্যে জানাতে হবে।
এর আধা ঘণ্টা পরে জি-নাইনের কাছে একটি এসএমএস আসে। তাতে লেখা ছিল :
Dear Sir, as I had shared with you few minutes earlier over cell phone that we cannot organize your event tomorrow. I have been instructed to you from authority of national intelligent department of Bangladesh. Sorry for the inconvenience.
Thanks n regards Mosharrof Hossain, Catering sales executive, Ruposhi Bangla Hotel.
অর্থাৎ, সুধী, কয়েক মিনিট আগে সেলফোনে আমি জানিয়েছিলাম আগামীকাল আপনাদের অনুষ্ঠান আমরা করতে পারব না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্তৃপক্ষ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আপনাদের অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখিত। ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধান্তে মোশাররফ হোসেন, কেটারিং সেলস একজিকিউটিভ, রূপসী বাংলা হোটেল।
এভাবেই কিছু অকালকুষ্মাণ্ড, অর্বাচীন ও অভদ্র সরকারি কর্মচারিদের কাছে রূপসী বাংলা হোটেলটি হয়ে গেল কুরূপা, কুশ্রী ও কুচরিত্র। ঠিক ওই কর্মচারিদের পেছনে ক্ষমতাসীন লোকজনের মতোই!
১৭ মার্চ ১৯৭১- বার্থ ডে কেক
এখানে আমি বিনীতভাবে জানাতে চাই, একাত্তরে যখন এটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ছিল তখন আমি ছিলাম চিফ একাউন্টেন্ট এবং এক পর্যায়ে যুদ্ধভীত শ্বেতাঙ্গ জেনারেল ম্যানেজার বার্নার্ড হোল্ট ইংল্যান্ডে চলে গেলে আমি ছিলাম একটিং জেনারেল ম্যানেজার। এ হোটেল থেকে আমারই উদ্যোগে ১৭ মার্চ ১৯৭১-এ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে বাংলাদেশের ম্যাপ ও ফ্ল্যাগ খচিত বড় বার্থডে কেক পাঠানো হয়েছিল তার ৩২ নাম্বার রোডের বাড়িতে। এ হোটেলে সেই সময়ে অবস্থানরত পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোকে লিফটে আটকে রেখে স্যানডাল পেটা করা হয়েছিল তদানীন্তন সিকিউরিটি অফিসার মি. করিমের প্ল্যান অনুযায়ী। পরবর্তীকালে এ ঘটনাটি তিনি লাল গোলাপ টিভি অনুষ্ঠানে বর্ণনা করেন। এই ব্যক্তিগত কথাগুলো বললাম এই জন্য যে, বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তখন কোনো মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিতে আমি দেখিনি।
আমরা বইগুলো প্রকাশনার তৃতীয় প্রচেষ্টায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবের শরণাপন্ন হই। প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ সদয় ও সাহসী অনুমতি দেন। জি-নাইন তৃতীয়বার কার্ড ছাপে ও বিলি করে। এই দেখুন সেই কার্ড। ধন্যবাদ ন্যাশনাল প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ ও সদস্যদের।
হোটেলের রুমে সাউন্ড ও লাইটের যে এফেক্ট আমরা আপনাদের দেখাতে পারতাম সেটা এই খোলা জায়গায় অনুষ্ঠানটি করার জন্য সুষ্ঠুভাবে দেখানো হয়তো সম্ভব হবে না। সরি।
সরকারি বাধা কেন?
সরকার কেন বই প্রকাশনা উৎসবে বাধা দিয়েছে তার কয়েকটি ব্যাখ্যা এরই মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এর একটি ব্যাখ্যা হলো, ২৭ মার্চ সোনারগাঁও ও রূপসী বাংলা হোটেলে বিদেশি কয়েক অতিথি ছিলেন। প্রকাশিতব্য পাচটি বইয়ের মধ্যে দুটি ইংরেজিতে।
সরকার চায়নি এ ইংরেজি বই দুটি বিদেশিদের হাতে পড়ুক। কারণ দুটি বই পড়লেই জানা যাবে স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই সরকার কি রকম মিথ্যাচার করেছে।
বস্তুত এ কারণেই আমি এসব বই লেখার তাড়না বোধ করেছিলাম।
আমি যখন দেখলাম এবং এখনো দেখছি, আমাদের ইতিহাস, বিশেষত স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অবিরামভাবে বিকৃত করা হচ্ছে এবং অব্যাহতভাবে ভিন্নমত পোষণকারী প্রয়াত এবং জীবিত ব্যক্তিদের চরিত্র হনন করা হচ্ছে তখন আমি যন্ত্রণায় পড়ে যাই। আমি বাধ্য হই সেই যন্ত্রণায় বই লিখতে। আর তারই ফসল আজকের এ আটটি বই।
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০-এ অর্থাৎ দুই বছর আগে টার্কির প্রেসিডেন্ট গুল ঢাকায় এসেছিলেন। তার ঢাকা সফরের আগে টার্কিশ দূতাবাস ম্যাডাম জিয়ার কার্যালয়ে ফোন করে জানতে চান ম্যাডাম জিয়ার জীবনীমূলক প্রামাণ্য তথ্য। ওই তথ্য সরবরাহের দায়িত্ব আমার ওপর পড়ে। আমি অবাক হয়ে যাই দেখে যে, উইকিপিডিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন সূত্রে ম্যাডাম খালেদা সম্পর্কে তথ্যগুলো অসম্পূর্ণ, অসত্য অথবা অর্ধ সত্য। এই সময়ে আমি ইংরেজিতে তার একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখি এবং সেটাই টার্কিশ এমবাসিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপরই ম্যাডাম খালেদার এ সংক্ষিপ্ত জীবনীর বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন প্রকাশ করার কথা ভাবতে থাকি।
কাজটি করতে গিয়ে আমি প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু রিসার্চে লক্ষ্য করি, তার সম্পর্কে অনেক অসত্য এবং অর্ধ সত্য প্রচারিত হয়েছে। আরো দুঃখের বিষয় যে, এসব চালানো হচ্ছে সরকারিভাবে। শুধু তাই নয়, জিয়াউর রহমানের বিপরীতে আরেক ব্যক্তির স্তুতি ও বন্দনা একনিষ্ঠভাবে অহরহ চলছে। ফলে বিশেষত তরুণ প্রজন্মের পক্ষে বোঝা অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা কে বা কারা দিয়েছিলেন? কখন দিয়েছিলেন? স্বাধীনতা যুদ্ধে কে, কোথায় ছিলেন? প্রত্যক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধ কারা করেছিলেন?
এসব প্রশ্নের অনেক হাস্যকর উত্তর এখন পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, একটি চাকরির ইন্টারভিউয়ের গল্প বললেই আপনারা সেটা বুঝবেন। গল্পটি হচ্ছে এ রকম :
সেনা বাহিনীর গল্প
সেনা বাহিনীতে নতুন সেনা নিয়োগ করা হচ্ছে। যুবকদের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন জনৈক মেজর। তিনি প্রশ্ন করলেন, বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ তিন জন মুক্তিযোদ্ধা কে ছিলেন?
চাকরি পেতে ব্যগ্র যুবকটি উত্তর দিল প্রথম জন ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় জন ছিলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা এবং স্যার, মাফ করবেন, আপনার নামটা জানি না, তৃতীয় জন ছিলেন আপনিই!
ইতিহাস বিকৃতির ফলটা কি হচ্ছে সেটা আশা করি আপনারা বুঝবেন।
তবে সত্য ইতিহাস লেখায় বিপদ হতে পারে। বিশেষত আজকের মিডিয়ার অধিকাংশ যখন এক দলদর্শী বা ক্ষমতাসীন দলদর্শী। আপনি সত্য ইতিহাস বললে বা লিখলে অভিযুক্ত হতে পারেন, আপনি স্বাধীনতা যুদ্ধ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, সাম্প্র্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, হয়তো বা যুদ্ধাপরাধী! ইত্যাদি ইত্যাদি।
মাতাল প্রচার
এই ধরনের মাতাল প্রচার এখন এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে, বলা হচ্ছে, জিয়াউর রহমান, যিনি নয় মাস স্বদেশে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি ছিলেন পাকিস্তানি গুপ্তচর। সেই হিসেবে জিয়া হচ্ছেন নিন্দিত। আর যে নেতা নয় মাস বিদেশে, পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন তিনিই হচ্ছেন নন্দিত।
উই রিভোল্ট
সত্যটা হচ্ছে এই যে, ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ রাত একটা থেকে রাত সোয়া দুইটার মধ্যে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম পোর্ট এরিয়াতে ঘোষণা করেন, উই রিভোল্ট! আমরা বিদ্রোহ করলাম!
এই বিদ্রোহের বিবরণ প্রকাশিত হয় তারই জবানীতে, দৈনিক বাংলায় ২৬ মার্চ ১৯৭২-এর স্বাধীনতা সংখ্যায়। দৈনিক বাংলা ছিল সরকারি পত্রিকা। অর্থাৎ জিয়ার এ লেখাটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ও প্রকাশিত। এটাই তাহলে সত্য যে, ২৫ মার্চ রাত একটা থেকে সোয়া দুটোর মধ্যে জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে অস্ত্র হাতে তুলে নেন। এরপর আরেক সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কালুরঘাট ট্রান্সমিটিং স্টেশন থেকে প্রথমে নিজের তরফ থেকে এবং পরে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়ে তার পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমরা ঢাকায় এই ঘোষণা শুনেছিলাম ২৭ মার্চ ১৯৭১-এ।
এখন তরুণ প্রজন্ম প্রশ্ন করতে পারে, সেই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান কোথায় ছিলেন?
নিয়তি
নিয়তির কি অবাক সেন্স অফ টাইমিং!
জিয়াউর রহমান যখন চট্টগ্রামে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত একটা থেকে সোয়া দুটোর মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করছিলেন ঠিক সেই সময়ে ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করছিলেন।
এখানে মনে করিয়ে দিতে পারি গ্যারিবল্ডি, ম্যাজিনি, মাও, ক্যাস্ট্র্রোর মতো বিপ্লবী নেতারা বিপ্লবের সময়ে নিজে উপস্থিত থেকে সংগ্রাম করেছেন।
সে রকম কিছু না করে শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মসমর্পণের পেছনে নিশ্চয়ই তার নিজস্ব জোরালো যুক্তি ছিল। আজ আমি সেই প্রসঙ্গে যাব না। তবে এটুকু বলতে পারি, ৭ মার্চে তার ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে জিয়াও মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ঠিক তেমনি আমিও ’৭১-এ মুক্তি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার বীরত্ব এবং আগস্ট ১৯৭৫-এর পরে দেশ পুনর্গঠনে জিয়ার সবল নেতৃত্বের ইতিহাস যখন অনুচ্চারিত থাকে তখন সচেতন ব্যক্তি ও লেখকের ওপর দায়িত্ব বর্তায় সত্য ইতিহাসটা তুলে ধরার।
বলতেই হবে, ইতিহাস লেখার সময়ে আমি ভাবিনি আজ প্রকাশিতব্য বইগুলোও আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচারের ইতিহাসের একটি অংশ হবে।
আজ যে আটটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হবে তার মধ্যে চারটি বইয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং ম্যাডাম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন গঠনমূলক অবদানের সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন তুলে ধরা হয়েছে।
‘রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান’ বইয়ে তার একটি আত্মকথন প্রকাশিত হয়েছে। তার জীবনের বিভিন্ন দিক বিষয়ে এ বইয়ের লেখকরা অনেক অজানা ইন্টারেস্টিং তথ্য জানিয়েয়েছেন।
সব লেখককে জানাচ্ছি ধন্যবাদ।
বই উপহার দিন
কেউ কেউ বলেন, মাগনা পেলে বাঙালি বিষ খেতে রাজি হয়। এটা একটা অপবাদ। এই অপবাদ মিথ্যা প্রমাণ করার দায়িত্ব আপনাদের। বিশেষত বিএনপি নেতাদের। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ম্যাডাম জিয়ার প্রধান মন্ত্রিত্বের সময়ে তিনি একটা স্লোগান দিয়েছিলেন, প্রিয়জনকে বই উপহার দিন। তার সেই সুন্দর স্লোগানটি একটু পরিবর্ধিত করে আজ আমি বলতে চাই, বই কিনে ‘প্রিয়জনকে বই উপহার দিন’। বিএনপি নেতাদের অনুরোধ করতে চাই, বই কিনে আপনারা কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের উপহার দিন। না হলে প্রতিপক্ষের শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবিলা আপনারা কিছুতেই করতে পারবেন না।
এসব কথা বলার আরেকটি কারণ হচ্ছে, আমাদের সামর্থ্য খুবই সীমিত। বিনামূল্যে বা মাগনা বই দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সরি ফোকস। আমরা মি. দুররানির অনুগ্রহে আইএসআই বা পাকিস্তান থেকে টাকা পাইনি। আর ইনডিয়ান ‘র’ যে আমাদের টাকা দেবে না সেটা বলা বাহুল্য।
এসব বই পড়া নেতা, কর্মী-সমর্থকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একটু আগেই আমি বলেছি, জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার সভ্যতার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে। তিনি প্রয়াত। তিনি তো আর কিছু বলতে পারবেন না। সে কাজটি আপনাদেরই করতে হবে। কারণ এখন ম্যাডাম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও অপপ্রচার শুরু হয়ে গিয়েছে। তিনি জীবিত থাকতেই! একেই বোধহয় হয় বলে, অসভ্যতার অগ্রগতি।
বর্তমান প্রধান মন্ত্রী ও তার স্তাবকরা একাধিকবার বলেছেন, আইএসআই থেকে ১৯৯১-এ বিএনপি টাকা নিয়েছিল। তিনি অবশ্য ভুলে গিয়েছেন, মাত্র তিন বছর আগের ইলেকশনে তার পার্টি ব্যাগফুল অফ মানি ইনডিয়া থেকে যে পেয়েছিল সে বিষয়ে লন্ডনের সাপ্তাহিক দি ইকনমিস্ট রিপোর্ট করেছিল। বর্তমান প্রধান মন্ত্রী উপদেশ দিয়েছেন, বিরোধী নেত্রী খালেদা যেন পাকিস্তান চলে যান। খালেদা পাকিস্তান যাবেন কেন? তিনি তো আগেই বলেছেন, বাংলাদেশই তার একমাত্র ঠিকানা। বরং আমি প্রধান মন্ত্রীকে অনুরোধ করব তিনি যেন ইনডিয়া অথবা আমেরিকায় চলে যান। ওই দুই দেশে দীর্ঘকাল থাকার অভ্যাস তার আছে।
কাজের বুয়া
প্রসঙ্গত, এশিয়ান কৃকেট কাপে সাম্প্রতিক ফাইনালে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ম্যাচে রিরোধী নেত্রীর উপস্থিতি নিয়ে প্রধান মন্ত্রীর একাধিকবার অশালীন মন্তব্যের বিষয়টি বলতে চাই। তিনি বলতে চেয়েছেন, ম্যাডাম জিয়া স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন পাকিস্তান টিমকে সমর্থন করতে। এ তথ্যটি প্রমাণ করার জন্য প্রধান মন্ত্রী তার কাজের বুয়ার রেফারেন্সও দিয়েছেন।
প্রধান মন্ত্রীর স্ট্যান্ডার্ড যে আরো নিচে নেমে গিয়েছে সেটা আমি বলতে চাই না। সম্প্রতি বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তিনি এক জন চপলমতি বালিকা। যা মনে আসে তাই বলে ফেলেন।
হয়তো তিনি তাই। আমি এখানে একটু যোগ করব। দেশের বালক-বালিকাদের ইতিহাস পড়তে বলব। ইতিহাস পড়লেই জানা যাবে ১৯৪৭ সালে এই প্রধান মন্ত্রীর পিতা পাকিস্তান আন্দোলনের এক জন অগ্রণী কর্মী ছিলেন এবং ১৯৭১-এ তিনি পাকিস্তানেই চলে গিয়েছিলেন।
আবার ১৯৭২-এ স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলায় মনোযোগী হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি তার পরম শত্রু জুলফিকার আলি ভুট্টোকে ক্ষমা করে দিয়ে বাংলাদেশে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং ১৯৭৪-এ ভুট্টো এখানে এসেছিলেন।
দূরদৃষ্টি সম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতি
এটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন পররাষ্ট্রনীতি যেটা পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়াও অনুসরণ করেন। এখানে মনে করিয়ে দিতে পারি যে, ভিয়েতনাম ১০টি বছর আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়েছিল। তারা এখন আমেরিকার সঙ্গে গভীর বন্ধু সম্পর্ক রেখে চলেছে। যে জাপানের বিরুদ্ধে মহাযুদ্ধে আমেরিকা লড়েছিল সেই জাপান এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় বন্ধু রাষ্ট্রের একটি।
বস্তুত বর্তমান প্রধান মন্ত্রী যদি সেই রকম দূরদর্শী হতেন তাহলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ফাইনাল ম্যাচের দিনে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী মি. গিলানিকে ঢাকায় এসে পাশাপাশি বসে খেলা দেখার আমন্ত্রণ জানাতে পারতেন। যেমনটা ইনডিয়া-পাকিস্তানের একটি ফাইনাল ম্যাচ পাশাপাশি বসে দেখেছিলেন মনমোহন সিং ও গিলানি। কিন্তু প্রতিহিংসা প্রতিশোধের হামলা-মামলার রাজনীতি যার অবলম্বন তার কাছে থেকে এ রকম সৌজন্যতা আশা করা অসম্ভব।
ত্রিশ সেট অলংকার
এখানে আমি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘকালের বিশ্বস্ত ও অন্তরঙ্গ সহযাত্রী জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই। সম্প্রতি জেনারেল এরশাদ পার্লামেন্টে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৮৬-তে আমার সম্পাদিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ পার্লামেন্টের তৎকালীন নারী মেম্বারদের টাইটেল দিয়েছিলাম পার্লামেন্টের শোভা ৩০ সেট অলংকার।
তারপর তিনি প্রশ্ন রাখেন, এখন আমি পার্লামেন্টের নারী মেম্বারদের কি টাইটেল দেব?
প্রশ্নটি তিনি করেন বিএনপির দুই নারী মেম্বার রেহানা আখতার রানু ও সৈয়দা আশরাফি পাপিয়া সম্প্রতি পার্লামেন্টের প্রধান মন্ত্রীর যে সমালোচনা করেছেন সেই পরিপ্রেক্ষিতে।
জেনারেল এরশাদ অবশ্য সেদিন বলেননি ওই টাইটেল দেয়ার জন্য আমাকে ছয় বছর নির্বাসনে তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
সে যাই হোক। আমি পুলকিত হয়েছি জেনে যে, জেনারেল এরশাদের দুটি গুণ, এক. তার ভাষা শালীন আছে এবং দুই. নারীদের প্রতি তার নজর এখনো প্রখর। তিনি জানতে চেয়েছেন, এখন পার্লামেন্টের নারী মেম্বারদের টাইটেল কি হবে? উত্তরটা হচ্ছে, বিএনপির সাত নারী মেম্বার হচ্ছেন বাঘা তেতুল অথবা মুগুর। আর বাকি সব নারী মেম্বারদের টাইটেল দেয়া থেকে বিরত থাকলাম। কারণ ১৯৮৬-তে ওই টাইটেল দেয়ার জন্য আমার বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকার মানহানির মামলা করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমি এখন চাই না।
কিন্তু সাত জনকে মুগুর টাইটেল কেন দিচ্ছি?
বাংলা ভাষায় দুটি বচন আছে, বুনো ওল বাঘা তেতুল এবং যেমন কুকুর তেমন মুগুর।
সম্প্র্রতি পার্লামেন্টের বিএনপি দুই এমপি রেহানা আক্তার রানু এবং সৈয়দা আশরাফি পাপিয়া কিছ সময়ের জন্য মুগুর চালিয়েছেন। এতেই সরকারি দল বিচলিত হয়েছে। তাদের এই সন্ত্রস্ত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে দিয়েছে রানু ও পাপিয়ার মুগুর চালানোর প্রয়োজন ছিল।
চাই শালীনতা ও সত্য
তারপরও সেদিকে আমরা কাউকে যেতে বলব না। আমরা এটাই বলব, রাজনীতিতে শালীনভাবে কথা বলুন এবং ভদ্র ভাষায় সত্যটা লিখুন। ঠিক এ বইগুলোর মতোই। এ বইগুলোর উত্তর বইতেই অর্থাৎ শালীন লেখাতেই দেয়া হবে বলে আমি আশা করি। কাউকে চ্যাংদোলা করার, কোলে তোলার অথবা থুথু চেটে খাওয়ার উপদেশ দেবেন না। কাজের বুয়ার রেফারেন্স টেনে পাকিস্তানে চলে যেতে বলবেন না।
আমরা আজ যে আটটি বইয়ের প্রকাশনার উৎসবের আয়োজন এখানে করেছি তার মধ্যে দুটি ইংরেজি এবং পাচটি বাংলায়। ইংরেজি বই দুটির নাম হচ্ছে ঝঃধঃবংসধহ তরধঁৎ জধযসধহ এবং উবসড়পৎধঃরপ খবধফবৎ কযধষবফধ তরধ. বাংলা বই পাচটির নাম রাষ্ট্রনায়ক জিয়া, সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া, চট্টগ্রাম পোলো গ্রাউন্ড লুণ্ঠন, বিধ্বস্ত দেশ, বিসন্ন মানুষ, নেড়ি কুকুরের কাণ্ড ও নেড়ি কুকুরের কীর্তি।
ও হ্যা। রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান নামে একটি বই লিখেছি খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর গত ৪ এপৃল থেকে সারা ঢাকা শহরে আওয়ামী লীগ ব্যানার ছেড়েছে যেখানে তাদের নেত্রীর নতুন বিশেষণ হয়েছে রাষ্ট্রনায়ক। লেখা হয়েছে রাষ্ট্রনায়ক হাসিনা।
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
এই বইগুলো প্রকাশের পেছনে যারা কাজ করেছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আর আজ এই বইগুলো প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন যারা করেছেন সেই গ্রুপ ২০০৯ তথা জি-নাইনের সদস্যদের জানাচ্ছি অশেষ কৃতজ্ঞতা। পরিশেষে ম্যাডামকে জানাচ্ছি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। অনুষ্ঠানে এসে মোড়ক উন্মোচন করার জন্য। থ্যাংক ইউ অল।
কেউ কেউ আমাকে সমালোচনা করতে পারেন। আমি একটি বিশেষ দলের বা বিশেষ ব্যক্তির পক্ষে লিখেছি। অর্থাৎ আমি পক্ষপাতিত্ব করছি। অন্যভাবে তারা বলতে পারেন, আমি নিরপেক্ষ নই।
কেউ নিরপেক্ষ নয়
এই সমালোচনার উত্তরে ম্যাডাম খালেদা জিয়ারই একটি বাণী আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়।
তার সেই কথা আমি একটু সম্প্রসারিত করে আজ বলতে চাই, পাগল, শিশু ও সুবিধাবাদী ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। আমি সমালোচিত হতে পারি জেনেও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিবেকের তাড়নায় এই বইগুলো লিখেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিরপেক্ষ ছিলাম না। মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। আমি স্বৈরশাসক এরশাদের সময়ে নিরপেক্ষ ছিলাম না। আমি গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম।
জার্মান কবি দান্তে বলেছিলেন, The hottest places in hell are reserved for those who, in a time of great moral crisis maintain their neutrality.
অর্থাৎ খুব বড় নৈতিক সংকটের সময়ে যারা তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখেন তাদের জন্য নরকের সবচেয়ে বেশি গরম জায়গা রিজার্ভ করা আছে।
দান্তের এই অমর বাণী পুনঃউচ্চারণ করেছিলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন কেনেডি। আজ আমিও সেই আপ্তবাক্যটি পুনঃউচ্চারণ করলাম। প্রাবন্ধিক বদরুদ্দীন উমরের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয়, বাংলাদেশে এখন উন্মাদ ও বিকারগ্রস্ত শাসকের সময় চলছে। এই সংকটের সময়ে নৈতিক বোধ সম্পন্ন কোনো ব্যক্তির পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব নয়। যেমনটা সম্ভব ছিল না মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র যুদ্ধের সময়ে।
ধন্যবাদ সবাইকে এতক্ষণ শোনার জন্য।
থ্যাংক ইউ।
৭ এপৃল ২০১২
ন্যাশনাল প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণ
ঢাকা