১০ ওভারে হাসিনা খালেদার টেলিম্যাচের ধারাবিবরণী

শফিক রেহমান

জাতীয়

২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবন থেকে গুলশানে বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার বাসভবনে টেলিফোন সংলাপের পর

2026-08-25T19:20:54+06:00
2026-09-15T18:43:10+06:00
বৃহস্পতিবার ● ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
জাতীয়
১০ ওভারে হাসিনা খালেদার টেলিম্যাচের ধারাবিবরণী
শফিক রেহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৭:২০ পিএম  আপডেট: ১৫.০৯.২০২৬ ৬:৪৩ পিএম 
শফিক রেহমান
২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবন থেকে গুলশানে বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার বাসভবনে টেলিফোন সংলাপের পর থেকে বিভিন্ন মাধ্যম ও সূত্রে খণ্ডিত উদ্ধৃতি পাওয়া যাচ্ছিল। এসব খণ্ডিত উক্তিতে দেশবাসীর ঔৎসুক্য চরমে পৌছেছিল। ৩০ অক্টোবর প্রায় সব দৈনিক পত্রিকা দুই নেত্রীর টেলি সংলাপ প্রকাশ করে। তবে সাধারণ পাঠক এখানে হোচট খেয়েছেন। কারণ, কোনো পত্রিকাই সংলাপের সঠিক পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি। তারা নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে সংলাপের অসম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেছে। যদিও তাদের কেউ কেউ, অনেকেই দাবি করে, হুবহু বিবরণ প্রকাশ করা হলো। তখন একমাত্র শফিক রেহমানই সঠিক বিবরণ প্রকাশ করেন।
বর্তমান সময়ে অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ প্রথম টেস্টে (১৩-১৬ আগস্ট ২০২৬) বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় এবং চলমান টেস্টের (২২-২৬ আগস্ট) দিকে দেশবাসীর দৃষ্টি। ১৯৫০ সালে শফিক রেহমান সাংবাদিকতা শুরু করেন স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে। তিনি বিভিন্ন আঙ্গিকে কলাম লিখেছেন। আজ প্রকাশিত কলাম কৃকেট খেলার ধারাবিবরণীর আদলে লেখা। কৃকেট নিয়ে যায়যায়দিন-এর সম্পাদক শফিক রেহমানের আলোচিত সেই ‘১০ ওভারে হাসিনা-খালেদার টেলিম্যাচের ধারাবিবরণী’ লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো। 

২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিটে মোহাম্মদপুরে গণভবন থেকে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী (বর্তমান পলাতক) শেখ হাসিনার গুলশানে বিরোধী নেত্রী (প্রয়াত) খালেদা জিয়ার বাসভবনে টেলিফোন সংলাপের পর থেকে বিভিন্ন মাধ্যম ও সূত্রে খণ্ডিত উদ্ধৃতি পাওয়া যাচ্ছিল। এসব খণ্ডিত উক্তিতে দেশবাসীর ঔৎসুক্য চরমে পৌছেছিল। সবাই জানতে চাচ্ছিল, হাসিনা কি বলেছেন? খালেদা কি বলেছেন? পুরোটাই।
কারণ দুই নেত্রীর এই টেলি সংলাপের ওপরই নির্ভর করছিল দেশবাসীর ভবিষ্যৎ। নির্ভর করছিল দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য একটি জেনারেল ইলেকশন (সাধারণ নির্বাচন) আগামীতে হবে কি না। শুক্রবার ২৫ অক্টোবরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১৮ দলীয় জোটের জনসভায় খালেদা জিয়া আহূত দেশ জুড়ে একটানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল শুরু হয়ে যায় ২৭ অক্টোবর থেকে।
দেশবাসীর তীব্র কৌতূহল মেটাতে ২৮ অক্টোবর হরতালের দ্বিতীয় দিনে প্রথম আলোর ফ্রন্ট পেইজে ‘তিক্ত কথাও হয়েছে দুই নেত্রীর’ শিরোনামে সেকেন্ড লিড করে। কিন্তু এটা টেলি সংলাপের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ছিল না। এ দিনই তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, টেলি সংলাপটি প্রকাশিত হওয়া উচিত। ধারণা করা হয়, প্রথম আলো আইন বহির্ভূতভাবে সংলাপের খণ্ডিত অংশটি হয়তো তথ্য মন্ত্রীর পূর্ব অনুমতি নিয়েই করেছে।
প্রথম আলোর এই আইন বহির্ভূত, কিন্তু অগ্রণী ভূমিকায় সাহসী হয় মানবজমিন। মঙ্গলবার ২৯ অক্টোবর হরতালের তৃতীয় দিনে মানবজমিন পুরো এক পৃষ্ঠা জুড়ে টেলি সংলাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো প্রকাশ করে। তবে এটিও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট ছিল না। মানবজমিনের এই রিপোর্টে দেশ তোলপাড় হয়ে যায়।
এরই মধ্যে ২৯ অক্টোবর রাত ২টা থেকে সরকার সমর্থক একাত্তর টেলিভিশন থেকে ওই টেলি সংলাপের পুরোটাই সম্প্রচার শুরু হয়ে যায়।

এরপর যা হওয়ার তাই হয়।
২৯ অক্টোবর প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে পূর্ণাঙ্গ অথবা খণ্ডিতভাবে টেলি সংলাপ সম্প্রচারিত হতে থাকে। এই দিন দেশ জুড়ে আলোচিত হতে থাকে আওয়ামী লীগ সরকার কেন এই সংলাপ প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিল? এই সংলাপ প্রকাশের ফলে কোন দলের লাভ হলো? আওয়ামী লীগের নাকি বিএনপির? কোন নেত্রীর ক্ষতি হলো? শেখ হাসিনার নাকি খালেদা জিয়ার? কোন দলের নেতাদের কি প্রতিক্রিয়া হলো? সাধারণ মানুষ সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে কিভাবে নিল?
এসবের মধ্যেই কেটে গেল ২৯ অক্টোবর ২০১৩ হরতালের তৃতীয় দিন। টানা ৬০ ঘণ্টার এই হরতালে নিহত হয় ১৩ জন। আহত হয় হাজারের বেশি এবং তাদের মধ্যে ছিল- পুলিশ, সাংবাদিক ও টিভি ক্যামেরাপারসন।
এই তিন দিনে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমনটা ভয় করে হরতাল তুলে নেয়ার জন্য বারবার খালেদাকে অনুরোধ করেছিলেন, ঠিক তেমনটাই ঘটে যায় দেশ জুড়ে।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় সর্বাত্মকভাবে হরতাল পালিত হয়। তবে রাজধানী ঢাকার চেয়ে মফস্বল শহরগুলোতে হরতালের তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। ঢাকার হরতালও বিগত পাচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর ছিল। রাজধানীতে প্রাইভেট কার চলাচল ছিল না। বাস চলাচল ছিল খুব কম। অধিকাংশ দোকানপাট ছিল বন্ধ। স্কুল-কলেজ ছিল বন্ধ। ঢাকা ছিল ফাকা। সারা দেশ জুড়ে গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। বাস ডিপোতে আগুন ধরানো হয়েছে। বাস পুড়েছে। মোটর সাইকেল পুড়েছে। পথে পথে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। রেল লাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে। মফস্বলে গাছের গুড়ি কেটে পথে ফেলা হয়েছে। আন্তঃজেলা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
উত্তর বাংলাদেশে বিএনপি নেতা আসাদুল হাবিব দুলু প্রভাবিত লালমনিরহাটে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তীর-ধনুক, বল্লম, দা-কুড়াল হাতে জমায়েত হয়। শিফট ডিউটি করে তারা ২৪ ঘণ্টা জেগে থাকে। ভয়ে পুলিশ তাদের বাধা দেয়নি।
কাছাকাছি এলাকায় বিএনপির ভাইস-প্রেসিডেন্ট আবু বকর সিদ্দিক প্রভাবিত কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার দাতভাঙ্গা ইউনিয়নে পুলিশ-বিজিবিকে ঘেরাও করে রাখে কয়েক হাজার গ্রামবাসী। তবে তিন দিন ঘেরাওয়ের মধ্যে তাদের নিয়মিত খাবার ও পানি দেয় গ্রামবাসী। এখানে বিজিবির তিনটি প্লাটুন এসে পৌছলেও তারা গুলি চালাতে সাহস পায়নি। তারা কুড়িগ্রামের জননেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালান। সমঝোতা হয়, ওই এলাকার কারো বিরুদ্ধে মামলা হবে না। তখন ঘেরাও তুলে নেয়া হয়।
মফস্বলে এ ধরনের বহু ঘটনার ফলে সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মচারিদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অভাব সৃষ্টি হয়। একদিকে কিছু পুলিশ যেমন অতি সক্রিয় থেকেছে, অন্য দিকে কিছু পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকতে চেয়েছে। কেউ বা পালিয়ে গেছে। কেউ বা ছুটি নিতে চেয়েছে। শেখ হাসিনার কথিত কুমির বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন অস্থিরতার গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।
টানা হরতালের ফলে বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে গভীর ভীতি, চরম দুর্বলতা ও তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে তাদের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে যেতে পারে এবং এর ফলে তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ভাঙন শুরু হবে- এই আশঙ্কায় শেখ হাসিনা অনুরোধ করেছিলেন, হরতাল তুলে নিতে।
শেখ হাসিনার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে। আন্দোলন দমন সম্ভব হয়নি ট্যাকটিকালি এটা সম্ভবও ছিল না। কারণ এক দিকে প্রধান মন্ত্রী যখন আলোচনা ও শান্তির কথা বলছেন, তখন তার পক্ষে সংঘর্ষ ও অশান্তির দিকে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ইলেকশন অনুষ্ঠানের দাবিতে বিরোধী জোটের চূড়ান্ত আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে হতাহতের সংখ্যা হয়েছে কম। ভবিষ্যতে আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা হবে বেশি। কারণ তখন সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে।
বুধবার ৩০ অক্টোবরে প্রায় সব দৈনিক পত্রিকা দুই নেত্রীর টেলি সংলাপ প্রকাশ করে। তবে সাধারণ পাঠক এখানে হোচট খেয়েছেন। কারণ কোনো পত্রিকাই সংলাপের সঠিক পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি। তারা নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে সংলাপের অসম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেছে। যদিও তাদের কেউ কেউ, যেমন- প্রথম আলো দাবি করেছে, হুবহু বিবরণ প্রকাশ করা হলো।

স্লামালাইকুম
জি, এডিসি সাহেব।
হ্যা, শিমূলদা, আপনি তো ফোন দিলেন না।
না, না। আমরা তো অপেক্ষা করছি আপনার জন্য। ৬টা থেকে ম্যাডাম বসে রয়েছেন।
না, না। আপনাদের তো কল করার কথা।
না। এ রকম কোনো কথা তো আপনার সঙ্গে আমার হয়নি। আপনি ৬টায় ফোন দেবেন। ম্যাডামকে আমি আধ ঘণ্টা ধরে বসিয়ে রেখেছি।
আমি আপনাকে বলিনি যে আমি ফোন দেব। বিকজ আমরা এক্সপেক্ট করছি আপনারা ফোন দেবেন।
না, আপনি উল্টা কথা বলছেন। এ ধরনের কোনো কথা হয়নি। আমি ম্যাডামকে বলেছি ...
না, আমিও তো বলিনি যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ফোন দেবেন। আমি বলেছি... আপনি টেলিফোন করে মিলিয়ে দেবেন। এটা আপনার ডিউটি, আপনি টেলিফোন করিয়ে মিলিয়ে দেবেন। ম্যাডাম এখন পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন।
আমরা অপেক্ষা করছি আপনার কলের জন্য।
ম্যাডাম এখনো বসে আছেন। আপনি দেন, এখনই দেন। ম্যাডামকে দিচ্ছি আমি।
আছেন ওখানে আপনারা?
জি, জি। ম্যাডাম এখনো আছেন।
আচ্ছা, ওয়েট করেন।

ম্যাচ ওপেনিংয়ের আগে পিচ পরীক্ষাতেই দুই দলের মধ্যে মতানৈক্য দেখা গেল। এখানে শিমূল বিশ্বাস জিতলেন। কারণ দেশবাসী জানত ফোন কল আসবে প্রধান মন্ত্রীর কাছ থেকে। ২০ অক্টোবরে দুপুরে ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পর শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সেদিনই তিনি খালেদা জিয়াকে ফোনের চেষ্টা করেছিলেন। এরপর ২৫ অক্টোবর বিকালের জনসভায় খালেদা জিয়া সরকারকে প্রস্তাব দিতে বলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিঠিও দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। সুতরাং প্রধান মন্ত্রীর এডিসি যখন ২৬ অক্টোবরে ফোন করেন, তখন বল সরকারের হাতে ছিল।
খালেদা জিয়া : হ্যালো, হ্যালো।
শেখ হাসিনা : হ্যালো, স্লামালাইকুম, কেমন আছেন?
খালেদা জিয়া : আমি আছি, ভালো আছি।
শেখ হাসিনা : আমি ফোন করেছিলাম আপনাকে দুপুর বেলা, পাইনি।
খালেদা : দেখেন, এই কথাটা যে বলছেন, তা সঠিক নয়।
হাসিনা : আমি আপনাকে জানিয়ে দিতে চাই...
খালেদা : আপনাকে প্রথমে আমার কথা শুনতে হবে। আপনি যে বলছেন, দুপুরে ফোন করেছিলেন, দুপুরে কোনো ফোন আসেনি। এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। দুপুরে কোনো ফোন আসেনি আমার এখানে।
হাসিনা : আমি রেড ফোনে ফোন দিয়েছিলাম।
খালেদা : রেড ফোন তো দীর্ঘদিন ধরে, বছর ধরে, ডেড পড়ে আছে। আপনারা গভর্নমেন্ট চালান, কি খবর রাখেন? গভর্নমেন্ট চালাচ্ছেন, এই খবর রাখেন না যে বিরোধী দলীয় নেতার ফোন ঠিক আছে কি না। আর আপনি যদি ফোন করবেনই, তাহলে গতকালই আপনার লোক এসে ফোন ঠিক করে দেয়া উচিত ছিল। দেখে যাওয়া উচিত ছিল যে বিরোধী দলীয় নেতার ফোন ঠিক আছে কি না।
হাসিনা : রেড ফোন সব সময় ঠিক থাকে।
খালেদা : আপনারা লোক পাঠান। এখনই লোক পাঠান। দেখে যান ফোন ঠিক আছে কি না।
হাসিনা : আপনি তো প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। আপনি জানেন, রেড ফোন সব সময় ভালো থাকে।
খালেদা : ভালো থাকে তো, তবে আমারটা ভালো নেই। আমারটা তো ভালো নেই।
হাসিনা : ভালো আছে, আমি যখন ফোন করেছিলাম, সেটা ভালো ছিল।
খালেদা : না, সেদিনও চেক করেছি। আপনারা যদি সত্যি কথা না বলেন, তাহলে চলবে না।
হাসিনা : আমার সত্যি কথা না বলার তো কিছু নেই। আমি কয়েকবার ফোন দিয়েছি।
খালেদা : হঠাৎ করে কি মৃত ফোন জেগে উঠবে? আপনার টেলিফোন এত পাওয়ারফুল যে, ডেড ফোন জেগে উঠবে!
হাসিনা : ঠিক আছে, যেকোনো কারণেই আপনি ফোনটা ধরতে পারেন নাই।
খালেদা : না, ধরতে পারি নাই, না। আমি এখানে বসা। আমি এর মধ্যেই ঘুরি। ছোট্ট জায়গা, ছোট্ট জায়গার মধ্যেই আমি ঘুরি। এই ফোন বাজলে আমি না ধরার কোনো কারণ থাকতে পারে না। ডেড ফোন বাজতে পারে না। বুঝেছেন? এটাই হলো সত্যি কথা।
হাসিনা : দেখুন, ডেড ছিল, না ডেড করে রাখা হয়েছে...
খালেদা : ডেড ছিল। বহু কমপ্লেইন আপনাদের কাছে গেছে। কিন্তু আপনারা তো... রেড ফোনে আমার সঙ্গে কথা বলার লোক নেই। কাজেই আমি কার সঙ্গে কথা বলব?
হাসিনা : আমি আগামীকাল দেখব, কেন আপনার ফোন এ রকম ডেড ছিল।
খালেদা : সে তো দেখবেন, ভালো কথা।

কৃকেট প্রেমীরা জানেন, ফার্স্ট ওভারটি কত ইম্পরটেন্ট। ফার্স্ট ওভারেই যদি বোলার একটা উইকেট নিতে পারেন, তাহলে তার দলের আধিপত্যের সূচনা হয়। অন্য দিকে ফার্স্ট ওভারে যদি ওপেনিং ব্যাটার রান করতে পারেন, তাহলে তার দলের আধিপত্যের সূচনা হয়। বাউন্ডারি হাকালে তো কথাই নেই। ওভার বাউন্ডারি বা ছক্কা মারলে তো সুপার-ডুপার।
দেখা যাচ্ছে ফার্স্ট ওভারের ফার্স্ট বলেই হাসিনা নো-বোল করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি ফোন করেছিলাম আপনাকে দুপুর বেলা। পাইনি।’
এর উত্তরে খালেদা বলেননি যে, হাসিনা মিথ্যা বলছেন। খালেদা বলেন ভদ্রভাবে, কথাটা সঠিক নয়। এখানে খালেদার সংযম প্রশংসনীয়। বিরক্তিকর এবং টেনশনপূর্ণ প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষার পর খালেদা এমন কথা শোনার জন্য প্রস্তত ছিলেন না। সংলাপের কমান্ড ও কনট্রোল তিনি তখনই নিয়ে নিতে মনস্থির করেন। তাই তিনি কমান্ডিং টোনে বলেন, ‘আপনাকে প্রথমে আমার কথা শুনতে হবে। আপনি যে বলছেন দুপুরে ফোন করেছিলেন, দুপুরে কোনো ফোন আসেনি। এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। দুপুরে কোনো ফোন আসেনি আমার এখানে।’
একটা ছক্কা মারলেন খালেদা।
এরপর যখন হাসিনা বলেন, ‘আমি রেড ফোনে ফোন দিয়েছিলাম’, তখন খালেদ টোটাল কমান্ড নিতে এগিয়ে যান।
খালেদা বলেন, ‘রেড ফোন তো দীর্ঘদিন ধরে, বছর ধরে, ডেড পড়ে আছে। আপনারা গভর্নমেন্ট চালান, কি খবর রাখেন? গভর্নমেন্ট চালাচ্ছেন, এ খবর রাখেন না যে বিরোধী দলীয় নেতার ফোন ঠিক আছে কি না। আর... গতকালই আপনার লোক এসে ফোন ঠিক করে দেয়া উচিত ছিল। দেখে যাওয়া উচিত ছিল, বিরোধী দলীয় নেতার ফোন ঠিক আছে কি না।’
খালেদা আরেকটি ছক্কা মারলেন।
খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন এবং তার প্রথম মেয়াদের শাসনকাল এখনো দেশের সবচেয়ে ভালো এবং গণতান্ত্রিক সময় রূপে পরিচিত হয়ে আছে। সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া বর্তমান প্রধান মন্ত্রীর প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা তুলেছেন। হাসিনা এর সদুত্তর দিতে পারেননি। খালেদা এখানে আরো বলতে পারতেন, এ জন্যই প্রধান মন্ত্রী হাসিনা জানেন না কুইক রেন্টাল সত্ত্বেও কতবার লোড শেডিং হচ্ছে, সরকারি ব্যাংকগুলো কিভাবে লুটপাট হচ্ছে, দেশে খুন-রাহাজানি-ছিনতাই কত বেশি হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম কিভাবে বাড়ছে।
এরপর খালেদা আদেশ দেন হাসিনাকে, ‘আপনার লোক পাঠান। এখনই লোক পাঠান। দেখে যান ফোন ঠিক আছে কি না।’
খালেদা দুই রান করলেন।
হাসিনাকে তিনি অর্ডার দিলেন, যে অর্ডারটি পরে হাসিনা পালন করতে বাধ্য হন।
হাসিনা তবু বলেন, ‘রেড ফোন সব সময় ভালো থাকে।’
প্রতি উত্তরে খালেদা বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যি কথা না বলেন, তাহলে চলবে না।’
লক্ষ্যণীয় যে, খালেদা কখনোই বলছেন না, হাসিনা মিথ্যা বলছেন। অর্থাৎ প্রচণ্ড বিরক্তি সত্ত্বেও খালেদা তার ভাষায় সংযম রক্ষা করে চলছেন।
কিন্তু এরপরও যখন হাসিনা ডেড ফোন প্রসঙ্গটা লাইভ রাখেন, তখন খালেদা সারকাজম (Sarcasm)-এ বা শ্লেষাত্মক ভাষায় চলে যান। খালেদা বলেন, ‘হঠাৎ করে কি মৃত ফোন জেগে উঠবে? আপনার টেলিফোন এত পাওয়ারফুল যে ডেড টেলিফোন জেগে উঠবে?... ডেড ফোন বাজতে পারে না। বুঝছেন? এটাই হলো সত্যি কথা।’ খালেদা এরপরও কিছু শ্লেষাত্মক বাক্য প্রয়োগ করেছেন।
সুপার ব্যাটিং। আরেকটা ছক্কা।
এরপর হাসিনা একটা লুজ (Loose) বা ঢিলা বল করেন। তিনি বলেন, ‘দেখুন, ডেড ছিল, না ডেড করে রাখা হয়েছে ...’
খালেদা বলেন, ‘ডেড ছিল। বহু কমপ্লেইন আপনাদের কাছে গেছে...’
হাসিনা বলেন, ‘আমি আগামীকাল দেখব, কেন আপনার ফোন এ রকম ডেড ছিল।’
ফার্স্ট ওভারে আলোচ্য বিষয় ছিল ডেড রেড টেলিফোন। ফোন করা বিষয়ে হাসিনার অসত্য বলার কারণ ছিল। তিনি চেয়েছিলেন ২৬ অক্টোবরের শেষ মুহূর্তে ফোন করতে। ফোন রিসিভ করা বিষয়ে খালেদার অসত্য বলার কোনো কারণ ছিল না। তিনি যদি ফোন রিসিভ না করতে চাইতেন, তাহলে শনিবার ফোনের অপেক্ষায় বসে থাকতেন না এবং ৬টা ২১-র কলও রিসিভ করতেন না। তার জন্য এই কল ছিল খুবই ইমপরটেন্ট। কারণ, এরই ওপর নির্ভর করছিল আগামী আন্দোলনের কর্মসূচি।
রেড ফোন বিষয়ে হাসিনা যে অকাতরে মিথ্যা বলেন, সেটা প্রতিষ্ঠিত হয় সোমবার ২৮ অক্টোবর। ওই দিন বিটিসিএলের কর্মকর্তারা এসে খালেদার রেড ফোন সচল করেন।
হাসিনা যে আন্তরিক ছিলেন না, সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০ অক্টোবর যেদিন পেশাজীবী সম্মেলনে চায়না-বাংলা মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে খালেদার যাওয়ার কথা ছিল, সেদিন সকাল থেকে পুলিশ পাহারা দিচ্ছিল খালেদার বাসভবনের সামনে। ২৬ অক্টোবর শনিবার সকাল অথবা দুপুরে শেখ হাসিনার সদিচ্ছা থাকলে কোনো পুলিশ অফিসারকে খালেদার বাসভবনে পাঠিয়ে মেসেজ দিতে পারতেন। টিএন্ডটিতে খোজ নিতে পারতেন। অথবা মোবাইল ফোনে খালেদার কোনো স্টাফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। সেটা তিনি করেননি।
এখানে লক্ষণীয়- খালেদা কখনো বলেননি, আপনিই (হাসিনা) আমার লাইন কেটে দেয়ার অর্ডার দিয়েছেন। যেমনটা আপনার ইঙ্গিতেই বিচার বিভাগের যোগসাজশে আমার বাড়ি থেকে আমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। যেমনটা এসএসএফ-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। যেমনটা- সরকারি গাড়ি প্রত্যাহার করা হয়েছিল। যেমনটা- আমার বর্তমান গুলশানের ভাড়া বাড়ি থেকে উচ্ছেদের প্ল্যান করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে রেড টেলিফোন ডেড করে দেয়াটা এমন আর কি?
আরো লক্ষণীয়, অচল টেলিফোন বিষয়ে সাধারণত মানুষ বলে থাকে, লাইন কেটে দেয়া হয়েছে, লাইন কাটা আছে, ইত্যাদি। কিন্তু খালেদা ‘লাইন কাটা’ বাক্যটি প্রয়োগ করেননি।
সেকেন্ড ওভারে আলোচ্য বিষয় ছিল- ২৭ অক্টোবর থেকে ডাকা ৬০ ঘণ্টা হরতাল তুলে নেয়া।

হাসিনা : আমি আপনাকে ফোন করলাম। আগামী ২৮ তারিখে ... সন্ধ্যায় গণভবনে আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি। আপনি জানেন, আমি এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি আগামী ইলেকশন সম্পর্কে। আমি আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি। ... গণভবনে আসার জন্য।
খালেদা : আপনার যদি সত্যিকারের আন্তরিকতা থাকে আলোচনা করার জন্য, আমার যেতে কোনো আপত্তি নেই। আমি একা যাব না। আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই আরো কেউ থাকবে।
হাসিনা : আপনি যতজন খুশি নিয়ে আসতে পারেন। সমস্যা নেই।
খালেদা : আমি দলবল নিয়ে যেতে চাই না। যাদের প্রয়োজন মনে করব, তাদের নিয়ে যাব। সেটা হতে হবে ২৮ তারিখের পর। ২৯ তারিখ আমার হরতাল শেষ হওয়ার পর।
হাসিনা : আমি অনুরোধ করব জাতির স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে হরতাল প্রত্যাহার করে নেন।
খালেদা : না। আমি ২৮ তারিখ যেতে পারব না।
হাসিনা : মানুষ খুন করা, আগুন মারা- এসব বন্ধ করুন।
খালেদা : মানুষ খুন করা আপনাদের কাজ। আপনারা মানুষ জ্বালান, মানুষ মারেন, লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মারেন। এসব রেকর্ডেড। আপনার নির্দেশে এবং আপনার মুখ দিয়েই এই শব্দ বেরিয়েছে। কাজেই এসব আপনি অস্বীকার করতে পারবেন না। আমি বলছি, হরতাল চলবে। ২৯ তারিখ সন্ধ্যায় শেষ হবে। এরপর আলোচনা।
হাসিনা : আমি বলছি দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে দয়া করে এই হরতাল প্রত্যাহার করুন।
খালেদা : না। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থেই আমি এই হরতাল দিয়েছি। যেহেতু আপনারা কোনো আলোচনায় আসতে রাজি নন। আপনার মন্ত্রীরা বলছেন, কোনো আলোচনা হবে না। আপনি নিজে বলেছেন। আমাদের প্রস্তাব রিজেক্ট করে দিয়েছেন। কোনো আলোচনার দরকার নেই, এটা আপনারা বলছেন। এখন আবার আলোচনার কথা বলছেন। সেই আলোচনা হতে পারে, আমাদের কর্মসুচি শেষ হওয়ার পর।
হাসিনা : আমি আপনাকে অনুরোধ করছি...
খালেদা : না। সেটা সম্ভব না। উদ্যোগটা যদি এক দিন আগে নিতেন, সেটা সম্ভব ছিল।
হাসিনা : এটা এক দিন আগের বিষয় নয়। আপনি জানেন, আমি বিভিন্ন দলের সঙ্গে বসছি...
খালেদা : আমি জানি, আপনি ব্যস্ত মানুষ। আপনার মতো ব্যস্ত না হলেও আমাদেরও ব্যস্ততা আছে। ইচ্ছা করলে উপায় বের করা যায়। কিন্তু আপনারা সেটা করেননি। কালকে যে আমাদের সমাবেশের পারমিশন দিলেন, এত দেরিতে দিলেন কেন? কত দিন আগে পারমিশন চেয়েছি। মাইক পর্যন্ত লাগাতে দেন না। মানুষ এসে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কথা শুনতে পারে না। এটা কোন দেশের গণতন্ত্রের নমুনা দেখছেন আপনি?
হাসিনা : আমি যে সবার সঙ্গে আলোচনা করব, সেটা কিন্তু বহুদিন আগেই সবাইকে...
খালেদা : আমরা যে সমাবেশ করলাম, সেখানে মাইকের পারমিশন দেয়া কেন হলো না?
হাসিনা : না, মাইক তো দেয়া হয়েছে। কয়েকটা মাইক ছিল।
খালেদা : না, আমরা যত দূর ইচ্ছা মাইক দেব। লোক বেশি শুনবে। লোক আসবে এ জন্য গাড়ি বন্ধ করে দেন, ১৪৪ ধারা জারি করেন। দেশে ইমার্জেন্সি চলছে নাকি? দেশে কি যুদ্ধ অবস্থা চলছে যে এমন শুরু করে দিলেন আপনারা?
হাসিনা : আমি এ ব্যাপারে এখন আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি না।
খালেদা : কথা বলতে না চাইলে তো কথাই নেই।
হাসিনা : কথাগুলো সত্য না। আপনারা তো মিটিং করছেন।
খালেদা : আপনারা মিটিং করতে দেবেন, মাইক দেবেন না। এমন সময় পারমিশন দেবেন, যখন ডায়াসও বানাতে পারব না। আপনারা কি আগে মিটিং করেন নাই?
হাসিনা : সব মনে আছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা মনে আছে...
খালেদা : গ্রেনেড হামলা আমরা করিনি, আপনারাই করেছেন।
হাসিনা : রাত ১১টায় পারমিশন দিয়েছেন, সেটাও মনে আছে। এসব কথা আপনাদের মুখে মানায় না।
খালেদা : মুক্তাঙ্গনে সমাবেশ ছিল। সেখান থেকে যে ভেনু পরিবর্তন করে আপনাদের অফিসে নিয়ে গেছেন, সেটা পর্যন্ত আমাদের জানাননি। এসব পুরনো কথা বাদ দেন। এখন আপনাকে আমি বলছি, যদি সত্যিকারের আলোচনা করতে আন্তরিক হন, তাহলে আমাদের কর্মসূচির পর...
হাসিনা : আমরা নিশ্চয় ঝগড়া করতে চাই না।
খালেদা : আপনি তো ঝগড়া করছেনই।
হাসিনা : আপনি একতরফাই তো বলে যাচ্ছেন। আমাকে তো কথা বলারই সুযোগ দিচ্ছেন না।
খালেদা : আমি একতরফা বলব কেন। আপনি কথা বলছেন, আমি জবাব দিচ্ছি শুধু।
হাসিনা : আমি তো আপনার সঙ্গে কথা বলারই সুযোগ পাচ্ছি না।
খালেদা : আপনি বারবার বলছেন, হরতাল হরতাল। হরতাল এখন প্রত্যাহার হবে না। আমাদের কর্মসূচি শেষ হলে এরপর যদি... আপনি জানেন। আপনি যদি ...
হাসিনা : হরতালের নামে মানুষ খুন করা অব্যাহত রাখবেন?

এখানে খালেদা ধরিয়ে দিয়েছেন ‘খুন’ শব্দটিতে হাসিনা অভ্যস্ত। এমনকি এই ফোন সংলাপে হাসিনাই প্রথম মানুষ খুন করা, আগুন মারা, প্রভৃতি বাক্য ব্যবহার করেছেন।
তৃতীয় ওভারে খুনের প্রতি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের আসক্তি আলোচিত হয়। 

খালেদা : আমি মানুষ খুন করতে চাই না। আপনারা মানুষ খুন করছেন। কালকেও আমার নয় জন মানুষ খুন করেছেন আপনারা।... আপনার ছাত্রলীগ, যুবলীগ করে না?
হাসিনা : না।
খালেদা : আপনার ছাত্রলীগ-যুবলীগের আমরা অস্ত্রসহ ছবি দেখাতে পারব। আপনার ছাত্রলীগ-যুবলীগ কিভাবে খুন করে নিরীহ মানুষকে।
হাসিনা : বললাম তো, খুনের রাজনীতি আমরা করি না; বরং আমি দেখি...
খালেদা: ...আপনাদের তো পুরনো অভ্যাস। আপনারা সেই স্বাধীনতার পর থেকে ’৭১-এ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখনো এই হত্যা করেছেন। এত মানুষ হত্যা করেছেন। এগুলো ভুলে গেছেন আপনি?
হাসিনা : একাত্তরে আমরা মানুষ হত্যা করেছি?
খালেদা : হ্যা অবশ্যই, একাত্তরের পর।
হাসিনা: যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য।
খালেদা : যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য নয়। আপনারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যদি ঠিক মতো করতেন, তাহলে আমরা পূর্ণ সমর্থন দিতাম। কিন্তু আপনারা সেই ট্রাইবুনাল করেননি। না করে একতরফা করেছেন এবং আপনার দলে যে অনেক যুদ্ধাপরাধী আছে, সেগুলো একটাও ধরেননি। সেগুলোকে একটাও কেন ধরেননি? আপনি তো প্রধান মন্ত্রী নন। দলের প্রধান মন্ত্রী। আপনি তো দেশের প্রধান মন্ত্রী হতে পারেননি। নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে আপনি যেতে পারেননি। নাহলে আমার সঙ্গে এই আচরণ তো আপনারা করতেন না, যা করেছেন আপনারা। আমার সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, সেদিন আমার পার্টি অফিসে আপনারা যে আচরণ করলেন, এরপর আর বলতে হবে? বিরোধী দলীয় নেতাকে আপনারা সম্মান দিতে জানেন না। কিসের গণতন্ত্রের কথা বলেন আপনি?

এখানে স্বাধীনতার পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন আমলে মানুষ হত্যা বিষয়টি খালেদা মনে করিয়ে দিয়েছেন। তবে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধাবশত তিনি তার নাম উচ্চারণ করেননি, যদিও হাসিনা সর্বদাই জিয়াউর রহমানের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন।
লক্ষণীয় যে, রক্ষী বাহিনীর নাম খালেদা করেননি। কথিত আছে, শেখ মুজিবের আমলে এই বাহিনীর হাতে অন্ততপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
আরো লক্ষণীয় যে, এখানে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে অন্ততপক্ষে ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি খালেদা বলেননি।
প্রধান মন্ত্রী হওয়ার পর যে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধে হাসিনা উঠতে পারেননি, সেটাও দৃঢ়ভাবে বলে দিয়েছেন খালেদা। হাসিনার স্বৈরাচারী চরিত্রের উল্লেখ করেছেন ২১ অক্টোবর নয়া পল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে ছাত্রদল নেতা টুকুর গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা নিয়ে। সেই রাতে ১১টার সময় খালেদা গিয়েছিলেন অসুস্থ বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীকে দেখতে। ফেরার সময় খালেদার নিরাপত্তা স্টাফ, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মজিদকে হেনস্তা করে পুলিশ এবং টুকুকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। এসবই ঘটে খালেদার চোখের সামনে। তবে তিনি সেখান থেকে সরে যাননি। বাকি সব নেতা-কর্মীকে নিরাপদে বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দিয়ে সবশেষে তিনি নিজে গুলশানে ফিরে যান।
হাসিনার এই অগণতান্ত্রিক আচরণ তুলে ধরার জন্য দুই রান।
চতুর্থ ওভারটি ছিল অতীত নিয়ে।
খালেদা নিকট অতীতে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন আমলে ফিরে যান। হাসিনা ফিরে যান আরো আগে।

হাসিনা : আপনার কথার জবাব দিতে গেলে আমাকে তো সেই ২০০১ থেকে অনেক কথা বলতে হবে।
খালেদা : সেটার জবাব আমিও দিতে পারি। আপনি দেবেন, আমিও দিতে পারি...
হাসিনা : ... এরশাদ বা তার দলের সঙ্গে কি কি করেছিলেন। আর ২০০১ সালে ...
খালেদা : একাত্তর সালে আমরা কিছু করিনি। এরশাদের সময় যত করেছেন আপনারা। এরশাদ যখন একটি নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা নিল, এরপর আপনি বললেন, আই এম নট আনহ্যাপি। আপনি যখন বিবিসিকে বললেন, এরপর আর কি থাকে? ... ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন কোন সংবিধানের অধীনে ক্ষমতা নিল ...
ঘাসিনা : ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন আপনার চয়েস ছিল।
খালেদা : ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন আমার চয়েস ছিল না। আপনার চয়েস ছিল। আপনি নিজে বলেছেন, আমার আন্দোলনের ফসল। এগুলো ভুলে যান কেন? মানুষ তো ভুলে না সেগুলো।
ঘাসিনা : নয় জন অফিসার ডিঙিয়ে মইনুদ্দিনকে আপনি আর্মি চিফ বানিয়েছিলেন।
খালেদা : আপনি এমন অনেক অফিসারকে বাড়ি পাঠিয়েছেন। সেটা নয় জন না সাত জন, সেটা কথা নয়। আপনি অনেককে ডিঙিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছেন। মইনুদ্দিন যেই থাকুক না কেন, যখন এটা করল, সেখানে আপনারা ... সেই ইয়েতে (শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে) গেলেন কেন আপনি? সেটা সংবিধান সম্মত হয়নি। সংবিধান সম্মত ছিল না। সেটাতে কেন গেলেন আপনি? সেদিন তো আপনি মনে করেননি। আমরা দুই দলই তখন ক্ষমতার বাইরে ... তখন তো একবারও মনে করলেন না আমরা আলোচনা করি, ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের ওখানে যাওয়া ঠিক হবে না। তারা সংবিধান সম্মত নয়। আপনি তো সেটা মনে করলেন না। চলে গেলেন সেখানে হাসিমুখে।
হাসিনা : ...আমি আগুনে বসেও পুষ্পের হাসি। আমার বাবা, মা, ভাই...

এখানে হাসিনা বিষয়টিকে হালকা করে ফেলেন। কিন্তু খালেদা তাকে মনে করিয়ে দেন, এরশাদসহ সামরিক বাহিনীর অফিসারদের সঙ্গে হাসিনার গভীর সম্পর্ক। খালেদা বলতে পারতেন, আপনার জন্য ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের সময়টা আগুন ছিল না, সেটা আপনার জন্য ছিল ফুলের বাগান। তাই আপনি বলতে পারেন, ফুলের হাসি হেসেছেন। পেরলে মুক্তি নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় আপনার মুখে হাসিই ছিল। সেই সময়টা আগুন ছিল আমার জন্য এবং আমার দলের জন্য। আমি এক বছর জেলে থেকেছি।
হাসিনা ১৯৭৫-এ ফিরে যান। ছোট ভাই প্রসঙ্গের পর তিনি তার বহুল ব্যবহৃত বাবা-মা’র প্রসঙ্গটি টেনে আনতে চান।

খালেদা : ... অতীত ছেড়ে দিয়ে আমি বলতে চাই, এখন সামনের দিকে কি করে আগাবেন... আপনার যদি সত্যি সৎ উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে আমরা সামনের দিকে কি করে এগোবো... সামনের দিকে এগোতে চাই।
হাসিনা : আপনি তো অনেক অভিযোগ করলেন। আমি তো এত অভিযোগ করতে চাই না। ... ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছেন।
খালেদা : দেখেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আপনারা করিয়েছেন। আপনাকে হত্যা করতে কেউ চায়নি। ... আপনি যত থাকবেন, তত আমাদের জন্য ভালো। ... আপনি যত এ রকম অশ্লীল ভাষায় কথা বলবেন, তত আমাদের জন্য ভালো।
হাসিনা : ১৫ আগস্ট আপনি যখন কেক কাটেন ...
খালেদা : ১৫ আগস্ট আমার জন্মদিন। আমি কেক কাটবই।
হাসিনা : খুনিদের উৎসাহিত করার জন্য যখন আপনি কেক কাটেন।...
খালেদা : ... এটা বলবেন না। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে কোনো মানুষের জন্ম হবে না? কোনো মানুষ পালন করবে না? এগুলো বাদ দেন। কথায় কথায় আপনারা বলেন। অনেক কথা বলেন জিয়াউর রহমানকে। আরে, জিয়াউর রহমান তো আপনাদের নতুন জীবন দান করেছেন। এগুলো কথা বলবেন না। বুঝেছেন! আপনারা তো বাকশাল ছিলেন। ... আপনারা জিয়াউর রহমানের বদৌলতে আওয়ামী লীগ হতে পেরেছেন। আদারওয়াইজ আওয়ামী লীগ হতে পারতেন না।
হাসিনা : ... রাসেলকে তো এই বাসায় ঘুরতেও দেখেছেন...

এখানে শেখ হাসিনার ভাষা সম্পর্কে বহুল প্রচলিত কথাটি তাকে শুনিয়ে দিয়েছেন খালেদা জিয়া। অন্য দিকে শেখ হাসিনা শুনিয়ে দিয়েছেন ১৫ আগস্টে খালেদার জন্মদিনে কেক কাটার বিষয়টি। খালেদা দৃঢ়ভাবে নিজেকে ডিফেন্ড করে ব্যাট করেছেন। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ ওঠার সুযোগে তিনি বর্তমান আওয়ামী লীগের জন্মদাতা হিসেবে জিয়াউর রহমানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সিম্পলি বৃলিয়ান্ট। চার রান।
লক্ষণীয় যে, জিয়াউর রহমানের নাম ভাঙিয়ে খালেদা কোনো করুণা বা দয়া ভিক্ষা করেননি। খালেদা মনে করিয়ে দেননি, হাসিনার প্রথম মেয়াদে প্রধান মন্ত্রিত্বের সূচনাতেই জিয়ার মাজারে যাওয়ার বেইলি বৃজটি মিথ্যা অজুহাতে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। কবরে জিয়ার লাশ আছে কিনা, সেই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।


জাতীয়- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত