অঘোষিত গৃহযুদ্ধে খালেদা জিয়ার প্রাপ্য জনতার সাহস ও দেশপ্রেম

শফিক রেহমান

জাতীয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রধান মন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাহস, দেশপ্রেম ও আপসহীন নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে পরিচিত

2026-08-31T22:16:07+06:00
2026-09-09T08:15:16+06:00
বৃহস্পতিবার ● ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
জাতীয়
অঘোষিত গৃহযুদ্ধে খালেদা জিয়ার প্রাপ্য জনতার সাহস ও দেশপ্রেম
শফিক রেহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৬ পিএম  আপডেট: ০৯.০৯.২০২৬ ৮:১৫ এএম 
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাবেক প্রধান মন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাহস, দেশপ্রেম ও আপসহীন নেতৃত্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন দেশ ও জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিবেদিত ছিল। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জাতীয় সংকটে খালেদা জিয়া কখনো দেশ ছেড়ে যাননি বা স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস করেননি। বিশেষ করে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক সংকটের সময় তাকে দেশ ছাড়ার চাপ দেয়া হলেও তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘আমার দেশের বাইরে কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার ঠিকানা।’ চরম ব্যক্তিগত সংকট, সাব-জেল ও জেল এবং পরিবারের ওপর নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি দেশের মাটি ছেড়ে যাননি, যেটা তার দৃঢ় মনোবল ও অসীম সাহসিকতার প্রমাণ দেয়। 
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৭ বছরের শাসন আমলে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধান মন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনৈতিক আন্দোলন, কারাবাস এবং শারীরিক নির্যাতনের এক দীর্ঘ ও বর্বরোচিত ইতিহাসের মুখোমুখি হন। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮-তে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে ১৭ বছরের জেলদণ্ড দেয়া হয় এবং বন্দি করা হয় পুরনো ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের জেলে। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বিএসএমএমইউ হসপিটালে রাখা হয়। ২০২০ সালের মার্চে সরকারের নির্বাহী আদেশে কিছু শর্ত সাপেক্ষে তার সাজা স্থগিত করে তাকে গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় রাখা হয়, যেখানে তিনি এক ধরনের গৃহবন্দি ও অসুস্থ জীবন কাটান। ২০১৪-তে একতরফা ইলেকশন প্রতিরোধ এবং ২০১৫-তে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ইলেকশনের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। 
তার এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও আপসহীন অবস্থান তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে স্থায়ী প্রতীক করে তুলেছে। খালেদা জিয়া তার আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাপ্য অনুপ্রেরণা হিসেবে পেয়েছেন জনতার সাহস ও দেশপ্রেম। 
দৈনিক পত্রিকা অফিসে সকাল বেলাটা হচ্ছে ডেড আওয়ার। বেলা ১২টা পর্যন্ত সেখানে উপস্থিতির সংখ্যা থাকে খুব কম। সিটি এডিশন ছাপানো, প্যাকিং ও ডেলিভারি শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভোর রাত থেকে পত্রিকা অফিস হয়ে যায় প্রায় মৃত। তখন থাকে না রোটারি প্রেসের শব্দ। থাকে না কম্পিউটার স্কনের আলো। থাকে না রুম থেকে রুমে স্টাফের চলাচল। সকালে ক্লিনাররা আসার পর থেকে পত্রিকা ভবন জেগে উঠতে শুরু করলেও বেলা ১১টার দিকে চিফ রিপোর্টারের মিটিং শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত অন্যান্য স্টাফ থাকে খুব কম।
তাই এমন সময়টাই পুলিশ বেছে নেয় পত্রিকা অফিসে হামলা করার জন্য। তাই এমন সময়েই পুলিশ কাওরান বাজারে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অফিসে হামলা চালিয়ে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করতে পেরেছিল ন্যূনতম বাধার মুখে।
কোনো সম্পাদকই এই সময়টায় অফিসে থাকেন না। কিন্তু মাহমুদুর রহমান চার মাসেরও বেশি সময় আমার দেশ পত্রিকা অফিসে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা কাটাচ্ছিলেন। কারণ, তিনি আশঙ্কা করছিলেন অফিস থেকে বের হলেই বিনা প্রতিরোধে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারবে। সেই সুযোগটা তিনি পুলিশকে দিতে চাননি। ফলে শেষ-অবধি পুলিশ বাধ্য হয় তার অফিস থেকে তাকে গ্রেফতার করতে এবং সে জন্য বেছে নেয় সকাল বেলা।
দৈনিক শুকতারার সম্পাদক শামীম প্রচলিত রীতি ভেঙে সেদিন বেলা ১১টায় নিউজ রিপোর্টিং আর এডিটিং বিভাগের সব সিনিয়র ও জুনিয়র স্টাফদের উপস্থিত হতে নির্দেশ দিয়েছিল। সে নিজে বেলা ১১টার মধ্যে পৌছে গিয়েছিল। সেদিন ছিল রবিবার ১০ নভেম্বর ২০১৩। শুকতারার এসেম্বলি হলে স্টাফরা সমবেত হয়েছিল।
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হালকা শীতের পরশ ছিল। স্টাফদের পোশাকে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। পুরুষরা কেউ কেউ জ্যাকেট পরে এসেছিল। নারীরা সোয়েটার পরে। তাদের মুখে মৃদু গুঞ্জন ছিল, কেন শামীম ভাই আজ সকালে এ রকম একটা ইমার্জেন্সি মিটিং ডেকেছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে তাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি।
মিটিংয়ে শামীমের দুই পাশে বসল নিউজ এডিটর মরিয়ম খান মেরি ও চিফ রিপোর্টার ফয়েজ আনসারি, কান্টু এডিটর রমেন বোস, ফিচার এডিটর মৌসুমি হক।
শামীম বলা শুরু করল। তার হাতে ধরা ছিল সেদিন সকালের কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা।
প্রিয় বন্ধু ও প্রিয় বান্ধবীরা। তোমরা সবাই জানো, গত শুক্রবার রাত থেকে আওয়ামী লীগ সরকার চলে গেছে হার্ড লাইনে। মুখোমুখি সংঘর্ষ ও সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে সরকার। ঢাকায় গ্রেফতার করেছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের এবং সেই সঙ্গে বিএনপির কিছু অফিস স্টাফকে। আর সারা দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়ের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি শনিবারের কয়েকটি পত্রিকার ফ্রন্ট পেইজ দেখাচ্ছি। কয়েকটি হেডলাইন পড়ে শোনাচ্ছি।

মানবজমিন: হেড লাইন মওদুদ, আনোয়ার, রফিকুল, মিন্টু, শিমুল গ্রেফতার। সাবহেড ফখরুল, জমির, আব্বাস, গয়েশ্বর, খোকা, মান্নান, খোকন, ফারুক, আলাল, সালাম, সরোয়ার, এ্যানিসহ ৩০ নেতার বাসায় তল্লাশি, দেশ জুড়ে বিক্ষোভ, কাল থেকে ৭২ ঘণ্টার হরতাল।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : কেন্দ্রীয় নেতাদের গণ-গ্রেফতার। খালেদার অফিস-বাড়ি ঘেরাও, বাসায় বাসায় তল্লাশি।
কালের কণ্ঠ : বিএনপির পাচ শীর্ষ নেতা আটক।
যুগান্তর: মওদুদ, আনোয়ার ও রফিকুল গ্রেফতার।
সমকাল : মওদুদ, আনোয়ার ও রফিকুল গ্রেফতার।
নয়া দিগন্ত: মওদুদ আনোয়ার রফিক গ্রেফতার। মিন্টু ও শিমুল গ্রেফতার।
ইত্তেফাক: মওদুদ এমকে আনোয়ার রফিকুল মিয়া গ্রেফতার। মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বরসহ পাচ নেতার বাসায় অভিযান।
আমাদের অর্থনীতি: হার্ড লাইনে সরকার। মওদুদ এমকে আনোয়ার রফিকুল ইসলাম মিয়া গ্রেফতার।
প্রথম আলো: হরতাল ঘোষণার পর ধরপাকড়। কাল থেকে সারা দেশে টানা ৭২ ঘণ্টার হরতাল।
ডেইলি স্টার: গভর্নমেন্ট গোজ টাফ অন অপজিশন (বিরোধীদের প্রতি শক্ত হচ্ছে সরকার)। পত্রিকাগুলো ভাজ করে টেবিলে রেখে শামীম আবার বলা শুরু করল।

তোমরা লক্ষ্য করবে, কোনো পত্রিকাই হেডলাইন দিতে সাহস পায়নি, আসলেই পরশুদিন শুক্রবার থেকে সারা দেশে একটি অঘোষিত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এটা ঢাকায় বসে সরকার সমর্থক পত্রিকা পড়ে অথবা সরকার সমর্থক টিভি দেখে বোঝা যাবে না। জানা যাবে না। আমরা জানি সেটা। বিএনপি আহূত প্রথম টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালের প্রথম ঘণ্টা থেকেই এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। রবিবার ২৭ অক্টোবরের প্রথম প্রহর থেকেই মফস্বলে কঠোরভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। এর আগেই অসমর্থিত সূত্রে আমরা জানতাম, আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে তাদের সাজানো ইলেকশন করতে যায়, তাহলে ইনডিয়ান গোয়েন্দা সূত্রের মতে কমপক্ষে ২০টি জেলায় ব্যালট পেপার পৌছানো সম্ভব হবে না। সম্ভব হলেও ভোট কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট নেয়া সম্ভব হবে না। আমেরিকান গোয়েন্দা সূত্রের মতে, কমপক্ষে ৩০টি জেলায় ব্যালট পেপার পৌছানো সম্ভব হবে না। সাজানো ইলেকশনে জয়লাভকামী আওয়ামী লীগের জন্য পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ মনে হয়েছে দেশ জুড়ে হরতালের কঠোরতা দেখে। তারা মনে করেছে, পুলিশ পাহারা ছাড়া কয়েকটি আসনে আওয়ামী প্রার্থীরা পৌছাতেও পারবে না এবং এ রকম একটা এক তরফা ইলেকশন করলে প্রার্থীদের ও অন্যান্য আওয়মী নেতাদের বাড়িঘর আক্রান্ত হতে পারে।
পরের সপ্তাহে বিএনপি আহূত দ্বিতীয় টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন সোমবার ৪ নভেম্বরে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়। রাজধানী ও মফস্বলে এর কঠোরতা ছিল অপরিবর্তিত। বুধবার ৬ নভেম্বরে আবার দেশ জুড়ে হরতাল পালিত হয়।
পরপর দুই সপ্তাহে মোট এই ১২০ ঘণ্টার হরতালে আওয়ামী লীগ সরকার সিদ্ধান্তে আসে, রাজধানীর বাইরে বিএনপির কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যাপক এবং অটল। আগামীতে মফস্বলে এই অচল অবস্থা আরো বাড়বে, যদি কেন্দ্র থেকে বিএনপি হরতাল চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রশ্ন ছিল, এবার বিএনপি কয় দিনের এবং মোট কয় ঘণ্টার হরতাল ডাকবে এবং কবে?
শুক্রবার ৮ নভেম্বর দুপুরে বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোট ঘোষণা দেয়, রবিবার ১০ নভেম্বর থেকে টানা ৭২ ঘণ্টার হরতাল হবে। পরে এটাকে বাড়িয়ে টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালের ঘোষণা আসে। শুক্রবার বিএনপির ওই ঘোষণার পর সরকার পয়েন্ট অফ নো রিটার্নে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যে করেই হোক,
১. এই গণ-অবাধ্যতা বা সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স দমন করতে হবে।
২. সেই লক্ষ্যে বিএনপির নেতা ও সংগঠকদের গ্রেফতার করতে হবে।
৩. যারা নেতা নন, যেমন- খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, ব্যক্তিগত সহকারী শিমুল বিশ্বাস, কম্পিউটার অপারেটর হুমায়ুন কবির প্রমুখকে গ্রেফতার করতে হবে। অর্থাৎ, খালেদা জিয়ার সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ ছিন্ন করতে হবে।
৪. সেই লক্ষ্যে খালেদা জিয়াকে নিজের বাড়িতে অঘোষিত অন্তরীণ করে রাখতে হবে।
৫. বিএনপির অন্যান্য নেতা-সংগঠকদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালাতে হবে। ফলে অন্তত পক্ষে ঢাকার দুই অফিসে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি কমে যাবে। এর ফলে বিএনপির কর্মী মহলে উদ্বেগ-আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়বে। বিএনপি ছত্রভঙ্গ এবং হতবিহ্বল হয়ে পড়বে।
৬. এই পটভূমিতে রবিবার ১০ নভেম্বর থেকে ২৫ হাজার টাকায় আওয়ামী লীগের দফতর থেকে মনোনয়ন পত্র বিক্রি শুরু করতে হবে। শেখ হাসিনা-ই হবেন মনোনয়ন পত্রের প্রথম ক্রেতা এবং তিনি দাড়াবেন গোপালগঞ্জ থেকে। এটা অবশ্য সবারই জানা ছিল। কারণ, অন্য কোনো স্থান থেকে শেখ হাসিনা জিতবেন না। এমনকি সুষ্ঠু ইলেকশন হলে এবার গোপালগঞ্জ থেকেও তিনি হয়তো জিতবেন না।
৭. বিএনপি নেতা-সংগঠক-কর্মীদের গ্রেফতার করে প্রথমে তাদের রিমান্ডে পাঠাতে হবে এবং পরে বশীভূত বিচার ব্যবস্থার আওতায় তাদের জেলদণ্ড দিতে হবে।
৮. নির্বাচন কমিশনের রীতিনীতি উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় খরচে এখনই শেখ হাসিনা নির্বাচনী অভিযান শুরু করবেন।
৯. কিছু স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে দোষী প্রতিপন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে এই হামলার মাত্রা আরো ব্যাপক করতে হবে। যেন (ক) সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভীত হয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয় এবং (খ) ইনডিয়া এগিয়ে আসতে পারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাহায্যার্থে অথবা তাদের ভাষায় এ দেশে অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠা করতে।
১০. আগামী জানুয়ারির মধ্যে ইলেকশন সেরে ফেলতে হবে।
প্রাথমিক এই ১০টি লক্ষ্যের মধ্যে শেষটি বাদে অন্যসব লক্ষ্যই আওয়ামী সরকার ইতিমধ্যে কমবেশি অর্জন করেছে। একটি ব্যতিক্রম মারুফ কামাল খান। শুক্রবার রাতে হাতের কাছে পেয়েও তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই আত্মগোপনে আছেন। শুধু রুহুল কবীর রিজভী নয়া পল্টনে তার অফিস রক্ষা করে চলেছেন। প্রেস কনফারেন্স করেছেন। তার সাহস অসীম। এরশাদ আমলেও তিনি এমন সাহস দেখিয়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
খালেদা জিয়া সেমি-অন্তরীণ হওয়ার পরপরই প্রথম সাহস দেখিয়েছেন কিছু শিক্ষক।

৯ নভেম্বর শনিবার রাত সোয়া ৯টায় ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ইউটাব) একটি প্রতিনিধি দল খালেদা জিয়ার বাসভবনে যান। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন- ইউটাব-এর সভাপতি আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ইউটাব-এর মহাসচিব প্রফেসর তাহমিনা আখতার টফি, ঢাকা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মোরশেদ হাসান খান, প্রফেসর আশাফুল ইসলাম চৌধুরী, প্রফেসর মজোদ্দেদী আল হোসেনী, প্রফেসর গোলাম রাব্বানী, সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর কামাল আহমেদ প্রমুখ।
রাত সোয়া ১১টায় সুপৃম কোর্ট আইনজীবী সমিতির একটি প্রতিনিধি দল খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। এই দলে ছিলেন- সমিতির সভাপতি এজে মোহাম্মদ আলী, আফজাল হোসেন চৌধুরী, মাসুদ আহমদ তালুকদার, ব্যারিস্টার আমিনুল হক ও ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান খান।
এরপর দেখা করেন- ডা. রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ডক্টরস এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ড্যাব) একটি প্রতিনিধি দল। আরো উপস্থিত হন- জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, বিএফইউজের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, ডিইউজের একাংশের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান প্রমুখ। এ ছাড়া এদিন মুভি ডিরেক্টর চাষী নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন কৃষিবিদ এবং ইঞ্জিনিয়ার দেখা করেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে।
তাদের এই সাহস অনুকরণীয় বললে কম বলা হবে। বস্তুত, এই সাহস অনুকরণীয় তো বটেই, এখন সেটি অনুকরণ করতে হবে কোনো সময় নষ্ট না করে। তোমাদের সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, তিন বছর আগে ১৩ নভেম্বর ২০১০-এ খালেদা জিয়াকে যখন ক্যান্টনমেন্টে স্বামী ও সন্তানদের স্মৃতি বিজড়িত তার প্রায় ৪০ বছরের বাসস্থান থেকে আওয়ামী সরকার উচ্ছেদ করে, সেদিন কেউ তার পাশে দাড়ায়নি। হতে পারে সেই বাড়িটা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে ছিল বলে। হতে পারে সেই সময় সাহসের ঘাটতি ছিল বলে। এখন আমি আশাবাদী, প্রতিদিনই খালেদাকে সমর্থন জানানোর জন্য সাহসী ব্যক্তি ও বিভিন্ন গোষ্ঠী গুলশানে তার বাড়ি অথবা তার অফিসে দলে দলে যাবেন।
মনে রাখতে হবে, এই সাহস তোমাদের কাছে, সবার কাছে খালেদা জিয়া দাবি করতে পারেন। গোটা জাতির কাছে এটা তার ন্যায্য পাওনা। তিনি নিজে খুবই সাহসী নারী। আর সে জন্যই একদিকে স্বদেশে যেমন জনপ্রিয়তার শিখরে উঠেছেন, অন্যদিকে বিদেশে তেমনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদে প্রধান মন্ত্রী থাকার সময়, অর্থাৎ ২০০১-২০০৬-এর মধ্যে বার বার ইনডিয়া এবং আমেরিকার চাপের মধ্যে পড়েছিলেন।
ইনডিয়া চেয়েছিল পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ইনডিয়াতে যাওয়ার করিডোর এবং ওই এলাকার অশান্ত জনগণ দমনে সহযোগিতা।
আমেরিকা চেয়েছিল ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে লড়বার জন্য বাংলাদেশি সৈন্য। এই অনুরোধ করতে আমেরিকার তদানীন্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কলিন পাওয়েল এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড, দুটি ভিন্ন টুপে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু দুইবারই তিনি আমেরিকান মন্ত্রীদের নিরাশ করেন। একটি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি মুসলিম দেশের সেনা নিয়োগে খালেদা রাজি হননি। ইরাকে আমেরিকান সেনা অভিযানে তাদের পাশে দাড়িয়েছিল তিনটি দেশ- বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং পোল্যান্ড। অন্যান্য শক্তিশালী ও ধনবান দেশগুলোর পক্ষে আমেরিকান অনুরোধ অগ্রাহ্য করা সহজ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ একটি ছোট গরিব দেশ, যার আয়তন টেক্সাসের চেয়েও কম এবং দেশটি বহুভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল। তবুও সেই টেক্সাসের শক্তিধর জর্জ ডাবলিউ বুশের অনুরোধ খালেদা তখন রাখেননি। শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের মতো তিনি সরব স্লোগান দেননি, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ খালেদা জিয়া নীরবে নিভৃতে মুক্তির কূটনীতি, স্বাধীনতার নীতি অনুসরণ করেছিলেন। বাংলাদেশকে তিনি পশ্চিমি স্বার্থের প্রভাব মুক্ত রেখেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বজায় রেখেছিলেন।
৭ মার্চের সেই ঘোষণার ১৮ দিন পরে শেখ মুজিব আত্মত্মসমর্পণ করেছিলেন। খালেদা জিয়া আত্মসমর্পণ করেননি। কিন্তু এর খেসারত হিসেবে, মে ২০০৩-এ ইরাক যুদ্ধের ৪৪ মাস পর জানুয়ারি ২০০৭-এ খালেদা জিয়াকে হারাতে হয়েছিল বাংলাদেশে আবার ক্ষমতাসীন হওয়ার সম্ভাবনা। পক্ষান্তরে, আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, এই দুটি দেশÑ ইনডিয়া ও আমেরিকাকে দাসখত লিখে দিয়েছিলেন তখন। তাই ডিসেম্বর ২০০৮-এর ইলেকশনে খালেদা হন পরাজিত। হাসিনা হন বিজয়ী।
খালেদা জিয়া পরাজিত হলেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার দেশপ্রেম ও সাহস। সুতরাং, এখন তিনি দেশবাসীর কাছে তাদের দেশ-প্রেম ও সাহসের প্রমাণ দাবি করতে পারেন। এই মুহূর্তে যদি দেশবাসী দেশপ্রেম ও সাহস দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশ তলিয়ে যেতে থাকবে পরাধীনতার অন্ধকারে এবং ভীরুতার আত্মগ্লানিতে।
এ প্রসঙ্গে আমি আমেরিকায়, ওবামা প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে, পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও শেখ হাসিনার একটি টেলিফোন সংলাপের একটি অংশ উদ্ধৃত করতে চাই।
১৬ জানুয়ারি ২০১১-তে প্রকাশিত হিলারি-হাসিনার ইংরেজি টেলি-সংলাপের বিবরণে জানা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি সৌজন্য ও সমর্থনমূলক আচরণের অনুরোধ করে ওয়াশিংটন থেকে হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি ফোন কল দিয়েছিলেন। এই ফোন কলের পর প্রধান মন্ত্রীর দফতর থেকে জানানো হয়, প্রধান মন্ত্রী ও আওয়ামী সরকারের কাজের প্রশংসা করে হিলারি ফোন করেছিলেন। এতে ঢাকায় আমেরিকান এমবাসির এবং ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। কারণ, ওই ফোন কলে হিলারি কোনো প্রশংসা তো দূরের কথা, বরং মৃদু সমালোচনা করেছিলেন। এর কয়েকদিন পর ওই ফোন কলের ট্রান্সকৃপ্ট ঢাকায় পাওয়া গেলেও আওয়ামী মিডিয়া সেটা এড়িয়ে যায়। কেন? কারণটা তোমরা এখনই বুঝবে। ওই ইংরেজি টেলি-সংলাপের শেষাংশটা আমি পড়ে শোনাচ্ছি:
Hillary: Madame Prime Minister, I thought I would not have to go that far. But, unfortunately, I was wrong. I hope you know as much we know, how your government came to power. Don't forget that we helped you congratulating you after the election, terming it as free and fair. You know Prime Minister, how this election result was pre-arranged at the behest of our good friends in New Delhi. We acted the way they suggested us. And please don't forget that Gen. Moeen, who brought you to power, now in the USA and perhaps, we now know, more than you could possibly imagine. Prime Minister, I am not saying that we will disown you so soon. I am just trying to place issues in the order of history demands it.  

Hasina: Madame Secretary, we are aware of your support and assistance. We will do all we can to keep you happy. Don't worry. We noted your point. Now let me know when you are coming to visit my country.  

Hillary: Thanks for the invitation, Madame Prime Minister. I thank you for your time.  

Hasina: Madame Secretary, Please bring President Clinton and your daughter and son-in-law.

(Hillary hangs up on the other side...)

এবার শোন বাংলায়।
হিলারি: আমি ভেবেছিলাম আমাকে এত দূর যেতে হবে না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আপনি জানেন এবং আমরাও জানি কিভাবে আপনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভুলে যাবেন না, ইলেকশনের পর আমরা বলেছিলাম, সেটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। প্রধান মন্ত্রী, আপনি জানেন, দিল্লিতে আমাদের বন্ধুদের নির্দেশে কিভাবে ফলাফল আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তারা যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবেই আমরা চলেছিলাম। প্লিজ, আপনি এটাও ভুলে যাবেন না, জেনারেল মঈন যিনি আপনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি এখন আমেরিকায় আছেন এবং আপনি যতখানি কল্পনা করতে পারেন, এর চেয়েও বেশি এখন আমরা জানি। আমি বলছি না, এখনই আপনার কাছ থেকে আমরা দূরে সরে যাব। আমি শুধু ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন ইসু তুলে ধরছি।
হাসিনা: আমরা আপনার সমর্থন ও সাহায্য বিষয়ে জানি। আপনাকে খুশি রাখার চেষ্টা করব। দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার কথাগুলো মনে রাখব। এখন বলুন, কবে আমাদের দেশ সফর করতে আসবেন?
হিলারি: আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে সময় দিলেন, সে জন্য ধন্যবাদ।
হাসিনা: প্লিজ, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে, আপনার মেয়েকে, জামাইকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
ততক্ষণে হিলারি ফোন ছেড়ে দিয়েছেন... এখানে হিলারির কথায় কয়েকটি বিষয় ফুটে উঠেছে।
এক. তিনি প্রথমে হাসিনাকে আঘাত করতে চাননি।
দুই. আমেরিকা জানে, কিভাবে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর ২০০৮-এর ইলেকশনে বিজয়ী হয়েছিলেন।
তিন. ওই ইলেকশনকে ‘ফৃ এন্ড ফেয়ার’ (অবাধ ও সুষ্ঠু) সার্টিফিকেট দিয়ে আমেরিকা অভিনন্দন পাঠিয়েছিল হাসিনাকে সাহায্য করার জন্য।
চার. ইনডিয়ান সরকার সেই ইলেকশনের ফলাফল আগভাগেই স্থির (পৃঅ্যারেঞ্জড) করেছিল।
পাচ. আমেরিকা সেটা জানত এবং নতুন দিল্লির কর্মকর্তাদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘আওয়ার গুড ফ্রেন্ডস’ (আমাদের ভালো বন্ধুরা) রূপে বর্ণনা করেছেন হিলারি।
ছয়. শেখ হাসিনা, যিনি সব সময়ই মুখে সেনা বাহিনী সম্পর্কে খালেদা জিয়াকে সতর্ক করে দেন, তিনিই সেনা বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতায় আসার চেষ্টা করেন এবং ডিসেম্বর ২০০৮-এ সফল হন। হিলারি সরাসরি বলেছেন, হাসিনা যেন ভুলে না যান, তাকে তদানীন্তন সেনা প্রধান জেনারেল মইন ক্ষমতায় এনেছিলেন।
সাত. শেষে হিলারি আরো বলেছেন, হাসিনা যা কল্পনাও করতে পারেন না, তার সম্পর্কে এখন ওয়াশিংটন আরো বেশি জানে। হিলারির এই উক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই উক্তির পাশাপাশি বিবেচনা করতে হবে পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন প্রজেক্টে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার। এ ক্ষেত্রে কে বা কারা দুর্নীতিতে জড়িত ছিল এবং সেই দুর্নীতিতে ডলার লেনদেনের পরিমাণ কতো ছিল, এর আংশিক খবর ওয়াশিংটন সম্ভবত জানে।

বলা যায়, ২০১১ থেকে হাসিনা-ওয়াশিংটন দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং কালক্রমে এই দূরত্ব বেড়ে যেতে থাকে। ওয়াশিংটন বুঝতে পারে, যদিও হাসিনা নীতি কথা বলেন, তবুও তিনি কতোটা অনৈতিক। যদিও হাসিনা গণতন্ত্রের কথা বলেন, তবুও তিনি কতোটা স্বৈরতান্ত্রিক। যদিও হাসিনা জনগণের কথা বলেন, তবুও তিনি কতোটা পরিবারতান্ত্রিক এবং যদিও হাসিনা জনপ্রিয়তা দাবি করেন, তবুও তিনি কতোটা অজনপ্রিয়।

এখন শেখ হাসিনার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বৈত আচরণ এবং চাতুরি ধরা পড়ে গেছে বিদেশে এবং দেশে। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সততা ক্রমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ২০০৭-এর তুলনায় আমেরিকা এবং ইইউসহ পশ্চিম, মিডল ইস্ট এবং দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থন ও সহানুভূতি হারিয়েছে। যদিও হাসিনা তার ইসলামি তাশ খেলতে চেয়েছেন, তবুও এতে ইনডিয়া ছাড়া আর কাউকেই তিনি পাশে রাখতে পারেননি। দেশে এবং বিদেশে হাসিনা প্রায় একা হয়ে পড়েছেন। তাকে রক্ষার শেষ চেষ্টার জন্য ইনডিয়া এখন খোলামেলাভাবে এগিয়ে এসেছে। ইনডিয়ান মিডিয়া এবং ইনডিয়ান সাবেক ও বর্তমান বুরোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে হাসিনাকে ক্ষমতাসীন রাখার ফর্মুলার ইলেকশন বিষয়ে জোরালোভাবে বলা হচ্ছে।
দিল্লি থেকে প্রকাশিত টাইমস অফ ইনডিয়ার ১ নভেম্বর ২০১৩-র সংখ্যায় সুবীর ভৌমিক বাংলাদেশে ইনডিয়ান সামরিক হস্তক্ষেপের ডাক দিয়েছেন। এতে মনে হতে পারে, জানুয়ারি ২০১০-এ দিল্লিতে গিয়ে শেখ হাসিনা ইনডিয়ার সঙ্গে যে চুক্তি করে এসেছেন, তারই কোনো অপ্রকাশিত ধারায় ইনডিয়া বাংলাদেশে সেনা অভিযানের বৈধতা দাবি করবে। তোমরা মনে রেখ, ওই চুক্তি বিষয়ে শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে কোনো আলোচনা করেননি। এখন আর আলোচনার দরকার নেই। ইনডিয়ান সেনা বাহিনী যদি বাংলাদেশে অভিযান চালায় তাহলে জনগণ বুঝে যাবে, ওই চুক্তিতে কি ছিল।
আমার আজকের এই বৃফিংয়ে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে পার, আমি নিরক্ষেতা বিসর্জন দিয়েছি এবং এক ব্যক্তি, খালেদা জিয়ার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছি। হ্যা। ঠিক তাই। জাতি এবং মানুষের জীবনে কিছু সময় আছে, যখন নিরপেক্ষতা হয় সুবিধাবাদিতা। সেই সুবিধাবাদে আত্মরক্ষা সম্ভব হলেও হতে পারে, কিন্তু দেশ ও জাতি রক্ষা সম্ভব হয় না। যেমন ধর- ১৯৭১-এর সময়টা। ওই সময় আমি বিশ্বাস করেছি, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে দেশকে হানাদার বাহিনী মুক্ত করাই আমার কর্তব্য। অনেকে মুক্তিযুদ্ধে যাননি বা যেতে পারেননি। তারা মুক্তি আন্দোলনে থেকেছেন। সহায়তা করেছেন অলক্ষ্যে থেকে। আবার কেউ কেউ নিরপেক্ষ থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বলেননি। পাকিস্তানের পক্ষেও বলেননি। কিন্তু সেই সময় কারো নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ ছিল না। সবার সমর্থন করা উচিত ছিল মুক্তিযুদ্ধকে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে।
সেই সময় শেখ হাসিনা কোথায় ছিলেন? উত্তর: তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বনানীতে, এটমিক এনার্জি কমিশন স্টাফ কোয়ার্টার্সে ছিলেন। ১৯৭১-এর পুরোটা সময় ড. ওয়াজেদ এটমিক এনার্জি কমিশনে কাজ করেছেন এবং পাকিস্তান সরকারের বেতন নিয়েছেন। শেখ হাসিনা হয়েছিলেন অন্তঃসত্ত্বা এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থিত কমবাইন্ড মিলিটারি হসপিটাল, সংক্ষেপে সিএমএইচ-এ জয়কে জন্ম দিয়েছেন। সেই সময় পশ্চিম পাকিস্তানে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বন্দি ছিলেন। সুতরাং, এটা ধরে নেয়া যেতে পারে, তিনি তখন পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু এটাও সত্য, তিনি সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিছু বলেন নি। প্রধান মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি লেখিকা রূপে আবির্ভূত হলেও, সেই সময়, নিদেন পক্ষে জাহানারা ইমামের মতো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কোনো ডায়রিও লেখেন নি। তাহলে ১৯৭১-এ শেখ হাসিনার ভূমিকা কি নিরপেক্ষ ছিল?
আমরা যারা মিডিয়ায় কাজ করি, তারা অনেকটা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মতো। দেশে যখন আগুন জ্বলে তখন আমাদের নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নেই। আগুন নেভানোর জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে যেতেই হবে। নইলে এই আগুনে গোটা দেশ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

চ্যানেল আইতে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা বলেন, ‘সাদেক হোসেন খোকা মুক্তিযোদ্ধা। দা-কুড়াল নিয়ে মাঠে নামার ডাক তাকে মানায় না। 

তার উচিত ছিল- মেশিনগান, এসএলআর অথবা রাইফেল নিয়ে মাঠে নামার ডাক দেয়া।’
একই রাতে বাংলাভিশনে দৈনিক ‘নিউ এইজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন, ‘সংলাপ ও আলোচনার নামে শেখ হাসিনা ভন্ডামি করছেন। এটা দেশবাসীকে আমরা বারবার বলা সত্ত্বেও যখন পোষ্য মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল, তখন শেখ হাসিনা নিজেই উদ্যোগ নিয়ে প্রমাণ করে দিলেন, আমরাই ঠিক ছিলাম।... বিএনপির ওপর দোষ চাপাতে আওয়ামী লীগ নিজেই জ্বালাও-পোড়াও করছে।
আমার আজকের বৃফিং এখানেই শেষ। আমি দৈনিক শুকতারাকে নিরপেক্ষ করতে চাই না। আমি চাই, দেশ রক্ষা করতে। তাই এখন শুকতারাকে সর্বাত্মক সমর্থন দিতে হবে খালেদা জিয়াকে। শুধু মুখে নয়, কাগজে কলমে নয়, রাজপথে, গ্রামে-গঞ্জে, লঞ্চে, কোচে, ট্রেনে, সর্বত্র তার পক্ষে সংঘবদ্ধ হয়ে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত, সোচ্চার ও সক্রিয় থেকে। ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে।
এসেম্বলি হল থেকে শামীম তার রুমে ফিরে গেল।
রিসেপশন কর্মী জানাল, ইউনিসোপ থেকে এক জন প্রতিনিধি এসেছেন। তিনি শুকতারাতে আগামী কয়েক দিন জুড়ে তাদের একটি বিশেষ পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে চান।
পাঠিয়ে দাও ওনাকে। শামীম বলল।

কিছুক্ষণ পর রিসেপশন কর্মী নিয়ে এলো ৪০ ছুই ছুই এক জন স্মার্ট ভদ্রলোককে। হাতে স্যামসনাইট বৃফফেস। পরনে সাদা শার্ট, নেভি ব্লু সুট ও স্কাই ব্লু টাই।
চকচকে কালো জুতা।
প্লিজ, বসুন। শামীম বলল।
থ্যাংক ইউ। এই বলে আগন্তুক তার একটা ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিলেন। সেখানে তার নাম আলতাফ হোসেন চৌধুরী। পদবি ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইউনিসোপ লিমিটেড।
আপনাদের প্রডাক্টটা কি? শামী জানতে চাইল।
সোপ, সাবান। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন আলতাফ।
ব্র্যান্ড নাম?
কলংকমোচন সাবান। ভাবলেশহীন মুখে আলতাফ জানালেন।
কলংকমোচন সাবান? শামীম অবাক হলো।
হ্যা। ব্র্যান্ড নাম কলংকমোচন সাবান। আমাদের কম্পানি ইউনিসোপের দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী বছরের মধ্যেই আমরা ইউনিলিভারের লাইফবয় সাবানের কাটতিকে বিট করতে পারব। আলতাফ বললেন।
তাই নাকি? এটা কি নতুন কোনো ধরনের হালাল সাবান? শামীমের কথায় কিছুটা শ্লেষ ছিল।
না। এটা কলংকমোচন সাবান। শ্লেষ উপেক্ষা করে আলতাফ দৃঢ় স্বরে বললেন।
মানেটা কি? ছেলে-মেয়েদের শার্ট-প্যান্টে দাগ মুছে ফেলার কার্যকর সাবান? অথবা নরনারীর দেহে ময়লা ধুয়ে ফেলার? শামীম বলল।
না। এই সাবান ইউনিক। ড. ইউনূসের আবিষ্কৃত ক্ষুদ্র ঋণের পরে বিশ্ববাসীকে উপহার দেয়ার জন্য এটাই বাংলাদেশের দ্বিতীয় আবিষ্কার। এই সাবান দিয়ে জামা-কাপড় অথবা হাত-পা মুখ-চুল-শরীরের দাগ বা কলংক, যাই বলুন না কেন, সে সবই মোছা সম্ভব। কিন্তু এর চেয়েও আরো কিছু বেশি সম্ভব। এই সাবান দিয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং জাতির কলংকমোচনও সম্ভব। তাই আমরা এর নাম রেখেছি কলংকমোচন সাবান। আলতাফ বললেন।
অসাধারণ! শামীমের এই মন্তব্যে বিস্ময় ছিল। কিন্তু কৌতুক ছিল না।
আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, গত প্রায় পাচ বছর যাবত আওয়ামী সরকার বিভিন্ন ধরনের কলংকমোচনে লিপ্ত ছিল। আমরা মনে করি, এই আওয়ামী সরকার বিদায় নিলে তাদের সম্পর্কে আরো অনেক বেশি রকমের কলংক জাতির সামনে উদ্ঘাটিত হবে, যা আমরা কেউ এখন কল্পনা করতে পারছি না। সেই ভয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়ছে না এবং নিজেরাই যাতে পুনঃনির্বাচিত হতে পারে, সে রকমভাবে ইলেকশন সাজাচ্ছে। কিন্তু তারা এটা করে পার পাবে না। গোটা দেশ এখন এক দিকে, এক ব্যক্তি হাসিনা এবং এক দল আওয়ামী লীগ আরেক দিকে। এই যুদ্ধে তারা হেরে যাবে। এই যুদ্ধের পর ওদের বিচার হবে দেশদ্রোহিতার অপরাধে।
না। বিএনপি নেত্রী ২১ অক্টোবর ওয়েস্টিন হোটেলে প্রেস কনফারেন্স করে ওদের সবাইকে আগাম ক্ষমা করে দিয়েছেন। শামীম বলল।
আমরা জানি সেটা। কিন্তু বাংলাদেশে যেটি আওয়ামী সরকারের কল্যাণে মামলাদেশ হয়েছে, সেখানে এখন মক্কেলের চেয়ে উকিল-ব্যারিস্টারের সংখ্যা বেশি। তাদের অনেকেই মামলা ঠুকে দেবেন ইনডিয়ার কাছে দেশ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগে। মিডিয়া, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক দলগুলো সবাই তখন ঝাপিয়ে পড়বে এই কলংক মোচনের লক্ষ্যে। খালেদা জিয়া প্রধান মন্ত্রী হলেও তার প্রতিশ্রুতি তখন রক্ষা করতে পারবেন না। তবে যেহেতু খালেদা জিয়া আন্তরিক, সৎ এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর থাকবেন বলে আমাদের বিশ্বাস, সেহেতু, মামলা বিচারদণ্ড প্রভৃতির ঝামেলায় না গিয়ে, তিনি এই কলংকমোচন সাবান কেনার অর্ডিনান্স জারি করতে পারেন। আমরা গ্যারান্টি দিতে পারি, এই সাবান মাখলে ওরা সব কলংকমোচন করতে পারবে। তার মানে, খুব সহজেই শান্তিপূর্ণভাবে কলংকমোচন হয়ে যাবে। আলতাফ বললেন।
আপনারা শুধু দেশদ্রোহিতার অপরাধে যারা অভিযুক্ত হতে পারেন, তাদেরই টার্গেট করেছেন? শামীম প্রশ্ন করল।
না। এই মুহূর্তে যদি খালেদা জিয়ার পাশে অকুতোভয়ে দাড়াতে বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তীকালে তাদেরও কলংকমোচনের জন্য এই সাবানের দরকার হবে। আলতাফের কথায় এবার কিছুটা শ্লেষ ফুটে উঠল।
এরপর আলতাফ তার স্যামসনাইটটা খুলে ধবধবে সাদা রংয়ের একটা ছোট গিফট প্যাকেট বের করে বললেন,
এই নিন, একটা স্যাম্পল কলংকমোচন সাবান। আপনার জন্য গিফট। আজই মেখে দেখবেন।
থ্যাংকস। মেনি থ্যাংকস। শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি কেন? আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক কলংক আছে। প্রতি দিন সেই কলংক বাড়ছে। অতএব আমি আজকেই ট্রাই করে দেখব। শামীম আন্তরিকভাবে বলল।
গুড। আপনি আজ ট্রাই করে দেখুন। বিজ্ঞাপনের বিষয়টি আমি পরে আরেকদিন এসে ডিসকাস করব। আত্মপ্রসাদের হাসি মুখে আলতাফ চলে গেলেন।

১১ নভেম্বর ২০১৩

খালেদা জিয়ার সাহসী জীবন
২৬ মার্চ ১৯৭১: চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমানের উই রিভোল্ট বলে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনা বাহিনী কর্তৃক দুই শিশুপুত্রসহ খালেদা জিয়া গৃহবন্দি। খালেদা জিয়ার জন্ম হয়েছিল ১৫ আগস্ট ১৯৪৬ এবং বিয়ে হয়েছিল ১৯৬০-এ।
৩০ মে ১৯৮১ : চট্টগ্রামে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হওয়ার পর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে বিধবা জীবন-যাপন শুরু।
০২ জানুয়ারি ১৯৮২ : রাজনীতিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত। বিএনপির প্রাথমিক সদস্য। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস চেয়ারপারসন এবং ১৯৮৫ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত।
২৭ নভেম্বর ১৯৮৩: এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রথমবার গ্রেফতার। এরপর ৩ মে ১৯৮৪-তে তিনি আরো একবার গ্রেফতার হন। ১ মার্চ ১৯৮৫-তে আবার গৃহবন্দি হন। ১০ নভেম্বর ১৯৮৭-তে আন্দোলন চলাকালে পূর্বাণী হোটেলে আশ্রয় নেয়ার পর সেখান থেকে আটক ও নিজ গৃহে অন্তরীণ।
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪: বগুড়ায় খালেদা জিয়ার জনসভায় বোমাবাজি। ১১ জন আহত।
৭ মে ১৯৮৬: খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা যৌথভাবে জেনারেল এরশাদ আয়োজিত সাধারণ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়ার কয়েকদিন পর ওয়াদা ভঙ্গ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেয়। আপসহীন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির সেই নির্বাচন বয়কট।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১: এরশাদ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পার্লামেন্ট ইলেকশনে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ। নিজের পাচটি আসনেই জয়লাভ। ১৯ মার্চ দেশের প্রথম মহিলা প্রধান মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ এবং সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত।
২৫ মার্চ ১৯৯৬: পার্লামেন্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস। আবার পাচটি আসনে বিজয়ী ও দ্বিতীয়বার প্রধান মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ।
৩০ মার্চ ১৯৯৬: প্রধান মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ এবং সময়ের দাবি মেনে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন।
২০ মে ১৯৯৬: সেনা প্রধান জেনারেল নাসিমের কু প্রচেষ্টা। ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছেড়ে অজ্ঞাত স্থান থেকে বিএনপির নেতৃত্ব দান।
জুন ১৯৯৬: পার্লামেন্ট ইলেকশনে বিএনপির ১১৬ আসন লাভ। পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত।
০৩ অক্টোবর ২০০১: পার্লামেন্ট ইলেকশনে বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী। আবার নিজের পাচটি আসনেই জয়লাভ এবং তৃতীয় বারের মতো প্রধান মন্ত্রী।
২০০৩: বিএনপির নীতি-নির্ধারক কিছু নেতার আপত্তি সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার নির্দেশে দলমত নির্বিশেষে সন্ত্রাসীদের দমনে সেনা বাহিনী কর্তৃক ক্লিনহার্ট অপারেশন পরিচালিত। একই উদ্দেশে পরবর্তীতে র?্যাব গঠিত।
১১ জানুয়ারি ২০০৭: সেনা সমর্থনে অসাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ফখরুদ্দিন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ যোগ দিলেও খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তে বিএনপির সেই অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়া।
১৮ জুলাই ২০০৭: আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি চেয়ে খালেদা জিয়ার বিবৃতি। এর চার দিন আগে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার হাসিনাকে গ্রেফতার করেছিল।
০২ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সেনা বাহিনীর সঙ্গে আতাতের কারণে বিএনপি থেকে মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়াকে বহিষ্কার
০৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭: খালেদা জিয়া গ্রেফতার। সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত দ্বিতীয় সাব-জেলে বন্দি। তার দুই ছেলেকে গ্রেফতার ও নির্যাতন সত্ত্বেও এবং সেনা সমর্থিত সরকার কর্তৃক তাকে জোর করে সউদি আরবে পাঠানোর প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। এক বছর আট দিন বন্দিত্বের পর তিনি ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ মুক্ত এবং পার্টি পুনর্গঠন শুরু।
০১ ডিসেম্বর ২০০৮: ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারের অধীনে আসন্ন পার্লামেন্ট ইলেকশনে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইলেকশনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত। ১৪ দিনে সারা বাংলাদেশে ১০,০০০ কিলোমিটার সফর এবং দিনে ও রাতে শত শত জন ও পথ সভায় ভাষণ।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮: ইলেকশনে পরাজয় মেনে নেয়া। পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত।
১৩ নভেম্বর ২০০৯: স্বামী ও পুত্রদের স্মৃতি-বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের দীর্ঘ ৪০ বছরের বাসভবন থেকে আওয়ামী সরকার কর্তৃক অবৈধভাবে উচ্ছেদ। গুলশানে ভাড়া বাড়িতে নতুন জীবন-যাপন শুরু।

২০১৩ : জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে পার্লামেন্ট ইলেকশন অনুষ্ঠানের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
২০১৩ : জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে পার্লামেন্ট ইলেকশন অনুষ্ঠানের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
বেগম খালেদা জিয়া ২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচনে বয়কট করেছিলেন, যেমনটি অধিকাংশ রাজনৈতিক দলও করেছিল।
খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কুয়ালা লামপুরের মালয়শিয়া ন্যাশনাল মেডিকাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন ও সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে খালেদা জিয়া বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন এবং তিন মাস পর ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে তার পাচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এরপরই তাকে বন্দি করে ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০২৪ সালে এই মামলায় তিনি খালাস পান।
২০১৮ সালের ৩১ জুলাই তাকে ‘মাদার অফ ডেমক্রেসি’ সম্মাননা দেয় কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) নামের একটি সংগঠন। 
২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের নির্বাচনে যখন খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন, বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোটের সমন্বয়ে অংশগ্রহণ করেছিল।
২০২০ সালের ২৫ মার্চ, করোনা মহামারির মধ্যে খালেদা জিয়া দুই বছরেরও বেশি সময় কারাভোগের পর শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্তি পান।
খালেদা জিয়া দীর্ঘস্থায়ী কিডনি, পচনশীল যকৃতের রোগ, হিমোগ্লোবিন, ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং অন্যান্য বয়সজনিত জটিলতায় ভুগছেন। ২০২১ সালের এপৃল খালেদা জিয়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তার বাসা ফিরোজা’র আরো আটজনের করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। ২০২২ সালে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি খালেদা জিয়াকে কৃটিকাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) থেকে স্থানান্তর করা হয়। তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি মুক্তি পান। ৫ আগস্টের মুক্তির কিছুদিন পর ১৯ আগস্ট জিয়ার ব্যাংক একাউন্ট, যেটা ২০০৭ সাল থেকে জব্দ করা হয়েছিল, সেটা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দ্বারা অবরোধ মুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি ৫ আগস্টের পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুটি দুর্নীতি মামলার সাজা মওকুফ করলেও আদালতের মাধ্যমে এসব মামলা নিষ্পত্তি চান খালেদা জিয়া। এরপর ২৭ নভেম্বর তিনি এসব দুর্নীতি মামলা থেকে খালাস পান।
২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাতারের আমিরের পাঠানো বিশেষ এয়ার এম্বুলেন্সে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন এবং ৮ জানুয়ারি লন্ডন পৌছান।
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে বেকসুর খালাস দিয়ে রায় ঘোষণার সময় আপিল বিভাগ বলেন, প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এই মামলা করা হয়েছিল। মামলার বিচার ছিল সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই মামলা দিয়ে খালেদা জিয়াকে সামাজিকভাবে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে।
১৫ জানুয়ারি ২০২৫ : বছরের প্রথমার্ধে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হসপিটালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ডক্টরদের তত্ত্বাবধানে তাঁর লিভার সিরোসিসসহ অন্যান্য জটিলতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা ওঠানামা করায় চিকিৎসা কার্যক্রম হসপিটালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই সময় তিনি দেশেই টৃটমেন্ট নিতে চান বলে ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছিলেন।
৬ আগস্ট ২০২৫ :২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির এক বছর পূর্ণ হয়। দিনটি উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তাঁর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এইদিন তিনি কোনো জনসভা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সশরীরে অংশ নেননি। 
১৬ আগস্ট ২০২৫ : বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ৮০তম জন্মদিন সাধারণ পরিবেশেই পালন করেন। এ উপলক্ষে বিএনপির সিনিয়র নেতারা হসপিটাল ও তাঁর গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় গিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
৭ নভেম্বর ২০২৫ :জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার শাখা থেকে বেগম খালেদা জিয়ার নামে একটি লিখিত বাণী প্রকাশ করা হয়। বাণীতে তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার গুরুত্ব এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
২৩ নভেম্বর - ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ :ডিসেম্বরের শুরু থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। লিভার এবং হার্টের জটিলতা বাড়ায় তাঁকে পুনরায় হসপিটালের সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ : বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হসপিটালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে হসপিটালে নেয়া হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত মানিক মিয়া এভিনিউতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এযাবৎকালের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা শেষে, গার্ড অফ অনার দেওয়ার পর জিয়া উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

প্রথম প্রকাশ :১১ নভেম্বর ২০১৩
পুনঃপ্রকাশ :৩১ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত