ডেসকোর এমডি অবসরপ্রাপ্ত বৃগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদ। নানা অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও এমডি হিসেবে শামীম আহমেদের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর সুপারিশের ঘটনায় রীতিমত তোলপাড় চলছে। এ নিয়ে খোদ ডেসকোতেই সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্নের। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের কাছেও এ সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়াত প্রধান মন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অবসরপ্রাপ্ত বৃগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি পরিচালনা পর্ষদের অনুষ্ঠিত সভায় এ বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। পরে বোর্ডের সুপারিশ অনুমোদনের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারের ভেতরেও এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে ডেসকোর ভেতরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভুমি দখলের অভিযোগে থাকা মামলা, ভূমি সংক্রান্ত অন্যান্য অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে দেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একটি বড় চুক্তির মূল্য একাধিক বার বাড়ানোর বিষয়ে অভিযোগ আছে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। যা তথ্য মন্ত্রণালয় জানে। অভিযোগ ও মামলা সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় বোর্ড তার চুক্তি নবায়নের সুপারিশ করায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সঙ্গে জড়িত
সুত্র বলছে, দুই বছরের জন্য নিয়োগ করা হয় তাকে। এবার এমডি হিসেবে আরো দুই বছর বাড়ানোর সুপারিশ করার বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। শুধু তাই নয়, ডেসকোর এমডি নিয়োগে যার নাম ছিল, তাদের মধ্যে শামীম আহমেদের নাম ছিল না বলে অভিযোগ আছে। ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৪৮তম সভার সুপারিশের ভিত্তিতে তাকে যোগদানের তারিখ থেকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে আরো দুই বছরের জন্য এমডি হিসেবে রাখার সুপারিশ করার বিষয়টি রীতিমত রহস্যের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের ৩১ আগস্ট বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এমডি হিসেবে আরো শামীম আহমেদের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। সভায় তিনজন অতিরিক্ত সচিবসহ বোর্ডের অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
ডেসকোতে নানা প্রশ্ন
সুত্র বলছে, ডেসকোর আর্থিক পরিস্থিতি, পরিচালনাগত দক্ষতা, গ্রাহকসেবা, সিস্টেম লস, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তার নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট ফলাফল কি তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান এমডি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য ডেসকোর বোর্ড অনুমোদন ও সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন। এ ধরনের নিয়োগ সাধারণত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে করা হয় বলেও জানান তিনি। সম্প্রতি করা সুপারিশে সেটি উপেক্ষিত হয়েছে।
সুত্র বলছে, মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ডেসকোর চার কর্মকর্তাকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এমডির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতরাও পদোন্নতি পেয়েছেন। পদোন্নতি পাওয়াদের মধ্যে আছেন নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) ইঞ্জিনিয়ার মো. রশিদুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক (সংগ্রহ) ইঞ্জিনিয়ার জুলফিকার তাহমিদ, চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. মঈনউদ্দিন খান, চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. মনজুরুল হক, চিফ ইঞ্জিনিয়ার (আইসিটি) আব্দুস ছালাম, চিফ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এবং তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সায়েদুর রহমান। পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও প্রশাসনিক রেকর্ড মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
সুত্র বলছে, ডেসকোর বর্তমান প্রশাসন নিয়ে ‘ওকুলিন টেক বিডি লিমিটেড’-এর সঙ্গে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের সফটওয়্যার সংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে চুক্তিটির মূল্য ছিল প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে তা বেড়ে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নি¤œমানের পণ্য ও সেবা দিয়েছে। চুক্তির কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই অর্থের বড় একটি অংশ পরিশোধ করা হয়েছে। ডেসকোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো চলছে চুক্তির আওতায়।
সুত্র বলছে, শামীম আহমেদ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ। তার বিরুদ্ধে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা আছে। ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। তারপরেও এমন একজন ব্যক্তিকে ডেসকোর মতো প্রতিষ্ঠানের এমডি হিসেবে আবারো রাখার সুপরিশ করার বিষয়টি রীতিমত রহস্যজনক। তার বিরুদ্ধে অ্যাসিউর গ্রæপের (আবাসন) সিইও থাকা অবস্থায় ভ‚মিদস্যুতা ও দখলদারিত্ব করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একজন চিহ্নিত ভূমিদস্যু হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতো লোক কিভাবে ডেসকোর এমডি হয়েছেন তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। ডেসকোর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে গুলশানে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও আছে।
সুত্র বলছে, এ সংক্রান্ত অভিযোগ মুখ্য সচিবের কাছে লিখিত আকারে জমা পড়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। ডেসকোর এমডির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে বোর্ডের সুপারিশ এখন মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়া, কর্মদক্ষতা, অভিযোগ, মামলা এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এই বিষয়ে ডেসকোর এমডি অবসরপ্রাপ্ত বৃগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।