
নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের মুন্সিপাড়া ভাদুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, পাঠদান ব্যাহত হওয়া ও হাজিরা খাতায় অসঙ্গতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে দৈনিক যায়যায়দিনে সংবাদ প্রকাশের পর সরেজমিন তদন্ত করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
তদন্তে প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের কর্মরত চার শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সম্প্রতি দৈনিক যায়যায়দিনে ‘কাগজে-কলমে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বাস্তবে পাঠদানে অনিয়ম—দুর্গাপুরের বিদ্যালয়ে হতাশাজনক চিত্র’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এতে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, নির্ধারিত সময়ে পাঠদান না করা, শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় অসঙ্গতিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যান দুর্গাপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান।
পরিদর্শন শেষে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের চার শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দুর্গাপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, “মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে যায়যায়দিনে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, সেটার প্রেক্ষিতে আমি তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। পরিদর্শন করে আপনারা যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছিলেন, সেগুলোর ক্ষেত্রে অনিয়ম পেয়েছি। পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও অনিয়ম পেয়েছি।”
তিনি বলেন, “সে কারণে বিদ্যালয়টির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছি। সেই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে চলমান। পরবর্তীতে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন।”
ফজলুর রহমান জানান, বিদ্যালয়টিতে মোট চারজন শিক্ষক কর্মরত এবং চারজনের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “পরিদর্শনে বিশেষ করে পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের কিছু অনিয়ম পেয়েছি। পাশাপাশি রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ এবং আগমন-প্রস্থানের বিষয়টিও পরিদর্শন করা হয়েছে। আগমনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। তবে প্রস্থানের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সময় এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যার সঙ্গে যায়যায়দিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অভিযোগের কিছুটা মিল রয়েছে।”
তদন্তের এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।
এর আগে যায়যায়দিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৭২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে সরেজমিনে দ্বিতীয় শিফটে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জনকে উপস্থিত দেখা যায়।
শিক্ষার্থীদের দৈনিক হাজিরা খাতাতেও বিভিন্ন অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠে। কয়েক দিন আগের উপস্থিতি যথাসময়ে লিপিবদ্ধ না করার পাশাপাশি কোথাও তিন দিনের উপস্থিতি একসঙ্গে লেখা এবং কোথাও ওই দিনের উপস্থিতিও যথাযথভাবে না লেখার তথ্য উঠে আসে। নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকা শিক্ষার্থীদের হাজিরা পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে পূরণ করার অভিযোগও করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুর্শিদা খাতুন সকালে বিদ্যালয়ে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে সাড়ে ১০টার দিকে চলে যান। অপর দুই শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম টিফিনের সময় বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে দীর্ঘ সময় পর দুপুর ২টা ৫৮ মিনিটে বিদ্যালয়ে ফেরেন বলে অভিযোগ করা হয়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
সেদিন বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জুনাইদ মিয়া জানায়, দুপুর ১২টার পর মাত্র একটি বইয়ের পাঠদান হয়েছে। টিফিনের পর শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করছিল এবং বিকেল ৩টা বা সাড়ে ৩টার দিকে ছুটি হবে বলে জানায় সে।
এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নামতা লিখতে ও বলতে দেওয়া হলে অনেকেই ভুল করে। কয়েকজন শিক্ষার্থী নামতা বলতে পারেনি। এমনকি কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজের শ্রেণির নামও সঠিকভাবে বলতে বা বানান করতে পারেনি।
এর আগে চলতি বছরের ৩ আগস্ট দুপুর ২টা ৫১ মিনিটে বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে শিক্ষকরা চলে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ের গেটে তালা ঝুলতে দেখা যায় বলেও যায়যায়দিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই ঘটনার ভিডিওও প্রতিবেদকের হাতে আসে।
তৎকালীন অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আফজাল হোসেন বলেছিলেন, সহকারী শিক্ষক মুর্শিদা খাতুন অসুস্থ সন্তানের কারণে ছুটি নিয়ে বিদ্যালয় থেকে চলে যান। অপর দুই শিক্ষক টিফিনের সময় দোকানে গিয়েছিলেন এবং ফিরতে দেরি হয়েছিল।
হাজিরা খাতায় অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, “যে শিক্ষক যে ক্লাস নেন, তিনিই বলতে পারবেন কেন হাজিরা দেওয়া হয়নি।”
দৈনিক যায়যায়দিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সরেজমিন পরিদর্শন, লিখিত প্রতিবেদন এবং তার ভিত্তিতে চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দায়িত্ব পালন ও পাঠদানের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এখন বিভাগীয় মামলার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় অভিভাবকদের প্রত্যাশা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের যথাসময়ে উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।