
দেশের ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ও লজিস্টিকস খাতে শতভাগ বিদেশি মালিকানা উন্মুক্ত করার তৎপরতায় গভীর উদ্বেগ ও আপত্তি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)। একই সাথে দেশের ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং খাত এখনো মূলত ‘ম্যানুয়ালি পরিচালিত হয়’ এবং বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়লে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়বে, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ অথরিটির (আইবিএ) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এমন দাবিকে ‘অমূলক ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে খাতটিতে শতভাগ বিদেশি মালিকানা উন্মুক্ত করার নীতি নেওয়া হলে দেশীয় উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর আইবিএর নির্বাহী চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক চিঠিতে এ আপত্তি জানিয়েছে বাফা। সংগঠনটির দাবি, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ও লজিস্টিকস কোম্পানি ইতিমধ্যে বাংলাদেশে শতভাগ বিদেশি মালিকানা অথবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা করছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত।
গত ২০ সেপ্টেম্বর একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আইবিএর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিংসহ বাংলাদেশের এজেন্ট ব্যবসাগুলো এখনো মূলত ম্যানুয়ালি পরিচালিত হয়, যা বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়। বিদেশি অংশগ্রহণ এলে এ খাতে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়বে বলেও ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন ও অমূলক’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাফা।
চিঠিতে সংগঠনটি বলেছে, ক্যুন অ্যান্ড নাগেল, ডিএইচএল গ্লোবাল ফরওয়ার্ডিং, ডিএসভি, এক্সপেডিটরস, এপিএম গ্লোবাল লজিস্টিকস, এজিলিটি, জিওডিস ও ইউসেন লজিস্টিকস ইতিমধ্যে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত। অন্যদিকে নিপ্পন এক্সপ্রেস, সেভা, টোল, ডাখসার, শেঙ্কার, আরামেক্স, ডেলমার ও কিনটেটসু স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
বাফার ভাষায়, ‘বিশ্বের প্রথম সারির ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশে প্রবেশের কোনো বাধা নেই, তারা ইতিমধ্যেই এখানে আছে।’
এমনকি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্গো পরিচালনা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, বন্দর ও অভ্যন্তরীণ হ্যান্ডলিংয়ে স্থানীয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের অপারেশনাল নেটওয়ার্ক, এজেন্সি সম্পর্ক ও মাঠপর্যায়ের দক্ষতার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
খাতটি ম্যানুয়ালি পরিচালিত হওয়ার বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছে বাফা। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা কার্গোওয়াইজ, স্যাপ ও স্যাপ হানা, ওরাকল এসসিএম, ডেসকার্টেস, ব্লুজে সল্যুশনস, মাগায়া এবং লজি-সিসের মতো আন্তর্জাতিক মানের সফটওয়্যার ব্যবহার করছে।
একই সঙ্গে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের অটোমেটেড পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম, শিপিং লাইনের ইডিআই মেনিফেস্ট এবং আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ইলেকট্রনিক এয়ার ওয়েবিলের সঙ্গে ডিজিটালভাবে যুক্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার চালান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থায়নে ক্লাউডভিত্তিক ওয়্যারহাউস ব্যবস্থাপনা এবং জিপিএস ও আইওটিনির্ভর কার্গো ও কনটেইনার ট্র্যাকিং ব্যবস্থাও তৈরি ও ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে বিদেশি গ্রাহকদের সরাসরি চালানের অবস্থান জানার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাফা।
সংগঠনটির মতে, এ বাস্তবতায় শতভাগ বিদেশি মালিকানা উন্মুক্ত করার পক্ষে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা বা বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক আনার যুক্তি টেকে না।
শতভাগ বিদেশি মালিকানা উন্মুক্ত করার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে সংগঠনটি। বাফার হিসাবে, দেশে এক হাজারের বেশি স্থানীয় লাইসেন্সধারী ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার বড় অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা।
বাফার আশঙ্কা, বেশি আর্থিক সক্ষমতার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় স্থানীয় উদ্যোক্তারা বাজার হারাতে পারেন। বর্তমানে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে থাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোও অংশীদারত্ব ভেঙে শতভাগ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান খুলতে পারে। এতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কয়েক দশকে গড়ে তোলা বিনিয়োগ ও ইকুইটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং মূলত সম্পদ-স্বল্প ও সেবানির্ভর খাত। বাফার দাবি, এ কারণে শতভাগ বিদেশি মালিকানা উন্মুক্ত হলেও ভারী শিল্প বা উৎপাদন খাতের মতো স্থায়ী মূলধনি যন্ত্রপাতি দেশে আসবে না। বিপরীতে অর্জিত মুনাফা, রয়্যালটি ও পরামর্শ ফি বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশে পাঠানোর সুযোগ থাকবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
একপাক্ষিক বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নীতি পরিবর্তন না করতে আইবিএকে আহ্বান জানিয়েছে বাফা। নিজেদের প্রযুক্তিগত ও পরিচালন সক্ষমতা সরাসরি দেখাতে আইবিএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা বৈঠকে বসার প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং লাইসেন্সিং বিধিমালায় ন্যূনতম ৬০ শতাংশ স্থানীয় মালিকানা বহাল রাখার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে বাফা।