নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল । ছবি-যাযাদিফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের তথ্য সংগ্রহে কোনো ধরনের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন বা দলীয়করণ না করার জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড নিয়ে কেউ দুর্নীতি করলে আইনজীবী হিসেবে তিনি নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের সোমেশ্বরী হলরুমে ‘ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি-২০২৬ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জরিপ-২০২৬ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শুমারি কাজে নিয়োজিত সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত।
উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় ও উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের আয়োজনে সভায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জরিপের মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব, সততা ও নিরপেক্ষতার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
দুর্গাপুরে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম প্রসঙ্গে ডেপুটি স্পিকার বলেন, উপজেলায় ১০ জন সুপারভাইজার ও ৯৭ জন তথ্য সংগ্রহকারী কাজ করবেন। তাদের সততা ও নিরপেক্ষতার ওপর প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির বিষয়টি নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব, চাপ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা যাবে না। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত উপকারভোগীদের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক করে কায়সার কামাল বলেন, গ্রামে গিয়ে যদি তিনি জানতে পারেন যে ফ্যামিলি কার্ডে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কারও কাছ থেকে ২০০ বা ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে, তাহলে ওই এলাকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবেন। আইনজীবী হিসেবে নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবেন বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, আমার নির্বাচনী ওয়াদা ছিল, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড নিয়ে কেউ যদি দুর্নীতি করে, আমি আইনজীবী হিসেবে নিজে বাদী হয়ে মামলা করব। আমি আমার ওয়াদাটা রক্ষা করব। তবে আমি চাই না, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক।
তথ্য সংগ্রহকারীদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঘর নেই এমন পরিবার বা ছাপড়া ঘরে বসবাসকারীদের দিয়ে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো বাধা বা চাপ আমলে নেওয়া যাবে না। সৃষ্টিকর্তাকে হাজির-নাজির রেখে মেধা ও সততার সঙ্গে প্রকৃত উপকারভোগীদের নাম তালিকাভুক্ত করতে হবে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, দুর্গাপুরের একজন দরিদ্র মানুষও যেন ফ্যামিলি কার্ড থেকে বঞ্চিত না হন, সেই দায়িত্ব তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের। সুপারভাইজারদের তথ্য সংগ্রহকারীদের সঙ্গে গিয়ে তথ্য নেওয়ার পাশাপাশি পরে সেগুলো ক্রসচেক করে প্রকৃত উপকারভোগীর নাম তালিকায় আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা তৈরিতে ধর্মীয় বিভেদ না করার আহ্বান জানিয়ে কায়সার কামাল বলেন, দুর্গাপুরে হিন্দু, মুসলমান, গারো, হাজং ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করতে হবে।
রাজনৈতিক বিভাজন ও ভিন্নমত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ ও আদর্শের অমিল গণতান্ত্রিক সমাজে থাকবে। তবে ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তার কাজের ত্রুটি তুলে ধরা যেতে পারে। তবে সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো বিষয় উপস্থাপন করে সমাজের ক্ষতি করা উচিত নয়।
নিজের দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গে কায়সার কামাল বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি সর্বোচ্চটা দিয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার চেষ্টা করছেন। জনগণের ভোট ও তাদের সেবা করাকে তিনি আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। ভুল হলে তা ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গারো ও হাজং জনগোষ্ঠীর পানি, রাস্তাঘাট, স্যানিটেশন ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমতলের মানুষের সঙ্গে সমান সুযোগের আওতায় আনতে তিনি কাজ করছেন।
হাতির আক্রমণ থেকে মানুষ ও ফসল রক্ষার উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এ সমস্যা মোকাবিলায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ এনে স্ট্রিট লাইট স্থাপন করা হয়েছে। শেরপুর, ঝিনাইগাতীসহ সীমান্তবর্তী এলাকার সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে সমন্বয় করে হাতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাতিও একটি প্রাণী। হাতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষের ফসলের ক্ষতি যাতে না হয়, সে বিষয়েও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে দুর্গাপুরকে আধুনিক ও মানবিক উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার।
তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা দলীয়করণ করা যাবে না। সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার শপথ নিয়ে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।