খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পুলিশের তালিকায় ২৫০ কিশোর

স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট

সারাদেশ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনায় কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করে অপরাধ বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারসহ নানা

2026-10-09T18:37:41+06:00
2026-10-09T18:37:41+06:00
শুক্রবার ● ৯ অক্টোবর ২০২৬
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, পুলিশের তালিকায় ২৫০ কিশোর
স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৭ পিএম  
প্রতীকী ছবি
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনায় কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করে অপরাধ বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে তাদের ব্যবহার করছে বিভিন্ন অপরাধী ও সন্ত্রাসী চক্র। নগরীর পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন থানা এলাকাতেও কিশোরদের সংঘবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। খুলনা জেলা পুলিশের প্রাথমিক তালিকায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২৫০ কিশোরের নাম এসেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অপরাধী চক্রগুলো কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করছে। এতে অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের আড়ালে থাকার সুযোগ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং দমনে সরকারের কঠোর নির্দেশনার পর পুলিশ মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও জানিয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান নয় বলে মনে করছেন আইনজীবী ও সমাজসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মাদকের সহজলভ্যতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, অপরাধী চক্রের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

খুলনা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, কিশোর গ্যাং নির্মূলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২৫০ কিশোরের একটি প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নগরীর বাইরেও বিভিন্ন থানা এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কিশোরদের সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তাদের মাধ্যমে মাদক কারবার, মারামারি ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, অতীতে খুলনা নগরীতে ‘ডেঞ্জার বয়েজ’, ‘গোল্ডেন বয়েজ’, ‘টিপসি বয়েজ’ ও ‘কিং অব রূপসা’ নামে কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য, এসব গ্রুপের অনেক সদস্য পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধী ও সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে খুলনার অপরাধজগতে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের অপরাধ কর্মকাণ্ডে কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, মাদকাসক্ত, পারিবারিক নজরদারির বাইরে থাকা এবং অপরাধপ্রবণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোরদের একটি অংশ ধীরে ধীরে অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শুরুতে ছোটখাটো অপরাধে জড়ালেও পরে তাদের কেউ কেউ মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি এমনকি হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

অপরাধী চক্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের মিছিল-মহড়া কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

কর্মকর্তাদের মতে, কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত হলে মূল হোতারা অনেক সময় আড়ালে থাকার সুযোগ পায়। তাই অপরাধে জড়িত কিশোরদের পাশাপাশি তাদের ব্যবহারকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এতে কিছু ফলও পাওয়া গেছে। দ্রুত খুলনায় কিশোর গ্যাংসহ সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম্য কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, সন্ত্রাসীরা বর্তমানে বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ত করছে। কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ করানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এসআরবি-৬-এর অভিযান ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত রয়েছে। খুলনাকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

খুলনা বারের সিনিয়র আইনজীবী শাহ আলমের মতে, কিশোর অপরাধ এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক সংকট। পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, সঙ্গদোষ, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকের সহজলভ্যতা, নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার ঘাটতি এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব কিশোরদের অপরাধে ঠেলে দিতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অনলাইন গেমে আসক্তি এবং অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের প্রভাবও ভূমিকা রাখছে। মাদকাসক্ত হওয়ার পর মাদকের অর্থ জোগাড় করতে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

কিশোরদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন আইনজীবী শাহ আলম। তার মতে, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে হবে। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করাও জরুরি।

একই সঙ্গে মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ এবং কিশোরদের অপরাধী চক্রের হাত থেকে দূরে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কিশোর গ্যাং দমনে শুধু সদস্যদের গ্রেপ্তার বা আইনের আওতায় আনা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কিশোরদের যারা অপরাধে ব্যবহার করছে, মাদক সরবরাহ করছে, অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব খাটিয়ে তাদের রক্ষা করছে, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে।

অন্যথায় একটি গ্রুপ ভেঙে দেওয়ার পর নতুন নামে আবারও একই ধরনের কিশোর গ্যাং গড়ে উঠতে পারে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ সমন্বিতভাবে পরিচালনার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমানোর ক্ষেত্রে তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কতজন কিশোর অপরাধে জড়িত, তা নয়। কারা তাদের ব্যবহার করছে, কোথা থেকে আসছে মাদক ও অর্থের জোগান এবং অপরাধী চক্রের পেছনে কারা রয়েছে, সেসবও খুজে বের করা জরুরি। অপরাধের মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা কিশোর গ্যাং দমনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
  বিষয়:   খুলনা  কিশোর গ্যাং  কিশোর অপরাধ  মাদক ও চাঁদাবাজি 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত