দুর্গা পূজার আগে একের পর এক ঘটনা, সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ

গাফফার খান চৌধুরী

প্রথম পাতা

আইন শৃঙ্খলা* নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ ডিএমপি কমিশনারের* বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তদন্ত করে দেখা হচ্ছেদুর্গা

2026-10-11T00:00:00+06:00
2026-10-11T15:54:47+06:00
সোমবার ● ১২ অক্টোবর ২০২৬
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
প্রথম পাতা
দুর্গা পূজার আগে একের পর এক ঘটনা, সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ
গাফফার খান চৌধুরী
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ১১.১০.২০২৬ ৩:৫৪ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
আইন শৃঙ্খলা

* নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ ডিএমপি কমিশনারের
* বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে

দুর্গা পূজার প্রাক্কালে রাজধানীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেয়ার ঘটনা, প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল নিক্ষেপ এবং খুলনায় পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ধর্মীয় উৎসবের সময় যে কোনো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড যাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় রূপ নিতে না পারে, সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত শনিবার দুপুরে ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে আকা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেয়ার ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্য সচিব এ এন এম আয়াসসহ কয়েক জনকে আটক করে পুলিশ। সংগঠনটি ইনডিয়ার আগ্রাসনের অভিযোগ তুলে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে চুনকালি মাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আয়াসসহ কয়েক জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানান। তবে ঘটনার পেছনে কোনো বৃহত্তর প্ল্যান রয়েছে কি না, সেটা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

গত ৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পরেশনের উদ্যোগে সেগুনবাগিচার ফুটপাথ দখল মুক্ত করার পর দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এবং সত্যজিৎ রায়সহ ১০ বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আকা হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেয়ার ঘটনা ঘটে। কেন অন্য কোনো প্রতিকৃতি নয়, রবীন্দ্রনাথের ছবিকেই লক্ষ্য করা হলো— এই প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে এর উত্তর অনুমানের ভিত্তিতে নয়, তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি। দুর্গা পূজার প্রাক্কালে এমন ঘটনা সামাজিক উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুকি তৈরি করতে পারে।

এর আগের রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দুটি ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। শুক্রবার রাত সোয়া ১টার দিকে মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিরা ককটেল দুটি নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর একটি বিস্ফোরিত হয়, অন্যটি উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা।

ঘটনার সময় কার্যালয়ে প্রধান মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার সামনে বিস্ফোরক নিক্ষেপের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল শনাক্ত করে জব্দের চেষ্টা চলছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজও চলছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন তিন জনকে আটকের খবর পাওয়া গেছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তদন্তে নিশ্চিত করতে হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে বিস্ফোরক নিক্ষেপের উদ্দেশ্য এবং এর পেছনে কারা জড়িত, সেটা শনাক্ত করা জরুরি। তবে এই ঘটনাকে দুর্গা পূজার আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর প্ল্যানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

এ ছাড়া খুলনায় ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। গত ৮ অক্টোবর রাতে শহরের কলেজিয়েট স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে মিডিয়া জানিয়েছে, বিশেষ অভিযান শেষে রিকশায় করে পুলিশ ক্লাবে যাওয়ার পথে তিন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি তার পথরোধ করে। এ সময় টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তার দুই হাতের কবজির ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়।

আহত শাহ আলমকে প্রথমে খুলনা মেডিকাল কলেজ হসপিটালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এ ঘটনার পর ৯ অক্টোবর রাতে খুলনা জেলা পুলিশ সদস্যদের একা চলাচল না করার নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, চলমান আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া এবং বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চলছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে রাতে একা চলাচল না করতে বলা হয়েছে।

তবে খুলনার এই হামলার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঘটনাটি ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, সেটা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।

গত ৬ অক্টোবর ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দীন আহমদ এবারের দুর্গা পূজাকে পুলিশের জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পূজা মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি পোশাকধারী ও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েনের কথা জানান তিনি। উৎসব ঘিরে নিরাপত্তা প্ল্যান, নজরদারি এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করা হয়েছে, ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা হতে পারে। কিছু সূত্র এ ধরনের তৎপরতার পেছনে বিদেশি গোষ্ঠীর মদদ থাকার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে। তবে এসব দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া এসব অভিযোগকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রকৃতি আলাদা। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে চুনকালি দেয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক প্রতীকের অবমাননার অভিযোগ রয়েছে। প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল নিক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। আর খুলনায় পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলাটি প্রাথমিকভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে সামনে এসেছে।

ঘটনাগুলো একই প্ল্যানের অংশ কি না, সেটা নির্ধারণে তদন্তের ফল, অভিযুক্তদের বক্তব্য, আলামত এবং গোয়েন্দা তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য খুজে দেখা প্রয়োজন। অনুমানের ভিত্তিতে একাধিক ঘটনাকে একই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্তের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দুর্গা পূজায় মানুষের নিরাপত্তা, মণ্ডপের সুরক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রশাসন, আয়োজক ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি। একই সঙ্গে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচার ঠেকাতে তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এখন দেখার বিষয়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্তে কি তথ্য উঠে আসে এবং উৎসবের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
প্রথম পাতা- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত