বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ প্রেস ক্লাবে রুহুল কবির রিজভী
* স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দোসররা রয়ে গেছে
* প্রশ্ন করার চর্চাই গড়ে তুলবে জ্ঞান-ভিত্তিক তরুণ সমাজ
দুর্গা পূজা উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধান মন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, কৃশ্চিয়ানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করে আসছে। ঈদ, পূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে একে অপরের অংশগ্রহণ দেশের ঐতিহ্যের অংশ।’ তিনি বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দুর্গা পূজা নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে পূজা মণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সাহসী বীর শহিদ নাজির উদ্দিন জেহাদের ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শহিদ জেহাদ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখেন প্রধান মন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, সাবেক এমপি নাজিমুদ্দিন আলম, হাবিবুর রহমান হাবিব, খন্দকার লুৎফর রহমান। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও এমপি খায়রুল কবির খোকন সভার সঞ্চালনা করেন।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে শহিদ নাজির উদ্দিন জেহাদসহ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আত্মদানকারীদের ত্যাগ জাতির জন্য প্রেরণার উৎস। তাদের আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এগিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ, স্বাধীন বিচার বিভাগ, ইলেকশন কমিশন ও মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা নিয়ে শহিদ জেহাদসহ অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছিলেন।’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে এসে নাজির উদ্দিন জেহাদ স্বৈরাচারী সরকারের গুলিতে প্রাণ হারান। তার আত্মত্যাগ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে আরো বেগবান করে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নতুন প্রেরণা জোগায়।’ তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। ওই আন্দোলনে শহিদ জেহাদ, ড. মিলনসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা ও আন্দোলন-কর্মী জীবন উৎসর্গ করেন। জাফর, জয়নাল, হারুন ও মোজাম্মেলসহ বিভিন্ন সময়ে আত্মদানকারী ছাত্র নেতাদের ত্যাগ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে রয়েছে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, ‘স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের পরও দেশে বারবার গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে শহিদদের আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের আন্দোলন-সংগ্রামে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রেরণা জুগিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দীর্ঘ দিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতার অংশ। সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন প্রতিকূলতা, শারীরিক অসুস্থতা ও জেলে থাকার মধ্যেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানও একই ধারায় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।’
স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও বিভিন্ন স্তরে তাদের দোসররা রয়ে গেছে
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগের যে ইতিহাস রয়েছে, তা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। শহিদ সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মুগ্ধ ও আহনাফসহ আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। অতীতের দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা চুরির ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব অনিয়ম ও অর্থ পাচারের সঙ্গে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের দোসররা জড়িত ছিল।’ তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে তাদের দোসররা রয়ে গেছে। এসব ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, “অতীতে এক জন শিক্ষা মন্ত্রী ‘সহনীয় পর্যায়ে দুর্নীতি করা যাবে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ ছাড়া হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের এক জন পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথা বলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে এ ধরনের মনোভাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিলে জনগণ তা সমর্থন করবে।”
সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং বন্ধ ফ্যাক্টরিগুলো সচল করার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। সরকারের উন্নয়ন, উৎপাদন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’ রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের পুনরুত্থান প্রতিহত করা জরুরি। অপতৎপরতা রোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
প্রশ্ন করার চর্চাই গড়ে তুলবে জ্ঞানভিত্তিক তরুণ সমাজ
শনিবার ঢাবি মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে জেআরএফ আয়োজিত ‘আইডিয়া ফেস্ট-২০২৫’ এর চূড়ান্ত পর্বে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, ‘তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে প্রশ্ন করার মানসিকতা গড়ে তোলার মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক, বিজ্ঞান-মনস্ক ও উদ্ভাবনী সমাজ নির্মাণ সম্ভব, যা রাষ্ট্রের অগ্রগতির নতুন পথ উন্মোচন করবে।’
প্রধান মন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘প্রশ্ন করার চর্চাই জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শনের মূল ভিত্তি। তরুণদের প্রশ্ন করার অবাধ সুযোগ দিলে সেখান থেকে নতুন নতুন ধারণা, চিন্তা তৈরি হবে। যা ভবিষ্যতে দেশের সংকট নিরূপণ ও জাতীয় প্ল্যান প্রণয়নে সবচেয়ে বড় উপাদান জোগাবে।’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘প্রশ্ন করার মাধ্যমে যেমন শিক্ষা অর্জন ও অন্তরের পরিচর্যার পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা তরুণদের নতুন নতুন ধারণাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব। কেবল সোশাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি তরুণ সমাজকে বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীদের সঙ্গে দেশ, সমাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও চিন্তা-ভাবনা করার আহ্বান জানান।
জেআরএফ’র মানবিক ও সমাজ কল্যাণমূলক কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী রাজত্বকালে মুক্তচিন্তা, বাক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের পরিবেশ সংকুচিত হয়েছিল। এত প্রতিকূলতার মধ্যে তখনো জেআরএফ সামাজিক ও সেবামূলক কাজ চালিয়ে গেছে।’ অতীতে কঠোর বিধিনিষেধ ও রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশের মধ্যেও জেআরএফ তাদের কার্যক্রম যেমন- ভার্চুয়াল বিজ্ঞান মেলার আয়োজন ও কোভিড-১৯ মহামারি ও ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক উদ্যোগ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছিল তা উল্লেখ করে তিনি সংগঠনটির বলিষ্ঠ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেআরএফের নির্বাহী পরিচালক ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। এছাড়া ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমানও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।