ছবি: যাযাদিখুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নে যুবদল নেতা বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে জমি দখল, বিধবার সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা, সরকারি খাল ও বালুমহাল দখল এবং চাদাবাজিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী। তবে অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন বাহাদুর মুন্সী। স্থানীয় সংসদ সদস্যও জানিয়েছেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার দায় দল নেবে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এলাকায় পরিচিতি কম থাকলেও গত এক বছরে বাহাদুর মুন্সীকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। বর্তমানে তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব পদে রয়েছেন এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ জানিয়ে পোস্টার ছাপিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের একাংশের নেতাকর্মীরাও বিব্রত বলে দাবি করেছেন কয়েকজন নেতা।
খুলনা মহানগরীর রায়েরমহল এলাকার বাসিন্দা বিধবা নাছিমা হাসান অভিযোগ করেন, তার স্বামী ইমাম হাসান বাচ্চু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামী জীবিত থাকাকালে ২০১৫ সালের আট মার্চ বটিয়াঘাটার রাঙ্গেমারী গ্রামে ১৪ শতক জমি কেনেন। জমিটির দাগ নম্বর ২১৬৩। সেখানে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি আরসিসি ঢালাই দিয়ে দোকানও তৈরি করেন তারা।
নাছিমার অভিযোগ, ২০২৫ সালের একটি দলিল দেখিয়ে বাহাদুর মুন্সী জমিটির একাংশ দখলের চেষ্টা করছেন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা পুলিশ সুপারকে জানানোর পর গত রোববার সকালে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে নির্মাণাধীন দোকানটি হাতুড়ি দিয়ে ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এমপি মামলা নম্বর ৫০২/২৬ দায়ের করেন। আদালত শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দিলেও গত ১৩ অক্টোবর তাকে ও তার ছেলেদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ নাছিমার। এ ঘটনায় তিনি অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এরপরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান তিনি।
বটিয়াঘাটার সাচিবুনিয়া এলাকার বিভাস গোলদার অভিযোগ করেন, চক্রাখালী বাজারে তার পৈতৃক সম্পত্তিতে নির্মিত দোকানগুলো ভাড়া দেওয়া ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর বাহাদুর মুন্সী ব্যক্তিগত কার্যালয়ের জন্য একটি দোকান ভাড়া নেন। কয়েক মাস পর তিনি দোকানগুলো নিজের বলে দাবি করেন এবং দলিল থাকার কথা জানান। এভাবে তার দোকানঘর দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিভাসের।
বিভাস গোলদার বলেন, আমি হিন্দু মানুষ, কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না। এ কারণে তিনি মামলা-মোকদ্দমায় যাননি বলে জানান। এ ছাড়া চক্রাখালী বাজারে আকরামের সাতটি দোকান দখল, তেঁতুলতলা এলাকার মরিয়ম নামের এক দরিদ্র নারীর ২৫ শতক জমি দখল এবং ছয়ঘড়িয়া এলাকায় স্কুলের পাশে একটি দোকানঘর দখলের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ছয়ঘড়িয়া এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি দখল করে ভ্যান গ্যারেজ, দোকানঘর ও প্লট তৈরি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, বটিয়াঘাটা বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাহাদুর মুন্সী ও তার লোকজন জোরপূর্বক চাদা আদায় করেন। তাদের আরও দাবি, পাচ আগস্টের পর পশুর নদীর তেঁতুলতলা, পুটিমারি, কাতিয়ানাংলা ও আশপাশের এলাকায় বালুমহাল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
ওই নেতাদের ভাষ্য, বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে খোকন ও জাহাঙ্গীর হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের দাবি, সম্প্রতি প্রভাব খাটিয়ে কয়েকটি মামলা প্রত্যাহার করাতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামলার নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, জমি দখল, সরকারি খাল ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ এবং চাদাবাজির অভিযোগ ঘিরে গত আট আগস্ট রাতে বাহাদুরের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। বটিয়াঘাটা সদর এলাকার যুবদলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাহাদুর মুন্সীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে দল বিব্রত। খুলনা-এক আসন ধরে রাখতে হলে দখলবাজি ও চাদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে বাহাদুর মুন্সী বলেন, জমির কাগজপত্র ঠিক আছে। তাই তিনি জমিটি কিনে দখল বুঝে নিয়েছেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, এ নিয়ে তদন্ত চলছে এবং তার দাবি, কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি কোনো আইন ভঙ্গ করেননি বলেও দাবি করেন।
চাদাবাজি, বালুমহাল দখলসহ অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে বাহাদুর মুন্সী বলেন, দলের সুবিধাভোগীরা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। বাহাদুর মুন্সীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা-এক আসনের সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমীর এজাজ খান বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ দখল, চাদাবাজি বা অন্য কোনো অপরাধ করলে তার দায় দল নেবে না।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক জীবনে এলাকায় তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে। কোনো ভূমিদস্যু বা দুষ্কৃতকারীর কারণে সেই ভাবমূর্তি নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। দখলদারদের পক্ষে তার অবস্থান নেই বলেও জানান তিনি।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, বটিয়াঘাটাসহ চার উপজেলায় বিশেষ অভিযান চলছে। অপরাধীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জমি বা দখলসংক্রান্ত অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।