ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চার পথে সরকার

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রথম পাতা

* ২০ বছরের বেশি পুরনো বাস অপসারণের প্ল্যান* গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন* সংস্কারের আওতায় পুরনো ৩১টি

2026-10-23T00:00:00+06:00
2026-10-23T15:43:26+06:00
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
প্রথম পাতা
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চার পথে সরকার
পরিবর্তনের প্ল্যান
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৩.১০.২০২৬ ৩:৪৩ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
সংগৃহীত ছবি
* ২০ বছরের বেশি পুরনো বাস অপসারণের প্ল্যান
* গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
* সংস্কারের আওতায় পুরনো ৩১টি সড়ক রুট
* অটো রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে

রাজধানী ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গণপরিবহনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্ল্যান  করছে সরকার। ২০ বছরের বেশি পুরনো বাস সরিয়ে নেয়া, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, পুরনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার এবং অটো রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যানজট কমানো, যাত্রী সেবার মান বাড়ানো ও সড়ক নিরাপদ করার লক্ষ্য সামনে রেখে এসব প্ল্যান সাজানো হচ্ছে। তবে শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, দীর্ঘদিনের পরিবহন বিশৃঙ্খলা কাটাতে এবার বাস্তবায়ন ও তদারকিতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বাস মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব উদ্যোগের বিষয়ে জানা গেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতি মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ‘রাজধানীর যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পদক্ষেপ নিলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া কঠিন। পুরনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, সড়ক রুট সংস্কার এবং অটো রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ— সব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত প্ল্যানের আওতায় বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করাই হবে প্রধান লক্ষ্য।’
রাজধানীর যানজটের চাপ এখন সড়ক ছাড়িয়ে রাজধানীর অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনেও পড়ছে। কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হসপিটাল কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পৌছাতে দীর্ঘ সময় সড়কে কাটাতে হচ্ছে মানুষকে। বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, নষ্ট হচ্ছে কর্ম ঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কের সর্বোচ্চ ব্যবহার, বাস চলাচলের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এই পরিস্থিতির টেকসই সমাধান কঠিন।

পুরনো বাস সরানোই প্রথম পরীক্ষা
রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী পুরনো বাসের একটি অংশ যান্ত্রিক ত্রুটি, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ ও অতিরিক্ত ধোয়া নির্গমনের কারণে সড়ক নিরাপত্তা এবং পরিবেশের জন্য ঝুকি তৈরি করছে। এসব যানবাহন বিকল হয়ে সড়কে আটকে পড়লে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। তাই ২০ বছরের বেশি পুরনো বাস অপসারণের উদ্যোগ গণপরিবহনের মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে পুরনো বাস সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিকল্প বাসের ব্যবস্থা না থাকলে যাত্রী পরিবহনে ঘাটতি তৈরি হতে পারে, বাড়তে পারে অপেক্ষার সময় ও ভোগান্তি। এ কারণে রুট-ভিত্তিক বাসের সংখ্যা, যাত্রী চাহিদা ও যানবাহনের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন জরুরি। নতুন বাস যুক্ত করার ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশগত সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে। চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্ধারিত কর্ম ঘণ্টা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণে নজরদারিও জোরদার করা প্রয়োজন।

টার্মিনাল সরালেই কি কমবে যানজট
সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাসের চাপ, যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং আন্তঃজেলা বাসের প্রবেশ ও বহির্গমন সড়কের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলে। এসব এলাকার টার্মিনাল স্থানান্তর কিংবা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা গেলে কেন্দ্রীয় সড়কে যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু টার্মিনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় রেখে। শহরের প্রান্তে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ বা স্থানান্তর করা হলেও সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়ার পর্যাপ্ত বাস, মেট্রো রেল কিংবা অন্যান্য পরিবহন সংযোগ না থাকলে যাত্রীদের সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়তে পারে। নতুন টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, বাসের অপেক্ষমাণ জায়গা, পার্কিং এবং যাত্রী ওঠানামার স্থান পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তঃজেলা বাস ও মহানগরীর অভ্যন্তরীণ পরিবহনের মধ্যে সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

৩১ রুটে সংস্কার, নজর বাস চলাচলেও
রাজধানীর পুরনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের উদ্যোগ গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের আরেকটি সুযোগ তৈরি করছে। তবে কোন রুটগুলো এই প্ল্যানের আওতায় রয়েছে এবং সংস্কারের ধরন কি হবে, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রুট সংস্কার কেবল সড়কের উপরিভাগ মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না। বাস চলাচলের পথ, স্টপেজ, যাত্রী ওঠা-নামার স্থান, সংযোগকারী সড়ক এবং যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ঢাকার অনেক সড়কে একই পথে একাধিক বাস কম্পানির প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো এবং যাত্রী তোলার জন্য হঠাৎ লেন পরিবর্তনের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। আবার কিছু এলাকায় যাত্রীর তুলনায় বাসের সরবরাহ কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। যাত্রী চলাচলের তথ্য, ব্যস্ত সময়ের চাহিদা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হসপিটালের অবস্থান এবং মেট্রো রেলের সঙ্গে সংযোগ বিবেচনায় নিয়ে রুট পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে। তবে রুট পরিবর্তনের কারণে কোনো এলাকার মানুষ যেন পরিবহন সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য বিকল্প রুট ও সংযোগকারী বাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

নীতিমালার আওতায় আসবে অটো রিকশা
রাজধানীর সড়কে অটো রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগও রয়েছে সরকারের প্ল্যানে। বিশেষ করে ব্যাটারি-চালিত তিন চাকার যানবাহনের চলাচল, সড়কের ধারণ ক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় যানবাহনের নিবন্ধন ও পরিচিতি, চালকের যোগ্যতা, নিরাপত্তার মান, অনুমোদিত চলাচল এলাকা, পার্কিং এবং যাত্রী ওঠা-নামার নিয়ম নির্ধারণ করা যেতে পারে।

কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলবে, সেটা নির্ধারণে সড়কের ধারণ ক্ষমতা, যানবাহনের গতি ও দুর্ঘটনার ঝুকি বিবেচনায় নেয়া জরুরি। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা, নির্ধারিত স্ট্যান্ড এবং বাস্তব-সম্মত প্রয়োগ ব্যবস্থা না থাকলে নিয়ন্ত্রণের সুফল সীমিত হতে পারে। চালক, মালিক, যাত্রী ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে সেটা বাস্তবায়নের পথও সহজ হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, ‘পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে প্ল্যান গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য কর্ম পরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় রেখে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও যাত্রী সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা এবং গণপরিবহনের সহজলভ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।’

চার উদ্যোগ বাস্তবায়নে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং পরিবহন মালিকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কোন সংস্থা কি দায়িত্ব পালন করবে, কত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে এবং অগ্রগতি কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেটা নির্দিষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত স্টপেজ কার্যকর করা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং যাত্রীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

বাসের গড় যাত্রা সময়, স্টপেজে অপেক্ষার সময়, যানজটের স্থায়িত্ব, সড়ক দুর্ঘটনার হার ও গণপরিবহনে যাত্রীর সংখ্যা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফেরাতে প্ল্যানের পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক তদারকি, আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহি। চার উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে যানজট কমানো এবং যাত্রী সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রথম পাতা- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত