স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ *স্পিকারকে প্রধান করার প্রস্তাব আলোচনায় উচ্চ কক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টও
* তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে একাধিক বিকল্প আলোচনা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি
* স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার পাশাপাশি উচ্চ কক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টও আলোচনায়
* প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নির্ধারণে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে পার্লামেন্টের স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাব যেমন রয়েছে, তেমনি সম্ভাব্য উচ্চ কক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টকে এ দায়িত্ব দেয়ার বিকল্পও বিবেচনায় এসেছে। তবে এসব প্রস্তাবের কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচারক নিয়োগ আইন এবং এমপিদের ভোট দেয়ার স্বাধীনতা— এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও মতামত নিয়েছে কমিটি।
শনিবার পার্লামেন্ট ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত কমিটির নবম বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বেলা ১১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপৃম কোর্টের আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানান হয়। আমন্ত্রিত ৬০ জনের মধ্যে ৪৪ জন উপস্থিত ছিলেন। তাদের মতামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তার ভাষ্য, জুলাই জাতীয় সনদে যেভাবে ঐকমত্য হয়েছিল, তার ভিত্তিতে বিচার বিভাগকে বাইরে রেখে এবং প্রেসিডেন্টকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে না রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। এ ক্ষেত্রে সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে সমাধানে পৌছানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
আলোচনায় এমন প্রস্তাবও এসেছে, যাতে উচ্চ কক্ষ গঠন হলে সেটি নিম্ন কক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হয়। সে ক্ষেত্রে উচ্চ কক্ষের ভাইস প্রেসিডেন্টকে স্পিকারের দায়িত্ব দেয়ার ধারণা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। আবার সরকার ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচিত হলে তাকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার প্রস্তাবও এসেছে। অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের সম্মতি নিশ্চিত করার ধারণা আলোচনায় এসেছে। তবে এগুলো বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব মাত্র; কমিটি এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ভিন্নমত পর্যালোচনা, বিরোধীদের ফেরানোর চেষ্টা
জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে ‘নোট অফ দি ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো শিথিল করা হবে কি-না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কমিটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে আরো এক-দুটি বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেয়ার প্ল্যান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে মতামত সংগ্রহ ও মূল্যায়নের কাজ দ্রুত করার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
বিরোধী দলকে প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি। তার আহ্বান, বিএনপির দেয়া ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ নিয়ে কোনো পরিবর্তন চাইলে বিরোধী দলকে কমিটির বৈঠকে এসে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে হবে। সরকারের বক্তব্য, আলোচনার মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করা হবে; একতরফাভাবে নয়।
সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোন কাঠামোয় গঠন হবে, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ— এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সংবিধানের চেয়ে আরো উন্নত ও কার্যকর সংবিধান প্রণয়নের পথে এগোনো সম্ভব হবে।
তবে বিচারক নিয়োগ আইন ও সুপৃম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাদ পড়ায় হতাশা প্রকাশ করেন আসিফ নজরুল। তার বক্তব্য, বিএনপিরও এসব উদ্যোগের পক্ষে অঙ্গীকার ছিল। বৈঠকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে আইন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সরকার পরবর্তী সময়ে আইনগুলো প্রণয়ন করবে। অর্থাৎ, বিষয় দুটি পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়নি বলে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।
৭০ অনুচ্ছেদে ভোটের স্বাধীনতা
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জানান, আস্থা ভোট, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন— এই চারটি ক্ষেত্র ছাড়া অন্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দিতে পারবেন, এমন ধারণা আলোচনায় এসেছে। এসব ক্ষেত্রের বাইরে এমপিদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার সীমিত করার কোনো প্রস্তাব এখন পর্যন্ত আসেনি বলেও জানান তিনি।
পার্লামেন্টের স্থায়ী কমিটিগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, সে জন্য সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের বিষয়টিও তুলেছেন আসিফ নজরুল। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেয়ার প্রস্তাবও তিনি দিয়েছেন। তবে বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য ও
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচারক নিয়োগের আইন, সুপৃম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন কার্যপরিধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বিচার বিভাগের পর্যালোচনার ক্ষমতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হয়েছে।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক কমিটির আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা অনেক প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু পরে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে পরিবর্তন আনা হয়, তা নিয়ে তিনি হতাশ হয়েছিলেন। এবারের প্রক্রিয়ায় সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশাকে আলোচনায় গুরুত্ব দেয়ার আহ্বানও জানান সাবেক এই আইন উপদেষ্টা।’ তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থায়ী কমিটিগুলোকে কার্যকর করার জন্য আইন প্রণয়নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী সদস্যদের দেয়ার প্রস্তাবেও এখনো কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি।’
সব মিলিয়ে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, সংসদীয় জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য— একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধান খোজা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমত থাকা বিষয়গুলোতে ঐকমত্য তৈরির ওপরই নির্ভর করছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথ।