
আস্থার সংকট
* পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি ও অতীতের বিতর্কের দায়ে চাপে পুলিশ সদস্যরা
* উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া প্রায় এক হাজার ৪০০ অস্ত্র ও আড়াই লাখ গোলাবারুদ
* পুড়ে যাওয়া ও হারিয়ে যাওয়া মামলার নথি অপরাধী ধরতে জটিলতা তৈরি করছে
পুলিশের মনোবল এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানায় হামলা, অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংসের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাহিনীটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়, সদস্যদের পারস্পরিক সন্দেহ এবং জনগণের আস্থার সংকট। কোনো অভিযান চালাতে গেলেই বিতর্কের আশঙ্কা, গ্রেফতারের পর চাপ এবং তদন্তের নথি নিয়ে প্রশ্ন, সব মিলিয়ে দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকতে হচ্ছে পুলিশকে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তার ভাড়া দেয়া বাসায় ডিবির অভিযান ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে বাহিনীর পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও অভ্যন্তরীণ আস্থার প্রশ্ন।
তদন্তকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রের দাবি, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৪৬০টি আক্রান্ত হয়। মেট্রোপলিটন এলাকার থানাগুলোর প্রায় সবই হামলার শিকার হয়। সূত্রগুলোর দেয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের ১১০টি মেট্রপলিটন থানার বাইরে ৫২৯টি সাধারণ থানা রয়েছে। আক্রান্ত থানাগুলো থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। এখনো প্রায় এক হাজার ৪০০ অস্ত্র এবং আড়াই লাখ গোলাবারুদের হদিস মেলেনি বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নথি হারিয়ে জটিলতা, অপরাধ দমনে বাধা
তদন্ত সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হামলা ও আগুনে থানার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে যায়। ডিজিটাল নথি ধ্বংস করতে কম্পিউটারও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বলে তাদের দাবি। এতে থানায় দায়ের হওয়া এবং তদন্তাধীন বহু মামলার কাগজপত্র পুলিশের হাতে নেই। আদালতে দায়ের হওয়ার পর তদন্তের জন্য থানায় পাঠানো মামলার নথি পুনরায় আদালত থেকে সংগ্রহ করা গেলেও থানায় থাকা পুরনো মামলার সব নথি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
হারিয়ে যাওয়া নথির মধ্যে সন্ত্রাস বিরোধী আইন ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলার কাগজপত্রও রয়েছে। প্রমাণের ঘাটতিতে এসব মামলার কিছু আসামিকে আইনের আওতায় আনতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কাউকে আটক বা গ্রেফতার করতে গেলেই সুনির্দিষ্ট নথি দেখানোর দাবি উঠছে। কোথাও কোথাও গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে থানা ঘেরাও, পুলিশের ওপর হামলা এবং ‘মব’ সন্ত্রাসের ঘটনাও ঘটছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এই পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রমে দ্বিধা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। কোনো অভিযান চালালেই তা নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্কের আশঙ্কায় সদস্যরা সতর্ক থাকছে। তবে আইন প্রয়োগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি অপরাধ দমনে কার্যকর সক্ষমতা বজায় রাখাও পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আস্থা ফেরাতে নিরপেক্ষতার পরীক্ষা
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা এক দিনে তৈরি হয়নি। বিগত সরকারের আমলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগের জের ধরে সরকার পতনের পর থানায় হামলা, লুটপাট ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের ধারণা। মিরপুরে রিকশা চালকদের পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বাহিনীর প্রতি জন-অসন্তোষের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। আবার চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় জাতীয় কৃকেট দলের কৃকেটার নাঈম হাসানকে অটো রিকশা থেকে নামিয়ে মারধর এবং থানায় নিয়ে হেনস্তার অভিযোগ পুলিশকে সমালোচনার মুখে ফেলে।
তবে পুলিশের ইতিবাচক সাফল্যও রয়েছে। ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র সাত ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিসহ দুই জনকে গ্রেফতারের ঘটনায় পুলিশ প্রশংসা পেয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, দ্রুত ও পেশাদার পদক্ষেপ জন-আস্থা ফেরাতে ভূমিকা রাখতে পারে; আবার বিতর্কিত আচরণ সেই আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এখন পুলিশের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সময়। তার মতে, সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারলে জনগণ আবারো পুলিশকে আপন করে নেবে। মামলা তদন্তে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ রিপোর্ট আদালতে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ও তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ সদস্য থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা— সব পর্যায়েই আচরণগত পরিবর্তন জরুরি। মানুষ যেন ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই পুলিশের কাছে নিজের কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পুলিশের প্রতি আস্থা ফেরাতে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির বিকল্প নেই।’
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরও সদস্যদের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে নিজেদের আচরণ বদলাতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মানুষ যেন পুলিশকে আপন মনে করে এবং কেবল অপরাধ করলেই পুলিশের উপস্থিতিতে ভয় পায়, এমন পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। আইজিপির দাবি, পুলিশের পক্ষ থেকে এ প্রচেষ্টা ধারাবাহিকভাবে চলছে।
তবে নির্দেশনা আর বাস্তবতার ব্যবধান ঘোচানোই এখন বড় পরীক্ষা। হারানো নথির সমস্যা মোকাবিলা, অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সদস্যদের আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই পুলিশের মনোবল ও জন-আস্থা ফেরানোর পথ তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তাহীনতা, মামলা ও নেতৃত্বের সংকটে মনোবল
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের মনোবল না ফেরার পেছনে শুধু থানায় হামলা, অস্ত্র লুট কিংবা মামলার নথি হারানোর ঘটনা দায়ী নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাহিনীটির সামনে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক সংকট। অতীতের বলপ্রয়োগের অভিযোগে জবাবদিহি, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, মামলা ও চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তা, নেতৃত্বের ওপর আস্থার প্রশ্ন এবং জনরোষ, সব মিলিয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও বিচার একদিকে যেমন প্রয়োজন, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের সময় প্রতিশোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও সদস্যদের উদ্বিগ্ন করছে। সরকার পতনের পর বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা এবং থানায় ভাঙচুরের ঘটনা সেই নিরাপত্তাহীনতাকে আরো বাড়িয়েছে। ফলে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে একদিকে আইনগত দায়িত্ব, অন্যদিকে সম্ভাব্য জনরোষ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা। আন্দোলনে বল প্রয়োগের অভিযোগে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা, সাময়িক বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরের মতো পদক্ষেপ নিয়ে মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন থাকলেও, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার বিচার কিভাবে হবে, চাকরির ভবিষ্যৎ কি হবে, এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর না থাকলে বাহিনীর ভেতরে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তবে অভিযুক্তদের দায় এবং নির্দোষ সদস্যদের অধিকার আলাদাভাবে বিবেচনা করাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নেতৃত্ব, পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়েও অনিশ্চয়তা মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত বদলি-পদোন্নতি, স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের পাশে দাড়ানোর মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকলে পুলিশ সদস্যরা ঝুকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ কর্ম ঘণ্টা, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত কল্যাণ সেবার ঘাটতি এবং সহকর্মীদের ওপর হামলার অভিজ্ঞতা তাদের পেশাগত চাপ বাড়ায়।
জনগণের আস্থাহীনতাও সংকটকে জটিল করছে। গ্রেফতার বা অভিযান চালানোর সময় বাধা, থানা ঘেরাও কিংবা পুলিশের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অভিযোগের মুখে পড়ার আশঙ্কা মাঠ পর্যায়ে কাজের পরিবেশকে কঠিন করে তুলতে পারে। আবার অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার বা পক্ষপাতের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে জন-আস্থাও ফিরবে না। অর্থাৎ, পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুলিশের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা— দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কাটাতে শুধু কঠোর নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, প্রমাণ ভিত্তিক বিভাগীয় ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত পদায়ন, কার্যকর প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের আইন সম্মত দায়িত্ব পালনে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দিতে হবে, যাতে তারা অন্যায় চাপ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশের মনোবল ফেরানো এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন একই প্রক্রিয়ার দুটি দিক। সদস্যদের নিরাপত্তা ও পেশাগত নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ভারসাম্য তৈরি না হলে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা এবং জনসাধারণের সঙ্গে দূরত্ব— দুটিই দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুকি থাকবে।