
* আট বছর ধরে অপেক্ষা মার্টিনের, প্রিয় খাবার আবার পপকর্ন
মালিক আর ফিরবে না— এ খবরটা মার্টিনকে কেউ বুঝিয়ে বলতে পারেনি। নাকি বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেও সে কান দেয়নি। তাই বলে আট-আটটা বছর হসপিটালের চৌহদ্দি ছেড়ে যাবে না? যাবে না-ই যখন, তখন কেউ তাকে জোর করে নিয়ে যেতেও পারছে না। বলিভিয়ার সান্টা ক্রুজ শহরের একটি ক্যানসার হসপিটালের বাইরে এমনই এক অদ্ভুত অপেক্ষার নাম মার্টিন। সে কোনো কুকুর নয়, বিড়ালও নয়। সে একটি মোরগ।
বিশ্বস্ততার গল্পে জাপানের হাচিকো নামের কুকুরটির কথা অনেকেই জানেন। মালিকের মৃত্যুর পরও বছরের পর বছর রেল স্টেশনে অপেক্ষা করে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল সে। এবার সেই তালিকায় নাম লেখাতে হাজির মার্টিন। তবে তার গল্পে একটা মজার মোচড় আছে, অপেক্ষার পাশাপাশি পপকর্নের প্রতিও তার রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা।
হসপিটালই যেন তার ঠিকানা
ঘটনার শুরু কয়েক বছর আগে। মার্টিনের মালিক ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন বলিভিয়ার পূর্ব অঞ্চলীয় অনকোলজি ইন্সটিটিউটে। চিকিৎসার জন্য হসপিটালে ঢুকেছিলেন তিনি, কিন্তু আর ফিরে আসেননি। মালিকের মৃত্যুর পরও হসপিটাল চত্বরেই থেকে যায় মার্টিন। সেই থেকে হসপিটালের আশপাশে ঘোরাঘুরি, মাঠে হাটাহাটি আর গাছের ডালে রাত কাটানো, এভাবেই চলছে তার দিন। সময় বদলেছে, হসপিটালের আঙিনায় কত মানুষ এসেছে-গেছে; কিন্তু মার্টিনের ঠিকানা বদলায়নি।
মানুষ হলে হয়তো এত দিনে নতুন ঠিকানা খুজত, বাড়ি ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি করত, কিংবা পুরনো স্মৃতি ভুলতে অন্য কোথাও চলে যেত। মার্টিন সেসব ঝামেলায় যায়নি। তার জীবন অনেক সহজ, হসপিটাল আছে, পরিচিত মানুষ আছে, আর আছে পপকর্নের ব্যবস্থা।
হাচিকোর সঙ্গে তুলনা, তবে পপকর্নে দুর্বলতা
মালিকের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে মার্টিনকে জাপানের বিখ্যাত কুকুর হাচিকোর সঙ্গে তুলনা করছেন স্থানীয় লোকজন। হাচিকো অপেক্ষা করত রেল স্টেশনে, মার্টিনের অবস্থান হসপিটালের বাইরে। দুই জনের গল্পেই বিচ্ছেদের বেদনা আর অবিচল থাকার ছবি। তবে মার্টিনের জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার খাবারের পছন্দও।
স্থানীয় মিডিয়া রেড উনোর রিপোর্ট অনুযায়ী, কেউ খাবার দিলে মার্টিন তার কাছে এগিয়ে যায়। আর পিপোকা, অর্থাৎ পপকর্ন— তার বিশেষ পছন্দের খাবার।
অবশ্য মোরগটি সত্যিই মৃত মালিকের ফেরার অপেক্ষায় আট বছর কাটাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। প্রাণীর আচরণ নিয়ে এমন সিদ্ধান্তে পৌছানো সহজ নয়। কিন্তু তার এই দীর্ঘদিনের অবস্থান মানুষের মনে যে প্রশ্ন ও আবেগ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
হসপিটালের আপন জন
মার্টিন এখন হসপিটালের কর্মী, রোগী ও আশপাশের দোকানিদের কাছে পরিচিত মুখ। তার খাওয়া-দাওয়ার খেয়াল রাখে স্থানীয় লোকজন। হসপিটালের ব্যস্ত পরিবেশে ছোট্ট এই প্রাণীটি যেন পরিচিত এক উপস্থিতি, যাকে দেখলে অনেকেরই মায়া হয়।
ভাবুন তো, যেখানে মানুষ আসে রোগের সঙ্গে লড়তে, সেখানে এক মোরগ নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছে সঙ্গ আর মমতার প্রতীক। তার কোনো বক্তৃতা নেই, সোশাল মিডিয়ায় আবেগঘন পোস্ট দেয়ার ক্ষমতাও নেই। আছে শুধু একই জায়গায় থেকে যাওয়ার অভ্যাস। আর সেই অভ্যাসের নামই মানুষ দিয়েছে বিশ্বস্ততা।
অপেক্ষারও কি কোনো শেষ আছে
মার্টিনের গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই। সে কি সত্যিই মালিকের ফেরার অপেক্ষা করছে, নাকি হসপিটাল চত্বরই হয়ে উঠেছে তার চেনা আশ্রয়? উত্তরটি অজানা। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আট বছর পরও সে ওই জায়গাতেই রয়েছে। তার ছবি ও গল্প নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়।
মানুষের জীবনে অপেক্ষার বিভিন্ন হিসাব থাকে, কেউ অপেক্ষা করে ফোনের, কেউ প্রিয়জনের, কেউ আবার মাসের শেষে বেতনের। মার্টিনের অপেক্ষার হিসাব কি, তা জানার উপায় নেই। তবে তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, কোনো প্রাণীর আচরণকে আমরা যে নামেই ডাকি না কেন, তার প্রতি মমতা দেখানোর জন্য সব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি নয়। আর হ্যা, মার্টিনের সঙ্গে দেখা হলে পপকর্ন নিতে ভুলবেন না। আট বছরের অপেক্ষার গল্পে অন্তত এইটুকু তথ্য বেশ নির্ভরযোগ্য— খাবার পেলে সে আপনার দিকে এগিয়ে আসতে পারে। তথ্যসূত্র :এনডিটিভি