বিএনপির ঘরে অসন্তোষ-অস্বস্তি

উমর ফারুক

প্রথম পাতা

* খোকা-আব্বাসের পর ঢাকার রাজনীতিতে নেতৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন* ইশরাক, আমিনুল ও নিরবদের ঘিরে স্থানীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ* মিরপুরের তিন

2026-10-24T00:00:00+06:00
2026-10-24T16:28:06+06:00
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
প্রথম পাতা
বিএনপির ঘরে অসন্তোষ-অস্বস্তি
রাজধানীর রাজনীতি
উমর ফারুক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৪.১০.২০২৬ ৪:২৮ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
* খোকা-আব্বাসের পর ঢাকার রাজনীতিতে নেতৃত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন
* ইশরাক, আমিনুল ও নিরবদের ঘিরে স্থানীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ
* মিরপুরের তিন আসনে জামায়াতের জয়ে প্রশ্নের মুখে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি
* মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব বাড়ছে

রাজধানীর সাতটি সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর জয়, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব এবং প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ— ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও কর্মী ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় দলটির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক সমন্বয় ও নির্বাচনী কৌশল পর্যালোচনার তাগিদ বাড়ছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, যোগ্য নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, গোষ্ঠী-স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া এবং তৃণমূলের মতামত উপেক্ষার প্রবণতা বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ঝুকি তৈরি করছে।

রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা। এখানকার রাজনৈতিক সমীকরণ শুধু সংসদীয় আসনের জয়-পরাজয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; জাতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি, জনমত গঠন ও দলীয় সাংগঠনিক শক্তির ওপরও এর প্রভাব পড়ে। ফলে রাজধানীতে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা বিএনপির জন্য কেবল নির্বাচনী সাফল্যের প্রশ্ন নয়, দলটির সামগ্রিক শক্তি ও নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতারও পরীক্ষা।

একসময় ঢাকার রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নেতৃত্বে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। বিশেষ করে সাদেক হোসেন খোকা ঢাকার রাজনীতিতে যে জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক প্রভাব তৈরি করেছিলেন, তা দীর্ঘদিন দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

খোকার মৃত্যুর পর পুরান ঢাকায় তার পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে ইশরাক হোসেনের উত্থান ঘটে। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি স্থানীয় পরিচিতি ও জনসম্পৃক্ততাও তার রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ দিক। ফলে ইশরাকের মতো নেতাদের মূল্যায়নে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবদান বিবেচনার দাবি রয়েছে।
তবে ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু পুরনো নেতৃত্বের প্রভাব ধরে রাখা নয়; বরং অভিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সমন্বয়, স্থানীয় নেতৃত্বের আস্থা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিকে একই ধারায় নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে দলীয় ঐক্য থেকে শুরু করে ভোটের মাঠ পর্যন্ত।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যায়যায়দিনকে বলেন, ‘রাজনীতির প্রতিটি ধাপেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রধান মন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান সব সময় শক্তিশালী ছিল, আছে এবং আগামীতেও থাকবে। সাংগঠনিক শক্তি ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখতে যখন যা প্রয়োজন হবে, তখন তা-ই করা হবে।

নেতৃত্ব আছে, সমন্বয় কতটা
রাজধানীতে বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমান, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আমিনুল হক, ইশরাক হোসেন, এম এ কাইয়ুম, সাইফুল ইসলাম নিরব, এস এম জাহাঙ্গীর ও তানভীর আহমেদ রবিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক যোগাযোগ, কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিএনপির রাজধানী কেন্দ্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

কিন্তু এসব নেতার রাজনৈতিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা এক রকম নয়। কেউ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিক, কেউ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিচিতি অর্জন করেছেন, আবার কেউ নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তাই সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার না করে তাদের যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবদান অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নেতাদের সমন্বয় ঘটানো। প্রবীণ নেতাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক যোগাযোগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় তরুণ নেতাদের উদ্যম এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এক পক্ষকে উপেক্ষা করে অন্য পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে নেতৃত্বের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দলীয় পদ-পদবি বা সাংগঠনিক দায়িত্ব বণ্টন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নেতা-কর্মীদের মনোবল, স্থানীয় সাংগঠনিক ঐক্য এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি। দীর্ঘদিন দলীয় কর্মসূচি পালন করা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কর্মীদের পাশে থাকা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা ধরে রাখা নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তৃণমূলে হতাশা তৈরি হতে পারে।

পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা জনপ্রিয়তাকেই নেতৃত্ব নির্বাচনের একমাত্র মানদণ্ড করা সমীচীন নয়। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সততা, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, জনগ্রহণযোগ্যতা এবং কর্মীদের ঐক্য ধরে রাখার দক্ষতাও বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়াও জরুরি।

মিরপুরে জামায়াতের জয়, বিএনপির জন্য সতর্ক বার্তা
ত্রয়োদশ পার্লামেন্ট ইলেকশনে মিরপুর কেন্দ্রিক ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের জয় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ঢাকা-১৪ আসনে মীর আহমাদ বিন কাসেম, ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং ঢাকা-১৬ আসনে মো. আবদুল বাতেন জয়ী হন। রাজধানীতে জামায়াতের নির্বাচনী সাফল্যের এই বিস্তার বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। 

এই ফলাফলকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দলের উত্থান হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র সামনে আসবে না। স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কর্মীদের সম্পর্ক, প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া, নির্বাচনী প্রচারের সমন্বয়, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি— সবকিছুই পর্যালোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভিত্তি থাকা এলাকায় প্রত্যাশিত ফল না এলে তার কারণ খুজতে দলীয় নেতৃত্বের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।

মিরপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষের অভিযোগ রয়েছে। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২০২৬ সাল পর্যন্ত দারুস সালাম এলাকায় এসএ সিদ্দিক সাজুর বাবার বাড়ি স্থানীয় বিএনপির অনানুষ্ঠানিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন নির্বাচনের আগে সেখানে একাধিকবার পুলিশের অভিযান হয়েছে। অথচ নির্বাচনের সময় ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়েছে অন্য নেতাদের। এ কারণে স্থানীয় সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের জয়ও স্থানীয় নেতৃত্বের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা সামনে এনেছে। এই আসনের স্থায়ী বাসিন্দা বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কারা-নির্যাতনের কারণে এলাকায় তার পরিচিতি ছিল। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পরিচিতিকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে ঢাকা-১৬ আসনের বাসিন্দা শফিকুল ইসলামকে ঢাকা-১৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়েছিল। ফলে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে প্রার্থী মনোনয়নের দূরত্ব নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা বা পরিচিত নেতা মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত, এমন সিদ্ধান্তে পৌছানোর সুযোগ নেই। প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তি, ভোটের সমীকরণ, নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের কার্যকারিতা ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। তাই মিরপুরের ফলাফলের কারণ নির্ধারণে অভিযোগের পাশাপাশি আসন-ভিত্তিক ভোটের হিসাব ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ জরুরি।

ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুল বাতেনের কাছে বিএনপির আমিনুল হকের পরাজয়ও স্থানীয় সংগঠন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, এলাকার রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানুষের প্রত্যাশা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেয়ায় দলটি প্রত্যাশিত ফল পায়নি। নির্বাচনের পর সাংগঠনিক সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে কমিটি বিলুপ্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এই পরিস্থিতি বৃহত্তর মিরপুরে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণে আরো তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবে নির্বাচনের পর নেতৃত্বের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব একটি আসনে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। আশপাশের থানা, ওয়ার্ড ও নির্বাচনী এলাকাতেও কর্মীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা এবং সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে।

মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ জোটের হিসাবেও প্রশ্ন
রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও প্রার্থী মনোনয়ন ও জোটের সমীকরণ নিয়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে। ঢাকা-১২ আসন ঘিরে জোটের প্রার্থী দেয়ার সিদ্ধান্ত এবং বিএনপির নিজস্ব নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল ইসলাম নিরব দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বহিষ্কৃত অবস্থায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। এ ধরনের ঘটনা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দূরত্বের প্রশ্ন সামনে আনে।

প্রার্থী মনোনয়ন, জোটের হিসাব কিংবা সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে নেয়া হলেও তার বাস্তবায়ন করতে হয় মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় স্থানীয় নেতৃত্বের মতামত উপেক্ষিত হলে নির্বাচনী মাঠে তার মূল্য দিতে হতে পারে দলকেই। আবার শুধু স্থানীয় প্রভাবের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়াও যথেষ্ট নয়; প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নির্বাচনী সক্ষমতার সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।

উপেক্ষা ও কোন্দলে বাড়তে পারে রাজনৈতিক ঝুকি
রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু তা যখন ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠী-স্বার্থ কিংবা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, তখন সাংগঠনিক কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজধানীর মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকায় এর প্রভাব আরো স্পষ্ট হতে পারে।

বিএনপির নেতা-কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করে কেন্দ্র-ঘনিষ্ঠ কোনো কোনো বলয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, পরীক্ষিত নেতাদের দূরে সরিয়ে দিলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা বাড়বে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেয়া প্রয়োজন।

দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিজ্ঞ নেতাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগ তৈরি করা। কোনো গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যদের দূরে সরিয়ে রাখলে দলীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুকি বাড়বে। আবার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে স্থান দিলেও দল পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের আশঙ্কা, সংকটের সময় রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতাদের দূরে ঠেলে দিলে আন্দোলন-সংগ্রামেও দলকে মূল্য দিতে হতে পারে। তাদের ভাষ্য, কঠিন সময়ে মামলা, জেল ও নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়া কর্মীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন না হলে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা দুর্বল হতে পারে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা, অভিযোগ যাচাইয়ে নিরপেক্ষতা এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।

নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থেকেশিক্ষা নিতে হবে
ঢাকার আসনগুলোতে জয়-পরাজয় নির্ধারণে প্রার্থী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র বিষয় নয়। ভোটারদের প্রত্যাশা, স্থানীয় সমস্যা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি, ক্যাম্পেইন কৌশল, জোটের সমীকরণ এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি মিলেই নির্বাচনী ফল তৈরি করে। তাই যেসব আসনে বিএনপি প্রত্যাশিত ফল পায়নি, সেগুলোর জন্য পৃথক মূল্যায়ন জরুরি।

কোথায় প্রার্থী বাছাইয়ে দুর্বলতা ছিল, কোথায় স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় হয়নি, কোথায় ক্যম্পেইন কার্যক্রম যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না— এসব প্রশ্নের উত্তর খুজতে হবে। একই সঙ্গে ভোটারদের মনোভাব, কেন্দ্র ভিত্তিক ফলাফল এবং নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
পরাজয়ের দায় এক জন নেতা বা একটি সিদ্ধান্তের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। বরং প্রতিটি আসনের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। যেখানে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ পুনর্গঠন করতে হবে। যেখানে সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল, সেখানে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন ও কর্মী সক্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীর রাজনীতিতে জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে শহর জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলোকেও রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে আনতে হবে। যানজট, গণপরিবহন, জলাবদ্ধতা, আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সেবা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদি জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন। তরুণ ভোটার, নারী ভোটার, পেশাজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে দলের যোগাযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু পরিচিত নেতাদের ওপর নির্ভর করে পুরো রাজধানীতে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয়, জবাবদিহিমূলক এবং জনসম্পৃক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃণমূলের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা জোরদার করা এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে স্থানীয় বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানোও প্রয়োজন।

ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ একাধিক। অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সমন্বয়, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় গ্রহণযোগ্যতা, অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন এবং তৃণমূলের আস্থা ফিরিয়ে আনা; সবকিছুই দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। মিরপুরের নির্বাচনী ফলাফল সেই বাস্তবতা নতুন করে সামনে এনেছে। এই ফলকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না; নিজেদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও নেতৃত্বের কার্যকারিতাও পর্যালোচনা করতে হবে।

রাজধানীতে বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ব্যক্তি কেন্দ্রিক বলয় নয়, বরং যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সমন্বয়কে প্রাধান্য দেয়া জরুরি। পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন যেমন ঝুকিপূর্ণ, তেমনি নতুন নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করাও ক্ষতিকর। ব্যক্তিগত ইগো ও গোষ্ঠী-স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই দলটি রাজধানীতে সাংগঠনিক ভিত্তি সুসংহত করার সুযোগ পাবে। অন্যথায় নেতৃত্বের টানাপোড়েন ও সমন্বয়হীনতা প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রথম পাতা- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত