গ্রীষ্মে তীব্র তাপ প্রবাহ * তিন মাসে ইওরোপের ৮৫৪ শহরে তাপ-জনিত মৃত্যু আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১ জনের
* মৃতদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ৮৫ বছর বা তারও বেশি; রেহাই পায়নি তরুণরাও
ইওরোপের শহরগুলোতে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে তীব্র তাপ প্রবাহে আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৬১৯টি মৃত্যুর জন্য দায়ী মানব-সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রা ও মৃত্যু হারের ওপর ভিত্তি করে করা নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এই চিত্র। বিজ্ঞানীদের মতে, চলতি গ্রীষ্মে তাপ-জনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ সালের পর সর্বোচ্চ; আগের ভয়াবহ বছরগুলোর তুলনায়ও পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি প্রাণঘাতী। তথ্যসূত্র :দি গার্ডিয়ান
বৃটেনের লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিকাল মেডিসিন এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত সমীক্ষাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার হেলথ’ সাময়িকীতে। গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি গ্রীষ্মে ইওরোপের শহরগুলোতে তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সঙ্গে মানব-সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যোগ রয়েছে। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা যে অতিরিক্ত বেড়েছে, তা না হলে এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব হতে পারত বলে গবেষকদের হিসাব।
আগুন-ঝরা গ্রীষ্ম, উষ্ণ রাতেও স্বস্তি নেই
এবারের গ্রীষ্মে ইওরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপ প্রবাহের দাপট ছিল দীর্ঘস্থায়ী। দিনের প্রচণ্ড গরমে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। রাতেও তাপমাত্রা যথেষ্ট না কমায় শরীরের সেই চাপ কাটিয়ে ওঠার সুযোগ কমেছে। বিশেষ করে প্রবীণ, দীর্ঘ মেয়াদি রোগে আক্রান্ত এবং একা বসবাসকারী মানুষের জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক।
গবেষকদের হিসাবে, ১৭ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত সময়েই মোট তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটেছে। ওই সময়ে ইওরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে গড় দৈনিক তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের চেয়ে পাচ ডিগৃ সেলসিয়াসের বেশি ছিল। পশ্চিম ইওরোপে গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে প্রায় দুই দশমিক নয় ডিগৃ সেলসিয়াস বেশি ছিল; কোনো কোনো দিনে তাপমাত্রা মৌসুমি গড়কে ছাড়িয়ে গেছে প্রায় ১২ ডিগৃ সেলসিয়াস।
ইওরোপিয়ান ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি কোপার্নিকাসের তথ্যও এই ভয়াবহতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে পশ্চিম ইওরোপে তাপমাত্রা ছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ। পুরো ইওরোপের হিসাবে এটি ছিল রেকর্ডে তৃতীয় উষ্ণতম গ্রীষ্ম। মৌসুমের শেষ দিকে মহাদেশটির ৫২ শতাংশ এলাকায় মানুষ অনুভূত তাপমাত্রার হিসাবে অন্তত ‘অত্যন্ত তীব্র’ তাপ-চাপের মুখে পড়েছিল, যেখানে অনুভূত তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগৃ সেলসিয়াস বা তার বেশি।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, তাপ প্রবাহ আর কেবল আবহাওয়ার অস্বস্তি নয়; এটি জন স্বাস্থ্যের বড় সংকট। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচণ্ড গরমে শরীরের পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক এবং হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর চাপ বেড়ে যায়। আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাপমাত্রার এই বাড়তি চাপ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সংখ্যার আড়ালে অদৃশ্য মৃত্যুর গল্প
গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাপজনিত সব মৃত্যু সরাসরি মৃত্যু সনদে উঠে আসে না। কোনো ব্যক্তি স্ট্রোক, হৃদ?রোগ কিংবা ফুসফুসের ক্যানসারে মারা গেলে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে সেই রোগটির নামই নথিভুক্ত হতে পারে। অথচ মৃত্যুর আগে কয়েক দিনের অসহনীয় গরম তার শারীরিক অবস্থাকে আরো জটিল করে তুলেছিল কি না, তা অনেক সময় আলাদা করে উল্লেখ করা হয় না।
ফলে তাপ প্রবাহের প্রকৃত প্রাণঘাতী প্রভাব সরকারি মৃত্যুর পরিসংখ্যানে পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে। গবেষকরা ঐতিহাসিক তাপমাত্রা ও মৃত্যু হারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এই অদৃশ্য ক্ষতির একটি আনুমানিক হিসাব তৈরি করেছেন।
লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক ম্যালকম মিস্ত্রি বলেন, মৃত্যুর সংখ্যাটি নিজেই বিস্ময়কর; তবে আরো উদ্বেগজনক হলো, এর কত বড় অংশ মানব-সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের শুরুতে তাপ-জনিত মৃত্যুর মধ্যে মানব-সৃষ্ট উষ্ণায়নের হিস্যা ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। চলতি গ্রীষ্মে তা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশে।
তবে এই সংখ্যাগুলোকে সরাসরি মৃত্যু সনদে নথিভুক্ত মৃত্যুর গণনা হিসেবে দেখা যাবে না। গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করা তাপমাত্রা, আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য, পূর্ববর্তী মহামারি বিদ্যাগত গবেষণা এবং পরিসংখ্যান-ভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে হিসাবটি তৈরি করেছেন। ফলে এটি একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান; কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে একক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার হিসাব নয়।
সবচেয়ে বেশি বিপদে প্রবীণরা
গবেষণায় বয়স-ভিত্তিক চিত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা গেছে প্রবীণদের ক্ষেত্রে। মোট তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ঘটেছে বলে অনুমান করা হয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের অসুখ কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে ঝুকি আরো বাড়ে।
তবে বিপদ শুধু প্রবীণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষকদের হিসাবে, ৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যেও প্রায় ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৮৩৩ জনের মৃত্যুর সঙ্গে তাপ প্রবাহের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, সুস্থ-সবল কর্মক্ষম বয়সের মানুষও প্রচণ্ড গরমের ঝুকি থেকে মুক্ত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও তাপের স্বাস্থ্য ঝুকি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট। সংস্থাটির ২০২৬ সালের তথ্যপত্র অনুযায়ী, ২০০০-২০১৯ সময়ে বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে প্রায় চার লাখ ৮৯ হাজার তাপজনিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে। এর প্রায় ৪৫ শতাংশ এশিয়ায় এবং ৩৬ শতাংশ ইওরোপে। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, ২০০০-২০০৪ সময়ের তুলনায় ২০১৭-২০২১ সময়ে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের তাপ-জনিত মৃত্যু হার প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে।
এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, তাপ প্রবাহের ক্ষতি কেবল তাপমাত্রার সর্বোচ্চ রেকর্ড দিয়ে বোঝা যায় না। মানুষের বয়স, স্বাস্থ্য, বাসস্থানের ধরন, শীতল পরিবেশে থাকার সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সক্ষমতাও মৃত্যু ঝুকি নির্ধারণ করে।
নেপলসে সবচেয়ে তীব্র আঘাত
ইওরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইটালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও বৃটেন তাপ-জনিত মৃত্যুর মোট সংখ্যা ছিল বেশি। তবে জনসংখ্যার অনুপাতে মৃত্যু হারের হিসাব আলাদা চিত্র তুলে ধরে। গবেষণায় মাল্টা, ইটালি ও হাঙ্গেরিতে তাপ-জনিত মৃত্যু হার তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। আর শহর ভিত্তিক বয়স-সমন্বিত হিসাবে ইটালির নেপলস ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর শীর্ষে। সেখানে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৮১৫ জনের মৃত্যু তাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে হিসাব করা হয়েছে।
নেপলসের একটি হসপিটালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মারিও গুয়ারিনো জানিয়েছেন, তীব্র গরমের সপ্তাহগুলোতে তাদের জরুরি বিভাগে রোগী আসার সংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। তার পর্যবেক্ষণে, এবারের গ্রীষ্মে তাপের কারণে আগে থেকেই থাকা নানা রোগ আরো জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নিঃসঙ্গতা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করেছে।
গুয়ারিনোর বর্ণনায় উঠে এসেছে, এক মরণাপন্ন ক্যানসার রোগী গরমের মধ্যে চিলেকোঠার মতো উত্তপ্ত ঘরে বসবাস করছিলেন। পরিবারের লোকজন চেষ্টা করেও গ্রীষ্মের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানোর প্রতিষ্ঠান খুজে পায়নি। অন্যদিকে, স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত এক প্রবীণ ব্যক্তির দেখাশোনা করত ইউক্রেনের এক পরিচর্যাকারী। যুদ্ধের মধ্যে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দেশে ফিরে যাওয়ায় ওই ব্যক্তি এক সময় একা পড়ে যান। পরে এক রাতে তাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়; তার শ্রোণির হাড় ভেঙে গিয়েছিল, আর তিনি পাশের বাসার ভাড়াটিয়াকে ডাকার চেষ্টা করছিলেন। এই ঘটনাগুলো দেখায়, তাপ প্রবাহের ক্ষতি শুধু আবহাওয়া বা চিকিৎসার বিষয় নয়। কারো বাড়িতে শীতল থাকার ব্যবস্থা নেই, কারো পাশে সাহায্য করার মতো মানুষ নেই, আবার কারো চিকিৎসা ও পরিচর্যা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এই সামাজিক দুর্বলতাগুলোই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।
গবেষণার আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি দিক রয়েছে। একই গবেষক দলের ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮৫৪টি ইওরোপিয়ান শহরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই সময়ের গ্রীষ্মগুলোতে তাপ-জনিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা ছিল চার লাখ ৩০ হাজারের বেশি। মানব সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর অনুপাতও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। অর্থাৎ, চলতি গ্রীষ্মের ভয়াবহতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার অংশ।
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাটি এখানেই। তাপ প্রবাহের সময় তাপমাত্রা কত ডিগৃ উঠল, শুধু সেই হিসাব দিয়ে বিপদ বোঝা যাবে না। দেখতে হবে, কারা গরম থেকে বাচার সুযোগ পাচ্ছে, কারা চিকিৎসা পাচ্ছে এবং কারা একা পড়ে আছেন। ইওরোপের এবারের গ্রীষ্ম দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। কিন্তু প্রস্তুতি, সামাজিক সহায়তা ও স্বাস্থ্য সেবায় ঘাটতি থাকলে তার মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে।