সংগৃহীত ছবিগিটার হাতে একজন মানুষ একাই পুরো অর্কেস্ট্রা, এড শিরানের জাদু এটাই। পায়ের কাছে একটা লুপ পেডাল, চাপ দিলে সুর রেকর্ড হয়, তারপর সেটা ঘুরে ঘুরে বাজতে থাকে, একই বৃত্তে, একই জায়গায়। প্রতিভা মানতেই হবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের গোড়ায় নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্ব দেখল, শিরানের পেডালে নৈতিক অবস্থানও লুপ হয়। একবার রেকর্ড করে পা সরিয়ে নিলেই হলো, বাকিটা নিজে নিজে বাজতে থাকে।
৪ সেপ্টেম্বর শিরানের শোতে ওপেনিং অ্যাক্ট ম্যাকলমোর মঞ্চে দাঁড়িয়ে বললেন, গাজা থেকে পশ্চিম তীর পর্যন্ত মানুষকে যেন জানানো হয়, তাদের ভুলে যাওয়া হয়নি। "ফ্রি প্যালেস্টাইন" শব্দ দুটো তিনি বারবার উচ্চারণ করলেন। গাজায় নিহত পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রজবকে উৎসর্গ করে গাইলেন "হিন্দস হল"। পেছনের পর্দায় গাজার ধ্বংসস্তূপের ছবি।
এরপর যা হলো, সেটা একটা কল-সেন্টারের মতো। আপনি অভিযোগ নিয়ে ফোন করলেন, ওপাশ থেকে বলা হলো "আপনার কলটি গুরুত্বপূর্ণ", তারপর ট্রান্সফার হতেই থাকল—শিরান বললেন সিদ্ধান্তটা প্রমোটরের, প্রমোটর বলল ভেন্যু-মালিকদের চাপ ছিল, আর গিলেট স্টেডিয়ামের মালিক, বিলিয়নেয়ার রবার্ট ক্রাফট, নিজেই স্বীকার করলেন যে তিনি ম্যাকলমোরকে আটকেছেন, কারণ হিসেবে দেখালেন ম্যাকলমোরের নাকি বহুদিনের "অ্যান্টিসেমিটিক রেটরিক"-এর ইতিহাস আছে, আর তিনি "হেট স্পিচ"-কে মঞ্চ দিতে রাজি নন।
শিরান নিজে বললেন, তিনি সংঘাতে মর্মাহত, কিন্তু মঞ্চকে রাজনীতির কাজে লাগাতে বিশ্বাস করেন না। এটা অনেকটা ট্রাফিক সিগন্যালের মতো, যেটা হলুদেই আটকে আছে, লাল হবে না, সবুজও না, শুধু ব্লিঙ্ক করেই যাবে যতক্ষণ না কেউ নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে পার হয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন যে তাঁর নিজের গানের টাইটেলগুলোই যেন তাকে খোচা মারছে। "আইজ ক্লোজড" গাইতে গাইতে সত্যিই চোখ বন্ধ করে ফেললেন, আর "থিংকিং আউট লাউড" এর বদলে বেছে নিলেন "থিংকিং, বাট কোয়ায়েটলি, প্লিজ ডোন্ট কোট মি অন দ্যাট।"
তারপর একে একে সবাই সটকে পড়লেন। ফিনিয়াস, ডেনিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম, আইরিশ ব্যান্ড বেওগা, আর অ্যারন রো, চারজনই ইনস্টাগ্রামে ঘোষণা দিয়ে সরে গেলেন। ফিনিয়াস লিখলেন, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য শিল্পীদের কণ্ঠরোধ করা চলবে না। সুন্দর কথা। কিন্তু এই একই তালিকায় থাকা লুকাস গ্রাহাম আর অ্যারন রো-র নামই আবার কোনো এক টিকেটিং সাইটে আজকের ফিলাডেলফিয়া শোর লাইনআপে দেখা যাচ্ছে, ম্যাকলমোরের নামসহ। অর্থাৎ কেউ হয় লিস্টটা আপডেট করতে ভুলে গেছে, নয়তো এটাও লুপে আটকে আছে, রেকর্ড হয়ে গেছে, আর কেউ থামাতে পারতেছে না।
এটা অবশ্য ম্যাকলমোরের জন্য নতুন কিছু না। কদিন আগেই লাস ভেগাসের নতুন নিয়ন সিটি ফেস্টিভ্যাল থেকেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সিয়াটলের এক ফিলিস্তিনপন্থী কনসার্টে বিতর্কিত মন্তব্যের পর। দায় পড়লো আনওয়ান্টেড সিচ্যুয়েশনের উপর। রাজনীতির জগতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে ফাঁপা বাক্য। এদিকে পিংক আর বয় জর্জ সামাজিক মাধ্যমে ম্যাকলমোরের সমালোচনায় নামলেন, বললেন তিনি নাকি দর্শকদের ওপর "অ্যান্টি-ইসরায়েল প্রোপাগান্ডা" চাপিয়ে দিয়েছেন।
পিংক নিজে কিছু লিখলেন না, স্টপঅ্যান্টিসেমিটিজমের একটা পোস্ট স্টোরিতে শেয়ার করে দায় সারলেন, তারপর নিজের ভক্তদের গালাগালের মুখে জবাব দিলেন এক প্রবাদ দিয়ে, সবাইকে খুশি রাখা তো ভাঁড়ের কাজ। বয় জর্জ আরেক কাঠি ওপরে। "ফ্রি প্যালেস্টাইন" বলাটাকে বললেন রাজনৈতিক জ্ঞান ছাড়াই সাহস দেখানোর সস্তা রাস্তা, শিরানকে বললেন "মেরুদণ্ডহীন", সঙ্গে বিনা কারণে একহাত নিলেন পালোমা ফেইথকেও। এত জ্ঞান দেওয়ার একদিন পরই এক প্যারোডি অ্যাকাউন্টের ভুয়া খবরে বিশ্বাস করে বসলেন, যে শিরান নাকি ম্যাকলমোরের বদলে ইসরায়েলি গায়িকা নেটা বারজিলাইকে আনছেন, আর উত্তেজিত হয়ে তা শেয়ার করে লিখলেন, "Go 'straight for the jugular'!" যে লোক অন্যের রাজনৈতিক জ্ঞান নিয়ে লেকচার দিচ্ছিলেন, তিনিই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একটা ভুয়া হেডলাইন গিলে ফেললেন।
গত বছর শিরান নিজেকে "সাংস্কৃতিকভাবে আইরিশ" বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। এখন আয়ারল্যান্ডের অনেক শিল্পী-অভিনেতাই তাঁর সঙ্গে দূরত্ব দেখাচ্ছেন, আর আইরিশ ব্যান্ড বেওগা নিজেই তো তাঁর মঞ্চ ছেড়ে চলে গেছে। "গলওয়ে গার্ল"-এর দেশ কী চায় সেটা অবশ্য আগেই স্পষ্ট। এই আয়ারল্যান্ডই রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যে সংস্কৃতির অংশ হতে শিরান এতটা আগ্রহী। মঞ্চ থেকে ম্যাকলমোরকে সরানো গেছে, কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেলো। সেটা এখনও লুপে বাজছে, আর পেডালটা আর শিরানের পায়ের নিচে নেই।