ছবি-যাযাদি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলামের নিখোঁজের ছয় বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর সন্ধান ও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাইফুলের স্ত্রী ফাতেমা ইসলাম শিমলা বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে জীবিত অবস্থায় চাই, নয়তো তাঁর এক টুকরো হাড্ডি চাই।’
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে তিনটায় গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডের নাহার কমপ্লেক্সের সামনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাইফুলের স্ত্রী ফাতেমা ইসলাম শিমলা, মা সানোয়ারা, একমাত্র মেয়ে মাইমুনা, বড় ভাই জাকিরসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সাইফুলের মেয়ে মাইমুনা উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলে, ‘আমি আমার বাবাকে চাই। আমার বাবাকে খুঁজে বের করে দিতে সহযোগিতা করুন।’
সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. খন্দকার মারুফ হোসেন। প্রধান আলোচক ছিলেন জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. লিয়াকত আলী। সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আবুল হাশেম। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার সমিতির সমন্বয়ক ও ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা।
সাইফুলের পরিবারের দাবি, ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে দাউদকান্দি থানায় দেওয়া লিখিত আবেদনে বলা হয়েছে, ওই দিন বেলা আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় সাইফুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গে থাকা একজন সাক্ষী অবস্থান করছিলেন। এ সময় কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সেখানে এসে সাইফুলকে হাতকড়া পরিয়ে একটি কালো রঙের গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। পরিবারের অভিযোগ, ওই ব্যক্তিদের কারও হাতে পিস্তল ও ওয়াকিটকি ছিল। এরপর থেকে সাইফুলের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং তিনি আর বাড়ি ফেরেননি।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের জন্ম ১৯৮৪ সালের ৭ জুলাই। তাঁর বাবা আবু ছিদ্দিক ও মা সানোয়ারা বেগম। দাউদকান্দির গৌরীপুর এলাকার মেজবাহ উদ্দিন বাড়িতে তাঁদের পারিবারিক ঠিকানা। স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত সাইফুল ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ফাতেমা ইসলাম শিমলাকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র মেয়ে মাইমুনার জন্ম ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। বর্তমানে সে গৌরীপুর আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুলে পড়াশোনা করছে।
সাইফুল নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবার কুমিল্লা ডিবি অফিস, র্যাব-১১, ডিবি-২, দাউদকান্দি থানা এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে তাঁর সন্ধান করেছে বলে জানিয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সাইফুলের ছবি দিয়ে প্রচার চালিয়ে তাঁর সন্ধান চাওয়া হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর সন্ধান পেলে বড় ভাই মো. জাকিরকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। তবে ছয় বছরেও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সমাবেশে সাইফুলের মা সানোয়ারা বেগম, বড় ভাই মো. জাকির ও পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁর সন্ধান করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। তাঁরা সাইফুলের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উপস্থিত ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন সাইফুলকে নিখোঁজ করার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে সাইফুলের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি সাইফুলের পরিবারকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গুম-খুনের অভিযোগের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
সভাপতির বক্তব্যে আলহাজ্ব আবুল হাশেম সাইফুল নিখোঁজ হওয়ার সময়কার ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে দ্রুত তাঁর সন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধান আলোচক মো. লিয়াকত আলী এবং বিশেষ অতিথি মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা সাইফুলের সন্ধান ও পরিবারের কাছে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন দাউদকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ্ব এম.এ. লতিফ ভূঁইয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ্ব জসিম উদ্দিন আহমেদ, উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রুমান খন্দকার, মো. এনামুল হক সফর তালুকদার, যুবদল নেতা হারিস চৌধুরী, কুমিল্লা উত্তর জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আসিফ কবির, শাকিল আহমেদ চৌধুরী ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন ভূঁইয়াসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন দাউদকান্দি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আব্দুল বাছেদ।
ছয় বছর ধরে সাইফুলের সন্ধান না পাওয়ায় তাঁর পরিবার এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। স্ত্রী ফাতেমা ইসলাম শিমলা স্বামী জীবিত না মৃত, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য চান। আর মেয়ে মাইমুনার আকুতি, ‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’ পরিবারের দাবি, সাইফুল কোথায় আছেন এবং তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে-এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান করা হোক।