খুলনায় ১০ টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে অস্থির লাখ লাখ মানুষ

খুলনা ব‌্যু‌রো

সারাদেশ

একসময় পাড়া-মহল্লায় আড্ডা, মারামারি আর ছোটখাটো অপরাধেই সীমাবদ্ধ ছিল উঠতি বয়সীদের দাপট। সেই চিত্র এখন বদলে যাচ্ছে। খুন, মাদক, ছিনতাই,

2026-10-01T15:25:23+06:00
2026-10-01T15:25:23+06:00
শুক্রবার ● ২ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
খুলনায় ১০ টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে অস্থির লাখ লাখ মানুষ
খুলনা ব‌্যু‌রো
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৫ পিএম  
প্রতীকী ছবি
একসময় পাড়া-মহল্লায় আড্ডা, মারামারি আর ছোটখাটো অপরাধেই সীমাবদ্ধ ছিল উঠতি বয়সীদের দাপট। সেই চিত্র এখন বদলে যাচ্ছে। খুন, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াই পেরিয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ। কারও হাতে উঠছে ধারালো অস্ত্র, কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও ককটেল। খুলনার বিভিন্ন এলাকায় গ্রুপভিত্তিক সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও উঠতি বয়সীদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসছে।

সাম্প্রতিক একাধিক সংস্থার প্রতিবেদনে খুলনা মহানগর ও জেলায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অন্তত ৫৮টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে উঠতি বয়সীদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

সবশেষ এর ভয়ংকর নমুনা মিলেছে রূপসা সেতুর নিচে। মঙ্গলবার রাতে লবণচরা থানা পুলিশের অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি ও তিনটি ককটেলসহ তিন যুবক গ্রেপ্তার হয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য, তারা একটি অপরাধী বাহিনীর নামে নদীর ঘাট মালিকদের কাছে চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি দেখাতেন। গ্রেপ্তার তিনজনের বয়স ২৩, ২৬ ও ২৮ বছর।

ছোট গ্রুপ, বড় আতঙ্ক 

খুলনার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থার প্রতিবেদনে একাধিক অপরাধী গ্রুপের তৎপরতার কথা উঠে এসেছে। এসব গ্রুপের সঙ্গে মাদক, চাঁদাবাজি, দখল, ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। বয়সের দিক থেকেও অনেক সদস্য কিশোর থেকে শুরু করে ২০-এর কোঠার তরুণ।

অপরাধের শুরুটা অনেক সময় পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো বিরোধ দিয়ে। পরে সেই বিরোধ রূপ নেয় গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষে। আধিপত্য ধরে রাখতে যুক্ত হয় মাদক ও অস্ত্র। আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে বড় অপরাধের ক্ষেত্র—এমন চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে।

খুনের পর খুন, আতঙ্ক খুলনাজুড়ে 

প্রকাশ্য স্থানে গুলি ও হামলার ঘটনাও খুলনাবাসীর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরেজমিন প্রতিবেদনে বছরের প্রথম আট মাসে খুলনায় প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও জখমের ৫৮ টি ঘটনা ঘটেছে।

মাদকের সঙ্গে চাঁদাবাজির যোগ 

এসআরবির তথ্যে উঠে আসা ঘটনাগুলোতে মাদক ও চাঁদাবাজির সঙ্গে উঠতি বয়সীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। বটিয়াঘাটায় চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে কিশোরদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে নগরীর লবণচরা এলাকায় অস্ত্র-ককটেল উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে পুলিশ।

 তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও বিস্ফোরক দেখিয়ে দিচ্ছে অপরাধচক্রের হাতে সহিংসতার উপকরণ পৌঁছানোর ঝুঁকি কতটা গভীর।

কেন জড়াচ্ছে উঠতি বয়সীরা?

সামাজিক বাস্তবতায় কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পারিবারিক অস্থিরতা, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া, মাদকের সহজলভ্যতা, বেকারত্ব, অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সংস্কৃতি তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তবে শুধু গ্রেপ্তার ও অভিযান দিয়ে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

অপরাধে কিশোরদের ব্যবহার করছে কারা, মাদক ও অস্ত্রের উৎস কোথায়, অর্থের জোগানদাতা কারা এবং প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা—এসব প্রশ্নেরও তদন্ত প্রয়োজন।

নজরদারি ও প্রতিরোধে জোর :

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যেমন অব্যাহত রাখা দরকার, তেমনি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ।

ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে শিক্ষা ও কর্মমুখী কার্যক্রমে যুক্ত করা গেলে অপরাধী চক্রে তাদের প্রবেশের সুযোগ কমানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

কিশোরদের পেছনে কারা? :


সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া, মাদকের সহজলভ্যতা এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে এর মধ্যে আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তা ও সদস্যদের রয়েছে এক প্রকার যোগসাজশ। 

তাদের কারনে যেমন মাদকের বিস্তার ঘটছে। তেমনি তারাই একে অপরকে ঘায়েল করতে ঢাল হিসাবেও ব্যবহার করছে। এতে কেবল কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না; তাদের অপরাধে টেনে নেওয়া বড় চক্র, মাদক সরবরাহকারী, তাদের প্রশ্রয়দাতা এবং অর্থ ও অস্ত্রের উৎস শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

খুলনার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু ‘কিশোর গ্যাংয়ের দাপট’ হিসেবে দেখার সুযোগ রাখছে না।
চলতি মাসের ১ সেপ্টেম্বর অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সরকার খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটানোর নির্দেশনা দিয়েছিল। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সেই ৩০ দিনের এই কঠোর বার্তা পেয়েছিলেন খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি এবং খুলনা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার ওমর ফারুক। তবে তার কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো ঘটেনি। 

কেএমপি কমিশনারকে ভৎসনা :

সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কনফারেন্স হলে খুলনার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি, আজিজুল বারী হেলাল এমপি, আমীর এজাজ খান এমপি, কেসিসি'র প্রশাসক নজরুল ইসলাম মন্জু,  কেডিএ চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা ও খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনির উপস্থিতিতে আইনমন্ত্রী ও খুলনার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান  কেএমপি কমিশনারকে আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারনে ভৎসনা করেছেন।

 তাকে সে সময় কেএমপির কিছু সাফল্য উপস্থাপনকালে বিরত রাখেন আইনমন্ত্রী। এ সময় খুলনার ডিআইজি, পুলিশ সুপার, এসআরবির প্রতিনিধিসহ সরকারের একাধিক সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে খুলনার একাধিক হত্যা মামলার একাধিক আসামি ও হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা থেকে গ্রেপ্তার করেছে।  উদ্ধার করেছে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। 

পাশাপাশি ইতিমধ্যে কেএমপি ও জেলা পুলিশও বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলিসহ কয়েকজনকে আটক করেছে বলে পুলিশ সুত্রে জানা গেছে। 

নাগরিক সমাজের অভিযোগ :

নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব  এড. বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি  যে কোনো  সময়ের রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে। পুলিশ প্রশাসনের যতগুলো শাখা মাঠে রয়েছে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।  

তবে তিনি এসআরবি কর্তৃক হত্যাকারী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারের কাজের বেশ প্রশংসা করেছেন।  আমাদের প্রশ্ন প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে নাকি?  পেশাদারিত্বের ঘাটতি রয়েছে ?  না-কি প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। না-কি শস্যের মধ্যে ভূত রয়েছে জানি না। এখন ঘর থেকে মসজিদ পর্যন্ত কোথাও নিরাপদ নেই খুলনার সাধারণ মানুষ । যখন তখন খুনের ঘটনা ঘটছে। ঘটছে অহরহ চুরি- ছিনতাই ও চাঁদাবাজি।

 নগরীজুড়ে  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই নম্বর বিহীন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে উঠতি বয়সের কিশোর - যুবকেরা। তিনি আরও বলেন, মাদকের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করে যথাযথ ভাবে আইনের আওতায় আনতে পারলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে।  বাবুল হাওলাদার বলেন, সম্প্রতি নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ে নম্বর ও কাগজপত্র বিহীন একটি গাড়ি পুলিশ সার্জেন্ট আটকালেও  পরবর্তীতে পুলিশেরই দুই বড়  কর্মকর্তার চাপে সার্জেন্ট ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মী ও স্থানীয়রা তীব্র প্রতিবাদ করেছে। 

কিন্তু  তাতে কি হয়েছে ?  এ ভাবেই  কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের কারনে খুলনার আইনশৃঙ্খলার আজ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।  খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি ও চিহ্নিত খুনি- সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা না গেলে খুলনার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশংকা করছেন। 
প্রশ্ন উঠছে—পাড়া-মহল্লার কিশোরদের হাতে অস্ত্র-মাদক পৌঁছে দিচ্ছে কারা, চাঁদাবাজির টাকা যাচ্ছে কোথায় এবং এসব গ্রুপের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের ধরতে অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে?

কারণ, কিশোরের হাতে শুরু হওয়া দাপট যখন পিস্তল-ককটেলে পৌঁছে যায়, তখন সেটি আর শুধু কিশোর অপরাধ থাকে না। তা নগরীর আইনশৃঙ্খলার বড় সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।
  বিষয়:   খুলনা  সন্ত্রাসী  কিশোর 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত