ছবি: সংগৃহীত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা এবং অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের প্রতিনিধিরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের তফসিলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও জুলাই ঘোষণাপত্রের স্বীকৃতি এবং জুলাই যোদ্ধাদের সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি রাখার কথা জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির সঙ্গে শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় এসব দাবি উঠে আসে। বৈঠকে মোট ৬৩ জন অংশ নেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক সুরক্ষা, জুলাই অভ্যুত্থানের দায়মুক্তি এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত করার দাবি জানান। কেউ কেউ নিজেদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়েও কথা বলেন।
এ সময় জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানো, আহত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং জুলাই যোদ্ধারা যাতে আইনি হেনস্তার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।
বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অংশগ্রহণকারীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চেয়েছেন। বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্রের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেন সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় ধারণ করা হয়, সেই দাবি জানানো হয়েছে। কেউ কেউ সুনির্দিষ্টভাবে সংবিধানের প্রস্তাবনায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেছেন।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় অংশগ্রহণকারী সব দল ও শক্তি যেভাবে ঐকমত্যে পৌছেছে, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের প্রস্তাবও লিপিবদ্ধ করা হবে।
জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবির বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হয়েছে। সাংবিধানিকভাবেও এই সুরক্ষার বিষয়টি তফসিলের সুনির্দিষ্ট জায়গায় আনা হবে। এর মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও সুরক্ষার বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে ধারণ করা যাবে।
বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, বৈঠকে সবাই বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার দাবি জানিয়েছেন। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে চলছে এবং আদালত নির্ধারিত আইন অনুসারেই কাজ করবেন। তাদের সহযোগিতায় তদন্ত ও প্রসিকিউশনসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের জাতীয় ঘোষণাপত্রের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় পাঠ করা ওই ঘোষণাপত্রটি সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘ ছয়-সাত মাসের আলোচনা ও চর্চার পর প্রণীত হয়েছে। এতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলো সব রাজনৈতিক দল স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, ঘোষণাপত্রটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হলে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ অবশ্যই আসবে। তবে এটি সংবিধানের কোন জায়গায় ধারণ করা হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এ কারণে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট জায়গায়, তফসিলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও জুলাই ঘোষণাপত্রের স্বীকৃতি রাখার কথা বলা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি থাকলে জুলাই যোদ্ধারা দায়মুক্তি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা পাবেন।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সনদ বাস্তবায়নের জন্যই সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি সবার বক্তব্য শুনছে। নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সনদে স্বাক্ষর হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নে কমিটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কারা থাকবেন বা কোন পদ্ধতিতে এটি গঠিত হবে, তা জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে একটি বিল আনা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে। সামনে আইনজীবী, বিচারক, সুপ্রিম কোর্ট বার, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঐকমত্য কমিশনে যে বিষয়ে একমত হওয়া গিয়েছিল, সেখানে দুটি পদ্ধতি রয়েছে। মধ্যবর্তী আরেকটি পদ্ধতি জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রথমটি সম্ভব না হলে দ্বিতীয়টি এবং সেটিও সম্ভব না হলে তৃতীয় পদ্ধতি বিবেচনা করা হবে।
রাষ্ট্রপতির বিধানকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাখার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রক্রিয়া এখনো শেষ বা চূড়ান্ত হয়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রস্তাব আসতে পারে। সমাজের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও প্রস্তাব আসতে পারে। সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রণয়ন করতে চায় কমিটি।
রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাখার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কমিশনে এটি তাঁদের প্রস্তাব ছিল না। অতীতে এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। তাই রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানে না রাখাই ভালো বলে তাঁরা প্রস্তাব দিয়েছেন।
বৈঠকে আরও অংশ নেন কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, কমিটির সদস্য ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং সাকিলা ফারজানা।