ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকন পুষ্টি চাহিদা মেটানো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মহৎ লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া ‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ’ প্রকল্প এখন চরম অনিয়ম ও হরিলুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। উল্টো সরকারি অর্থ অপচয় আর লুটপাটের নজির গড়ে শেষ হতে চলেছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই প্রকল্প।
ঠিকাদারিতে চরম দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্য
প্রকল্পের কেনাকাটা ও বিভিন্ন কাজের ঠিকাদারি বরাদ্দেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় না রেখে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং বিনিময়ে দেদারসে চলছে কমিশন বাণিজ্য। যোগ্য ও নিয়ম মেনে আবেদন করা ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের কাজ দেওয়ায় ভেস্তে যাচ্ছে কাজের গুণগত মান বজায় রাখার সকল প্রক্রিয়া।
ভুয়া বিল-ভাউচারে কোটি টাকা আত্মসাৎ
ঠিকাদারি অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় অনিয়মিত শ্রমিক ও দৈনিকভিত্তিক মজুরি খাতের নামে বিপুল পরিমাণ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও ভুয়া বিল-ভাউচার এবং ভুয়া মাস্টাররোল বানিয়ে তা পকেটে পুরেছেন সংশ্লিষ্টরা। নথিপত্রে হাজার হাজার শ্রমিকের নাম ও কাজের বিবরণ দেখানো হলেও বাস্তবে তারা বঞ্চিত। কাগজপত্রে কাল্পনিক শ্রমিকের নামে টাকা তুলে নিয়ে বড় ধরনের হরিলুট চালানো হয়েছে, যার ফলে সাধারণ শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।
কাগজে-কলমে সাফল্য, বাস্তবে শূন্য
প্রকল্পের নথিপত্রে হাজার হাজার চাষীকে প্রশিক্ষণ এবং শত শত প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশিক্ষণের নামে ডাকা হলেও নামমাত্র ভাতা ও নিম্নমানের কিছু উপকরণ দিয়ে সিংহভাগ টাকা আত্মসাটের অভিযোগ উঠেছে। মানসম্মত মাশরুম স্পন (বীজ) ও প্রযুক্তি সরবরাহ না করায় বেশিরভাগ খামারই শুরুর কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রকল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে যায়যায়দিন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কৃষিবিদ মনির হোসেন বলেন, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পটি সারাদেশের মানুষের মাঝে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তবে যতটুকু শুনছি, প্রকল্পটি এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা জাগানিয়া প্রকল্পটিতে অনিয়ম দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা উচিত। জড়িতদের বিচারের আওতায়ও আনা উচিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও কারিগরি সহায়তার অভাব এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ। অহেতুক মিটিং-সেমিনার ও কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় বড় অঙ্কের বাজেট শেষ করা হলেও প্রান্তিক চাষী ও শ্রমিকেরা পাননি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা। ফলে একদিকে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব অপচয় হয়েছে, অন্যদিকে ভেস্তে গেছে দারিদ্র্য বিমোচনের মূল উদ্দেশ্য।
মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র হ্রাসকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকন কে যায়যায়দিন থেকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের দাবি, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি ও প্রকল্পের সার্বিক অর্থ আত্মসাতের ঘটনা খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। একই সাথে এই হরিলুটের সাথে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।