ঢালাও ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তাগিদ আইএমএফের

উমর ফারুক ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে

অর্থনীতি

বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ঋণের চাপ সামাল দিতে কর ব্যবস্থার সংস্কার, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো এবং ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে

2026-10-14T15:30:19+06:00
2026-10-14T15:36:06+06:00
বুধবার ● ১৪ অক্টোবর ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
অর্থনীতি
ঢালাও ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তাগিদ আইএমএফের
উমর ফারুক ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩০ পিএম  আপডেট: ১৪.১০.২০২৬ ৩:৩৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ঋণের চাপ সামাল দিতে কর ব্যবস্থার সংস্কার, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো এবং ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, করের আওতা বাড়ানো, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে নির্বিচারে ভর্তুকি না দিয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তি চাপ এড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী বৈঠকের তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত 'ফিসক্যাল মনিটর' বিষয়ক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব বিষয় উঠে আসে। এতে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপপরিচালক এরা দাবলা-নরিস এবং বিভাগের ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি। ব্রিফিংয়ে যোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে থিলেন পাভিস দেবাহাসাদিন।

আইএমএফের মতে, ঢালাও ভর্তুকি সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে এর সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এ কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে সবাইকে সমানভাবে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে নিম্ন আয়ের মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা কার্যকর হতে পারে।

সংস্থাটির বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিগত সুপারিশসংক্রান্ত বিশ্লেষণে কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কিছু দেশে কর প্রশাসনের উন্নয়নের মাধ্যমে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর পরামর্শ

উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় করের আওতা সম্প্রসারণ ও অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি প্রত্যাহারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে আইএমএফ। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কর প্রশাসন সহজ ও কার্যকর করা গেলে করদাতাদের ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর পরিপালন সহজ হলে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে মিসরের ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কার ও কর অব্যাহতি কমানোর উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার, জ্বালানি কর ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ এবং ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, কলম্বিয়াকে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি বেশি থাকা দেশগুলোর জন্য কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, করের আওতা বাড়ানো এবং অকার্যকর কর সুবিধা পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ভর্তুকি প্রত্যাহারে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ

জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে মরক্কোর উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, দেশটি সর্বজনীন ভর্তুকি ব্যবস্থা থেকে সরে এসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি সামাজিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে ভর্তুকি প্রত্যাহার সব ক্ষেত্রে সহজ সমাধান নয়। নাইজেরিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের পর সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ পরিশোধের বড় ব্যয় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। দেশটির রাজস্বের প্রায় ৪২ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হওয়ার বিষয়টিও আর্থিক ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইথিওপিয়াও আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় কর বৃদ্ধি ও ভর্তুকি সংস্কারের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। তবে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

জলবায়ু ঝুঁকি ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ে বাড়তি চাপ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম আর্থিক প্রস্তুতির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দিতে আর্থিক সুরক্ষাব্যবস্থা ও জরুরি তহবিল গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের পরও জ্যামাইকার আগাম অর্থনৈতিক প্রস্তুতির বিষয়টি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপের কারণে সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ সীমিত থাকলে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অর্থ জোগাতে অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং জনসেবার মতো খাতের বরাদ্দ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

বয়স্ক জনসংখ্যার চাপে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জনসংখ্যার বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। আইএমএফের বিশ্লেষণে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক কর ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমে গেলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়তে পারে, অথচ করদাতার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এ পরিস্থিতিতে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি।

ঋণ সংকট মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা

ঋণ সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তারল্য সহায়তা, ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো এবং ঋণ পুনর্গঠনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতা হিসেবে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলানোর পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। এ জন্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যয়ের দক্ষতা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
অর্থনীতি- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত