বাঁশের ভেলা নেই, নেই কর্মচাঞ্চল্য—মহেশখালীর দুই ঘাটে হারিয়ে যাচ্ছে দুই শতকের ঐতিহ্য

মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

সারাদেশ

কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাঁশের বাণিজ্য। একসময় পাহাড়ি এলাকা থেকে বাঁশবোঝাই বিশাল ভেলা

2026-10-15T17:22:29+06:00
2026-10-15T17:22:29+06:00
বৃহস্পতিবার ● ১৫ অক্টোবর ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম:
সারাদেশ
বাঁশের ভেলা নেই, নেই কর্মচাঞ্চল্য—মহেশখালীর দুই ঘাটে হারিয়ে যাচ্ছে দুই শতকের ঐতিহ্য
মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:২২ পিএম  
ছবি-যাযাদি
কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাঁশের বাণিজ্য। একসময় পাহাড়ি এলাকা থেকে বাঁশবোঝাই বিশাল ভেলা এসে ভিড়ত রশিদ মিয়ার ব্রিজ ও বরুনা ঘাটে। শ্রমিকদের হাঁকডাক, ব্যবসায়ীদের দরদাম আর বাঁশ ওঠানো-নামানোর ব্যস্ততায় মুখর থাকত ঘাট দুটি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ও প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহারে বাঁশের চাহিদা কমে যাওয়ায় সংকুচিত হয়েছে ব্যবসা। সেই সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে শতবর্ষী ঐতিহ্য, কর্মচাঞ্চল্য ও বহু মানুষের জীবিকার পুরোনো অবলম্বন।

সরেজমিনে মহেশখালীর রশিদ মিয়ার ব্রিজ ও বরুনা ঘাট ঘুরে দেখা যায়, খালের পাড়ে এখনও কোথাও কোথাও স্তূপ করে রাখা হয়েছে বাঁশ। কয়েকজন শ্রমিক বাঁশ ওঠানো-নামানোর কাজ করছেন, আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে বাঁশের বেড়া। তবে অতীতের ব্যস্ততার তুলনায় এ কর্মতৎপরতা খুবই সীমিত। একসময় যেখানে শত শত শ্রমিকের কর্মব্যস্ততা আর বাঁশবোঝাই ভেলার আনাগোনায় ঘাট দুটি সরগরম থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে অনেকটাই নিস্তব্ধতা।

ঘাটের এক প্রবীণ শ্রমিকের ভাষায়, “আগে প্রতিদিন বাঁশের কাজ থাকত। এখন ঘাটে এসে বসে থাকলেও কাজ মেলে না। সংসার চালাতে অন্য পেশার কথা ভাবতে হচ্ছে।”

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় আলীকদমসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে বর্ষা মৌসুমে নদীপথে মহেশখালীতে আনা হতো। শত শত বাঁশ একসঙ্গে বেঁধে তৈরি করা হতো বিশাল ভেলা। কয়েকজন মাঝি দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে এসব ভেলা নিয়ে আসতেন রশিদ মিয়ার ব্রিজ ও বরুনা ঘাটে। পরে সেখান থেকে মহেশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে বাঁশ সরবরাহ করা হতো। এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল পরিবহন, শ্রম ও খুচরা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

বাঁশ ছিল দ্বীপের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। ঘরবাড়ি নির্মাণ, বেড়া, মাচা, সাঁকো, মাছ ধরার ফাঁদ, ঝুড়ি, কুলা, ডালা, মই, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ঘর তৈরিসহ কৃষিকাজের নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো বাঁশ। ফলে স্থানীয় বাজারে এর চাহিদাও ছিল ব্যাপক। বাঁশের বাণিজ্য শুধু ব্যবসায়ীদের আয়ের উৎস ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শ্রমিক, মাঝি, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও।

বাঁশ ব্যবসায়ী জাফর আলম জানান, আগের মতো বাঁশের ব্যবসায় লাভ না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার পরিধিও সংকুচিত হয়েছে। এতে ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ীদের দাবি, রশিদ মিয়ার ব্রিজ ও বরুনা ঘাটের সঙ্গে প্রায় দুই শতকের বাঁশ বাণিজ্যের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘাট দুটি মহেশখালীর বাঁশ সরবরাহ ও বেচাকেনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করেছে।

কিন্তু সময় বদলেছে। ঘরবাড়ি নির্মাণ ও দৈনন্দিন কাজে প্লাস্টিক, লোহা এবং অন্যান্য আধুনিক উপকরণের ব্যবহার বেড়েছে। পাশাপাশি বাঁশের বাজার, সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একসময় যে বাঁশের বাণিজ্য ঘাট দুটিকে প্রাণবন্ত করে রাখত, সেই বাণিজ্য এখন টিকে থাকার চ্যালেঞ্জের মুখে।

রশিদ মিয়ার ব্রিজ ও বরুনা ঘাটের বর্তমান চিত্র যেন শুধু একটি ব্যবসার মন্দাবস্থার গল্প নয়; এটি মহেশখালীর পরিবর্তিত জীবনযাত্রা, হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য এবং শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। বাঁশের ভেলা আর আগের মতো না ফিরলেও এই ঐতিহ্যের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।

  বিষয়:   বাঁশের ভেলা  মহেশখালী  দুই শতক 


সারাদেশ- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত