প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৮.১০.২০২৬ ৯:২৬ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি একটি রিসর্টে আগুনের ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছে। গত শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এই আগুন লাগে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক-সংলগ্ন রিসর্টটিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌছায়। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। রিসর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ছুটির আনন্দে অবকাশ যাপনে গিয়ে একের পর এক তাজা প্রাণের ছাই হয়ে যাওয়া প্রতিটি পরিবারের সারা জীবনের জন্য ট্রমা। আরো দুঃখের ব্যাপার হলো, বিশেষত শহর অঞ্চলে একের পর এক আগুনের ঘটনার পরও এর সংখ্যা কোনোভাবেই কমছে না। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে বহু প্রশ্ন সামনে আসে।
এরই মধ্যে যেসব আগুনের ঘটনা ঘটে গেছে, সেগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফায়ার সেফটি বা এ ধরনের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে তদারকির ভয়াবহ ঘাটতি। দেশের বাণিজ্যিক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। অথচ জীবন রক্ষাকারী এসব উদ্যোগে মালিক পক্ষের অনীহা। ফলে আগুনের মতো এ ধরনের ঘটনা কি আকস্মিক ‘দুর্ঘটনা’ নাকি ‘কাঠামোগত হত্যা’ এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
প্রযুক্তি বিশ্ব এখন বেশ উন্নত। রিসর্ট, শপিংমল কিংবা গার্মেন্টস কারখানার মতো জনবহুল ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর জন্য রয়েছে উৎকৃষ্ট অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। যেমন- স্মোক ও হিট ডিটেক্টর, ফায়ার এক্সটিংগুইশারের পাশাপাশি রয়েছে স্পৃংকলার সিস্টেম, যেটা ছাদের নিচে বসানো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌছলে গ্যাস বাল্ব ভেঙে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটাতে শুরু করে। দেশের বহু সরকারি- বেসরকারি ভবনে এসব নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়নি, যদিও প্রজেক্টগুলোতে তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে।
ফায়ার সার্ভিস আইনে ছয় তলার ওপর ভবনকে বহুতল ধরা হয়। তবে ১০ তলার নিচের ভবনকে বহুতল হিসেবে বিবেচনা করে না রাজউক। এতে ১০ তলা পর্যন্ত সব ভবনের নির্মাণ প্ল্যান রাজউকের অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই। ২০২৫ সালে সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করে তিন হাজার ৯৩৮টি ভবন ‘ঝুকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর। এর মধ্যে ৬২২টি ভবন ‘অতি ঝুকিপূর্ণ’।
কক্সবাজারের কাঠের রিসর্ট, রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বহুতল শপিংমল কিংবা তৈরি পোশাক কারখানা স্থান ও পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন হলেও এসব আগুনের নেপথ্য কারণগুলো অভিন্ন। প্রাথমিক তদন্তে প্রায়ই দেখা যায়, রান্নার চুলাজনিত অবহেলা, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ওয়ারিং, শর্ট সার্কিট কিংবা গ্যাস লিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে এগুলো কেবল আগুনের উপক্রম মাত্র; আসল বিপর্যয় তৈরি করে অবকাঠামোগত নকশা ও সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম অভাব। ইনানীর মতো আধুনিক ও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে কাঠের তৈরি রিসর্টগুলোতে নান্দনিকতার দিকে যতটা নজর দেয়া হয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দিকে এর সিকিভাগও নজর দেয়া হয় না। শপিংমল ও গার্মেন্টস ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। শপিংমল ও রিসর্ট মালিকদের প্রধান লক্ষ্য থাকে স্বল্প খরচে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন।
২০২৫ সালে দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৪টি। এসব ঘটনায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে ২৬৭ জন। আনুমানিক ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই মর্মান্তিক আগুন এবং ১০টি তাজা প্রাণের ঝরে যাওয়া কি অবশেষে আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারবে, নাকি কয়েক দিন হট্টগোল হওয়ার পর সবকিছু আবার আগের মতো ধামাচাপা পড়ে যাবে? এই প্রশ্ন অসঙ্গত নয়। এ ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।