জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশ বিষয়ক কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি মানব জীবন, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব দৃশ্যমান হলেও ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, নদীনির্ভর জীবন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুকির মুখে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা, তাপ প্রবাহ, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ক্রমাগত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই কি ভবিষ্যতের বিপর্যয় সামাল দেয়া সম্ভব?
বাংলাদেশের ঝুকি কেন এত বেশি?
জাতি সংঘের হিসাব মতে, পরিবেশ রক্ষায় একটি দেশের মোট আয়তনের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে বাংলাদেশে আছে প্রায় ১৭ শতাংশ। এ ছাড়াও বাংলাদেশের জলবায়ুগত ঝুকির পেছনে রয়েছে এর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও আর্থসামাজিক বাস্তবতা। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ অসংখ্য নদ-নদীবিধৌত এই বদ্বীপ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যাপ্রবণ। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অবস্থান দেশটিকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুকিতে রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন ঘটলে এসব ঝুকি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ২০২৪ সালের ঈষরসধঃব জরংশ ঈড়ঁহঃৎু চৎড়ভরষব : ইধহমষধফবংয অনুযায়ী, দেশের নয় কোটির বেশি মানুষ মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৫৬ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের জলবায়ুগত ঝুকির উচ্চমাত্রার সংস্পর্শে বসবাস করেন। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য দূরবর্তী ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানেরই একটি বড় উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ।
দুর্যোগ মোকাবিলায় অগ্রগতি আছে তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, স্বেচ্ছাসেবক-ভিত্তিক উদ্ধার কার্যক্রম, দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচি এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বহু মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার পর মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়ার সক্ষমতাও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।
তবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি মানে শুধু ঘূর্ণিঝড়ের সময় মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নেয়া নয়। দুর্যোগের পর জীবিকা পুনরুদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সহায়তা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্রে যাতায়াতের অসুবিধা, পর্যাপ্ত পানি ও স্যানিটেশনের অভাব এবং নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বিদ্যমান অবকাঠামোর পাশাপাশি সেবার মান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।
কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকার ভবিষ্যৎ
জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায়। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা ফসল উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক, মৎস্যজীবী ও কৃষি শ্রমিকদের আয় আবহাওয়ার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হওয়ায় তারা তুলনামূলক বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।
এ পরিস্থিতিতে লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, স্বল্পমেয়াদি ফসলের সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং কৃষকদের আবহাওয়া-ভিত্তিক পরামর্শ দেয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও উপযুক্ত কৃষি বীমার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি কেবল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি রক্ষারও অন্যতম শর্ত।
উপকূলীয় সংকট ও জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন ও সুপেয় পানির সংকট মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। কোথাও কৃষি জমির উৎপাদনশীলতা কমছে, কোথাও পানীয় জলের উৎস ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। নদী ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে বহু পরিবার নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়। জলবায়ুগত চাপ যখন জীবিকার সুযোগ সংকুচিত করে, তখন অনেক মানুষ কাজ ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শহরমুখী হন।
বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০-এ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের অভ্যন্তরে প্রায় এক কোটি ৯৯ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি একটি প্রক্ষেপণ, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ সংখ্যা নয়; তবে সম্ভাব্য সংকটের ব্যাপকতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত পুনর্বাসন, উপকূলীয় বাধের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এ ঝুকি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্ল্যান আছে, এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন
বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হলো জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ঘধঃরড়হধষ অফধঢ়ঃধঃরড়হ চষধহ—ঘঅচ) ২০২৩-২০৫০। এতে পানি, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নগর উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানও পানি ব্যবস্থাপনা, ভূমি ও পরিবেশগত ঝুকি মোকাবিলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু পরিকল্পনার কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তবায়নের ওপর। প্রকল্প গ্রহণের পর অর্থের যথাযথ ব্যবহার, সময়মতো কাজ শেষ করা, স্থানীয় মানুষের মতামত গ্রহণ এবং ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোন এলাকায় কত মানুষ ঝুকিতে রয়েছে, কোথায় কি ধরনের অবকাঠামো দরকার এবং কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এসব তথ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে জলবায়ু প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে, যাতে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাজে আসে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচার
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ বৈশ্বিক গৃনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তুলনামূলকভাবে কম অবদান রাখলেও জলবায়ুর ক্ষতির ভার বহন করছে। এ বাস্তবতায় উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির সহযোগিতা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। দেশের নিজস্ব বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ, দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা জরুরি। জলবায়ু তহবিলের অর্থ যেন ঋণের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বাস্তব চাহিদা পূরণে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হোক মানুষের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার রয়েছে। প্রথমত, ঝুকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা ও দুর্যোগ প্রস্তুতি আরো শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য ও নগর অবকাঠামোকে জলবায়ু সহনশীল করে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, নদী, জলাভূমি, বন ও উপকূলীয় প্রতিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জলবায়ু শিক্ষা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং তরুণদের গবেষণা ও উদ্ভাবনে যুক্ত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি; এর মোকাবিলায় বর্তমান প্রজন্মের প্রস্তুতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি বাংলাদেশের জন্য বাস্তব ও গভীর হলেও এই সংকট মোকাবিলায় দেশটির সামনে সম্ভাবনাও রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অর্জিত অভিজ্ঞতা, স্থানীয় মানুষের অভিযোজন কৌশল, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তবে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প, কাগুজে প্ল্যান কিংবা দুর্যোগের পর সাময়িক তৎপরতা দিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি তাই শুধু কতটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে বা কতটি প্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়; বরং দেখতে হবে, ঝুকিপূর্ণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ হয়েছে, কৃষকের জীবিকা কতটা সুরক্ষিত হয়েছে এবং দুর্যোগের পর মানুষ কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে বিশ্বের সম্মিলিত উদ্যোগ যেমন জরুরি, তেমনি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক প্ল্যান, সুশাসন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন। আজকের প্রস্তুতিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কতটা নিরাপদ, সহনশীল ও বাসযোগ্য হবে।
হাফিজুর রহমান : কলাম লেখক।