অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম

এডিটোরিয়াল

# আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম নীতি মেনে বাংলাদেশকে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক ডিপ্লোম্যাসির ধারা বজায় রাখতে হবে। বন্ধুরাষ্ট্র জাপানের কাছ থেকে

2026-10-23T00:00:00+06:00
2026-10-23T17:13:56+06:00
রোববার ● ২৫ অক্টোবর ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
এডিটোরিয়াল
প্রধান মন্ত্রীর জাপান সফর
অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ
অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৩.১০.২০২৬ ৫:১৩ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান
# আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম নীতি মেনে বাংলাদেশকে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক ডিপ্লোম্যাসির ধারা বজায় রাখতে হবে। বন্ধুরাষ্ট্র জাপানের কাছ থেকে সর্বোত্তম অর্থনৈতিক ও কারিগরি সুফল আদায় করে নেয়াটাই হবে বাংলাদেশের ডিপ্লোম্যাটিক পরিপক্বতার  বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাড়িয়েছে। জাপানের প্রধান মন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান এক রাষ্ট্রীয় সফরে টোকিও যাচ্ছেন। সরকার গঠনের পর এটিই তার প্রথম উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর, যা বৈশ্বিক ডিপ্লোম্যাটিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কোচিত এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিগত পাচ দশক ধরে ঢাকা ও টোকিওর মধ্যে গড়ে ওঠা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সুদৃঢ় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঐতিহ্যগত ‘দাতা-গ্রহীতা’ (Patron-Client) সমীকরণ অতিক্রম করে আজ এক গভীর ও টেকসই কৌশলগত অংশীদারিত্বে (Strategic Partnership) উন্নীত হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতি মন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দেয়া ডিপ্লোম্যাটিক বার্তা অনুযায়ী, এই হাই-প্রোফাইল সফরের মূল রূপরেখা নির্ধারিত হয়েছে তিনটি প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করে- দ্বিপক্ষীয় ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক সুসংহত করা, কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিবিড় করা এবং বাংলাদেশের উদীয়মান উৎপাদন খাতে জাপানি বিনিয়োগের অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি ঘটানো। এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফরের পূর্বপ্রস্তুতি ও উচ্চপর্যায়ের আস্থা অর্জনের পটভূমি বেশ সুসংহত। চলতি বছরের এপৃল মাসে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জ্বালানি সংকট ও স্থায়িত্ব মোকাবিলায় জাপানের উদ্যোগে আয়োজিত শীর্ষস্থানীয় অনলাইন সম্মেলনে প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের সক্রিয় ও দৃষ্টিভঙ্গি-ভিত্তিক অংশগ্রহণ জাপানি নীতিনির্ধারক ও কৌশলবিদদের মধ্যে গভীর আস্থার সঞ্চার করেছিল। 

সেই ইতিবাচক ডিপ্লোম্যাটিক ভিত্তির ওপর দাড়িয়েই আয়োজিত হতে যাচ্ছে এই চার দিনের দ্বিপক্ষীয় সফর, যেখানে প্রধান মন্ত্রী জাপানের সম্মানিত সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা, বাণিজ্যিক প্রধান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হবেন। এই ঐতিহাসিক সফরের মধ্য দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশের শিল্প খাতের গুণগত রূপান্তর ঘটানো সম্ভব এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতাকে কিভাবে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তা রাজনৈতিক অর্থনীতির বিচারে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সার্বিক শিল্পভিত্তিকে প্রথাগত নিম্ন-মূল্যের উৎপাদন থেকে মুক্ত করে একটি আধুনিক, প্রযুক্তি-ভিত্তিক ও বহুমুখী উৎপাদন ইকোসিস্টেমে রূপান্তরিত করার জন্য জাপানি বিনিয়োগ এবং কারিগরি প্রযুক্তি হস্তান্তরের ভূমিকা অপরিসীম। এতদিন ধরে বাংলাদেশে জাপানের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা মূলত মেগা-অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন অর্থায়নে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী (High Value-Added) শিল্পে সম্প্রসারিত করার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকা উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশ সরকার তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পের মতো প্রথাগত এবং একক-পণ্য কেন্দ্রিক খাতগুলোর বাইরে গিয়ে দেশের শিল্প-ভিত্তির আধুনিকায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তি-ভিত্তিক বিশ্বায়নের যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য গ্রহণ করেছে, তা অর্জনে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধান অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। জেট্রোর প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কেবল সরাসরি পুজি বিনিয়োগের মধ্যেই জাপানি সহায়তার সুফল সীমাবদ্ধ নয়; বরং সরাসরি প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer), মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে জাপানি কম্পানিগুলো বাংলাদেশের উৎপাদন খাতকে বিশ্বমানের প্রতিযোগী করে তুলতে পারে। এটি উভয় দেশের জন্যই একটি ‘উইন-উইন’ বা পারস্পরিক কল্যাণমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির টেকসই মডেল তৈরি করবে।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক ধমনি এবং ভৌতিক অবকাঠামোর গুণগত পরিবর্তনের ইতিহাসে জাপানের প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের স্বাক্ষর অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী। যমুনা বহুমুখী সেতু, কর্ণফুলী টানেল, রাজধানী ঢাকার আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রাণ কেন্দ্রে থাকা মেট্রো রেল, গভীর সমুদ্র বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগের বাহক যমুনা রেলওয়ে সেতু এবং হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নান্দনিক ও সর্বাধুনিক তৃতীয় টার্মিনালের মতো কৌশলগত মেগা প্রকল্পগুলোতে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি দক্ষতা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নতুন আন্তর্জাতিক উচ্চতায় উন্নীত করেছে। এই মজবুত অবকাঠামোগত ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে প্রধান মন্ত্রীর আসন্ন সফরে জ্বালানি রূপান্তর, আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর পরিচালনা এবং উচ্চ-প্রযুক্তির শিল্প উৎপাদনের মতো কৌশলগত খাতগুলোতে জাপানি বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তৈরি করা সম্ভব।

এর পাশাপাশি, এই সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি অভূতপূর্ব কৌশলগত মাত্রা উন্মোচিত হতে পারে, যা হলো দক্ষ জনশক্তি রফতানি। জাপান বর্তমানে এক অভূতপূর্ব জনমিতিক সংকটের (Demographic Challenge) মুখোমুখি। দেশটির প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি নাগরিক প্রবীণ বা বয়স্ক, যা বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে প্রবীণ জনসংখ্যার সর্বোচ্চ অনুপাত। এই মারাত্মক জনমিতিক কাঠামোর কারণে জাপানের উৎপাদন শিল্প, সেবা খাত ও প্রযুক্তি অঙ্গনে তীব্র কর্মক্ষম লোকবলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ এক অনন্য জনমিতিক লভ্যাংশের (Demographic Dividend) মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রয়েছে বিপুলসংখ্যক উদ্বৃত্ত তরুণ ও প্রশিক্ষণযোগ্য মানবসম্পদ। প্রধান মন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশকে জাপানের সংকুচিত শ্রম বাজারের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য, মানসম্পন্ন ও উচ্চ-দক্ষ জনশক্তি সরবরাহের উৎস হিসেবে তুলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এটি বাংলাদেশের রেমিটান্স প্রবাহকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবে। তবে এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবসম্মত জাতীয় অর্জনে রূপান্তর করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো এবং ব্যবসায়িক পরিবেশে গুণগত সংস্কার আনা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উচ্চ পর্যায়ের ডিপ্লোম্যাটিক প্রতিশ্রুতি বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর তখনই বাস্তবে দৃশ্যমান শিল্প উৎপাদন বা রাজস্ব প্রবাহে পরিণত হয়, যখন দেশের অভ্যন্তরে সুশাসন-ভিত্তিক, স্বচ্ছ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং ভূ-অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের (এফডিআই) গতি বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালনগত কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

জেট্রোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকা অত্যন্ত সময়োপযোগীভাবে তুলে ধরেছেন যে, জাপানের বহু সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে এখনো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশ, কর কাঠামো এবং প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ও ইতিবাচক ধারণার ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে, যেসব জাপানি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, তারা দৈনন্দিন পরিচালনগত জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক ধীরগতির মুখোমুখি হচ্ছে। 

জেট্রো প্রতিনিধির স্পষ্ট বার্তা অনুযায়ী, নতুন জাপানি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার সর্বপ্রধান ও বাধ্যবাধকতামূলক পূর্বশর্ত হলো- বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বস্ততার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান উদ্বেগ ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলোর দ্রুত ও দৃশ্যমান সমাধান করা। কারণ, ইতিপূর্বে মূলধন বিনিয়োগকারী বিদ্যমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের পরিধি সম্প্রসারণ করতে পারবে, কেবল তখনই নতুন বিনিয়োগকারীদের মনে বাংলাদেশের প্রতি আস্থার পারদ উচ্চ মাত্রায় পৌছাবে।

অতএব, অর্থনৈতিক ডিপ্লোম্যাসির সুফল ঘরে তুলতে হলে দেশের ভেতরে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নিরসন, প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থায়িত্ব প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে থেকে ব্যবসায়িক বাধাগুলো দূর করে ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দৃশ্যমানভাবে উন্নত করতে হবে। 

প্রধান মন্ত্রীর সফর থেকে যেসব বিনিয়োগ প্রস্তাব বা সমঝোতা স্মারক আসবে, সেগুলোকে ফাইলবন্দি না রেখে কার্যকর ও উৎপাদনশীল শিল্প প্রকল্পে রূপান্তর করার জন্য একটি শক্তিশালী আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সেল গঠন করা দরকার। তবে সার্বিক অর্থনৈতিক অর্জনের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার স্পর্শকাতর সমীকরণগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির জটিল মানচিত্রে পূর্ব এশিয়ার দুই প্রধান পরাশক্তি- চায়না এবং জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক, আঞ্চলিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোগত এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ডিপ্লোম্যাটিক শীতলতা রয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে অবশ্যই অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ, নিরপেক্ষ, ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে অবিচল থেকে বৈদেশিক নীতি পরিচালনা করতে হবে।

দুই পরাশক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রভাবের বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা সহজতর হয়। অর্জিত তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতি, যার মোট জিডিপি প্রায় ৪.৩৮ টৃলিয়ন ইউএস ডলার এবং সামগ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৬.৩ থেকে ৬.৭ টৃলিয়ন ডলারের মধ্যে। 

অন্যদিকে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী চায়নার অবস্থান বিশ্বের ২য় বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে, যার অর্থনীতির আকার প্রায় ২০.৮৫ টৃলিয়ন (২০.৮৫ লাখ কোটি) ইউএস ডলার এবং ক্রয় ক্ষমতা সমতার (PPP) বিচারে যা বিপুল ৪৪.২৯ টৃলিয়ন (৪৪.২৯ লাখ কোটি) ইউএস ডলার নিয়ে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। অর্থনৈতিক শক্তির এই বিশাল পরিসংখ্যানগত ব্যবধান পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, বিশ্ব অর্থনীতি এবং এশীয় অঞ্চলের ভূ-অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে চায়না অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখছে।

রাজনৈতিক অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকদের মতে, চায়নার প্রত্যক্ষ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় প্রস্তাবিত ও বাস্তবায়নাধীন ‘চায়না-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে দেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে দেয়ার সক্ষমতা রাখে। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য সংযোগের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে, যা দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

টোকিও সফরের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলকে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন দ্বিপক্ষীয় সব আলোচনা, চুক্তি ও এজেন্ডা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সার্বিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা প্রধান কৌশলগত উন্নয়ন সহযোগীকে ক্ষুব্ধ করতে পারে- এমন কোনো সংবেদনশীল আলোচনা থেকে বাংলাদেশকে পুরোপুরি দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এই ধরনের সুষম, সচেতন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ডিপ্লোম্যাসিই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার প্রধান চাবিকাঠি। 

প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চার দিনের জাপান সফর বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় ডিপ্লোম্যাটিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির সম্পর্কে এক নতুন সোনালি দিগন্তের সূচনা করার অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে। বিগত পাচ দশকের প্রথাগত দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে উভয় দেশ এখন এক উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী, আধুনিক প্রযুক্তি-ভিত্তিক ও কৌশলগত শিল্প অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এই ঐতিহাসিক সফরের পূর্ণাঙ্গ সুফল ঘরে তোলার জন্য বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত দ্বিমুখী- প্রথমত, জাপানি বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির নিরবচ্ছিন্ন হস্তান্তর এবং প্রবীণ জাপানি সমাজে দক্ষ জনশক্তি রফতানির বিশাল সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে দেশের উৎপাদন খাতকে বিশ্বমানের করে তোলা। দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে এবং বিদ্যমান জাপানি বিনিয়োগকারীদের পরিচালনগত বাধা নিরসন করে অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কার সাধন করা।

একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম নীতি মেনে বাংলাদেশকে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক ডিপ্লোম্যাসির ধারা বজায় রাখতে হবে। বন্ধুরাষ্ট্র জাপানের কাছ থেকে সর্বোত্তম অর্থনৈতিক ও কারিগরি সুফল আদায় করে নেয়াটাই হবে বাংলাদেশের ডিপ্লোম্যাটিক পরিপক্বতার  বহিঃপ্রকাশ।
 সুদূরপ্রসারী ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পররাষ্ট্র নীতি এবং অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সুষম সমন্বয় ঘটাতে পারলে প্রধান মন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০২৬ পরবর্তী টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম : চেয়ারম্যান, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

এডিটোরিয়াল- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত