ছায়া যুদ্ধের এই লড়াইয়ে ইরান বিশ্বকে এই বার্তাটিই পুনর্বার স্পষ্ট করে দিল— তেহরানকে পাশ কাটিয়ে বা হুমকি দিয়ে মিডল ইস্টে কোনো শান্তি বা স্থায়িত্ব সম্ভব নয়।
মিডল ইস্টে অগ্নিগর্ভ পরিবেশে ইরান আরো একবার ছায়া যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে নিজ সীমানার বাইরে টেনে নিয়ে নিজের দেশের অভ্যন্তর থেকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞকে দূরে সরিয়ে রাখতে সফল হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ইয়েমেনের হুথি এবং সউদি আরবের মধ্যে লড়াই আপাতত ইরানের নিজ সীমানায় আমেরিকা-ইসরেলি অক্ষের সরাসরি আগ্রাসনকে দূরে সরিয়ে রাখবে। তেহরানের কৌশলী রাজনীতিককরা মিডল ইস্টের জটিল ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় পুরনো চালটাই আবার নতুন করে দিয়েছে। আর তাতেই প্রতিপক্ষ বেশামাল হয়ে পড়েছে। পাল্টা চাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজ প্রশাসন এবং মিডল ইস্টে তার আঞ্চলিক মিত্ররা।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবা খেলায় ইরান বরাবরই এমন এক খেলোয়াড়, যে নিজের সীমানায় যুদ্ধ ডেকে না এনে দূরবর্তী দাবার চালে শত্রুকে পর্যুদস্ত করতে পটু। আমেরিকার ইরান আগ্রাসন ও ইরানের পাল্টা প্রতিরোধে মিডল ইস্টে যে যুদ্ধের উত্তাপ দীর্ঘদিন ধরে জমছিল, তা আজ আর দুই পরাশক্তির প্রত্যক্ষ গোলাবর্ষণে সীমাবদ্ধ নেই। ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র সউদি আরবের মধ্যকার সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী লড়াই তারই স্পষ্ট প্রমাণ। আপাতদৃষ্টিতে একে আঞ্চলিক সংঘাত মনে হলেও, মূলত এটি ইরানের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা ‘প্রক্সি’ বা ছায়া যুদ্ধ নীতিরই এক নিখুত ও কৌশলগত বাস্তবায়ন।
নিজের জাতীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ইরান বহু বছর ধরে যে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ গড়ে তুলেছে, তা আজ তেহরানের জন্য এক শক্তিশালী বর্ম হিসেবে কাজ করছে। ইরান খুব ভালো করেই জানে, আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ মানে নিজের ভূখণ্ডে ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনা। তাই নিজেদের সরাসরি সংঘাত থেকে দূরে রেখে ইয়েমেন, লেবানন কিংবা ইরাকের আঞ্চলিক মিত্রদের দিয়ে শত্রুকে ব্যস্ত রাখাই তেহরানের প্রধান কৌশল।
ইয়েমেন-সউদি যুদ্ধের বর্তমান গতিপথ : লোহিত সাগরে হুথিদের ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সউদি ভূখণ্ডে কৌশলগত আঘাত এখন ওয়াশিংটন-রিয়াদের প্রতিরক্ষা হিসাব নিকাশ উল্টে দিয়েছে। আমেরিকা কোটি কোটি ডলারের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করেও হুথিদের সস্তা কিন্তু নিখুত ড্রোন হামলা থামাতে হিমশিম খাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, অতি-আধুনিক পশ্চিমা সামরিক শক্তিও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের কাছে কতটা অসহায়। সউদি আরব এত দিন আমেরিকার নিরাপত্তা বলয়ের ওপর ভরসা করে ছিল, কিন্তু আজ হুথিদের নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা রিয়াদকে চরম নিরাপত্তার ঝুকিতে ফেলে দিয়েছে।
বাব-এল-মান্দেব এবং বিশ্ব অর্থনীতি : ইরানের কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে ‘বাব-এল-মান্দেব’ প্রণালিতে। লোহিত সাগরের এই সরু জলপথ বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম মূল ধমনী। ইরানপন্থি হুথিরা এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত নিজেদের হাতে নিয়ে পশ্চিমা ও ইসরেল সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলে যে বাধা সৃষ্টি করেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকে কাপিয়ে দিয়েছে। একের পর এক আন্তর্জাতিক শিপিং কম্পানি তাদের পথ পরিবর্তন করে পুরো আফৃকা ঘুরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ ও মূল্যে। জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা পশ্চিমা বিশ্বে মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন যৌথ নৌ বাহিনী পাহারা দিয়েও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করেও কিভাবে শত্রুর অর্থনৈতিক ভিত নাড়িয়ে দেয়া যায়, ইরানের মিত্ররা তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিচ্ছে।
উভয় সংকটে আমেরিকা ও মিত্ররা : আমেরিকা ও তার মিত্ররা এখন এক চরম উভয়সংকটে। তারা যদি ইয়েমেনে বড় ধরনের সরাসরি সামরিক অভিযান চালায়, তবে তা পুরো মিডল ইস্টকে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দাবানলে পুড়িয়ে মারবে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য চরম আত্মঘাতী। অন্যদিকে, সউদি আরব এরই মধ্যেই উপলব্ধি করতে পারছে যে, আমেরিকার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস তাদের নিজস্ব তেল অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক রূপকল্পের (ভিশন ২০৩০) জন্য কতটা বিপজ্জনক। ফলে রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অন্য দিকে তেহরানের মিত্ররা- ইয়েমেনে হুথি, লেবাননে হিজবুল্লাহ ইরাকের হাশদ আল-শাব এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং এক সুসংগঠিত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক। ইরান তাদের আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছে, যারা নিজ নিজ অঞ্চলে সার্বভৌম শক্তির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তারা সব ফ্রন্টেই ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। যার ফল পাচ্ছে ইরানও।
যেমন, ইয়েমেনে চলমান সংঘাত শুরুর পর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের পর ইরানে আমেরিকা আর কোনো বোমাবর্ষণ করেনি। অক্টোবরের শুরুতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন ইরানে আপাতত আর বড় কোনো অভিযান চালাবে না আমেরিকা। এর ফলে এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে- যুদ্ধের দামামা এখন পারস্য উপসাগর থেকে খানিকটা সরে আরবের মরুভূমিতে ঝংকার তুলছে। আর ইরান এখনো দূর থেকে বসেও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় খেলোয়াড়ই রয়ে গেছে। ছায়া যুদ্ধের এই লড়াইয়ে ইরান বিশ্বকে এই বার্তাটিই পুনর্বার স্পষ্ট করে দিল— তেহরানকে পাশ কাটিয়ে বা হুমকি দিয়ে মিডল ইস্টে কোনো শান্তি বা স্থায়িত্ব সম্ভব নয়।
আল ইমরান :লেখক, প্রভাষক