প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ২০.১০.২০২৬ ৯:২৩ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
রাশিয়ান যুদ্ধে গিয়ে কুমিল্লার চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার সাগর নিহত হয়েছেন। নিহত সাগরের বাবা কবির হোসেন জানান, আমার পাচ সন্তানের মধ্যে সাগর সবার ছোট। সে চান্দিনার একটি রড-সিমেন্ট দোকানে ভ্যানে করে মালামাল আনা-নেয়ার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি রাশিয়া যাবে বলে বায়না ধরে। প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচে রাশিয়া যায় সাগর। সেখানে গিয়ে একটি বেকারিতে চাকরি নেয়। পরে সেখানে কোনো এক দালালের খপ্পরে পড়ে সাগর। সেই দালাল সাগরকে ৩০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ান সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে বলে।
বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারি চক্র স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের নির্মাণাধীন প্রজেক্টে চাকরির প্রলোভন দেখি রাশিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে যাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের যুদ্ধের জন্য কোনো শারীরিক প্রশিক্ষণ বা কৌশলগত প্রস্তুতি ছিল না।
ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠানো ৩০ জন বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। মাত্র দুই জন দেশে ফিরতে পেরেছে, ছয় জন এখনো যুদ্ধ ক্ষেত্রে রয়েছে এবং দুই জন মস্কোর একটি হসপিটালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে ভালো চাকরির আশায় তারা রাশিয়ায় গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌছানোর পর তাদের চাকরি না দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠানো হয়। ২১ দিনের সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে নামানো হয়েছিল। একটি মানব পাচার চক্র এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় চক্রটির মূল হোতা মিজানসহ দুই জনকে আটক করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (এসআরবি)। এসআরবি বলছে, ভুক্তভোগীরা রাশিয়ায় পৌছানোর পর তাদের জোর করে রুশ সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখ সারিতে পাঠানো হতো। মূলত প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে যুদ্ধের ময়দানে শিকার হিসেবে পাঠানো হতো তাদের। এরপর তাদের ওপর প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা করলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্তের জন্যই তাদের শিকার হিসেবে পাঠানো হতো।
গ্রেফতারকৃতরা হলো— মিজানুর রহমান (৫৫) ও মো. আবু তাহের লেন্টু (৫০)। গ্রেফতারকৃত আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ভুক্তভোগী রাজন হোসেনকে (২১) কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজের কথা বলে আট লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময় রাশিয়ায় পাঠায়। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌছানোর পর জোর করে রুশ সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাকেসহ বাংলাদেশি ৩০ জনকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখ সারিতে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। চার দিন কষ্ট করে হসপিটালে পৌছে চিকিৎসা নেন রাজন। এক পর্যায়ে আহত অবস্থায় তিনি পালিয়ে এমবাসির সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন।
রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের লোকজন একইভাবে যুক্ত হয়েছে। আর বাংলাদেশ থেকে, বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং গাজীপুর থেকেও গেছে। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিল। এখন তাদের পরিবারের অনেকে স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ দেখার বা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছে না।
আমরা মনে করি, বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেন ও যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।