হাইবৃডে কমেছে স্বাদ

নজরুল মৃধা

এডিটোরিয়াল

হাইবৃড ফসল অতিরিক্ত পানি খায়। তাই এর স্বাদ অন্য জাতের চেয়ে কিছুটা কম। হাইবৃড ফসলের কিছু ক্ষতিকর দিক বা নেতিবাচক

2026-10-26T00:00:00+06:00
2026-10-25T21:07:22+06:00
রোববার ● ২৫ অক্টোবর ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
এডিটোরিয়াল
হাইবৃডে কমেছে স্বাদ
নজরুল মৃধা
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৫.১০.২০২৬ ৯:০৭ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
নজরুল মৃধা
হাইবৃড ফসল অতিরিক্ত পানি খায়। তাই এর স্বাদ অন্য জাতের চেয়ে কিছুটা কম। হাইবৃড ফসলের কিছু ক্ষতিকর দিক বা নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যা পরিবেশ, কৃষক ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলে

গত ১০ বছরে সবজি চাষ পাচগুণ  বেড়েছে। এর প্রায় সবটাই হাইবৃড জাতীয় শাক-সবজি। হাইবৃডের দাপটে দেশি বীজের সবজি ও ফসল প্রায় বিলুপ্তির পথে।  হাইবৃড জাতীয় বীজে চাষ, অসময়ে চাষ, অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ব্যবহার, জমির জৈব পদার্থের অভাবসহ নানা কারণে শাক-সবজির স্বাদ কমে যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ গ্রাম সবজি খাওয়া হচ্ছে আদর্শ পরিমাণ, সেখানে এক জন মানুষ খাচ্ছেন ২০২ গ্রাম। জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ পাচ শতাংশ থাকার কথা থাকলে জৈব পদার্থ রয়েছে গড়ে দুই শতাংশের নিচে। জমিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়াসহ নানান কারণে  ফসলের স্বাদ কমে গেছে। হাইবৃড জাতীয় শাক-সবজির কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে দেশি শাক-সবজি। শাক-সবজি হলো খনিজ পদার্থের একটি ভালো উৎস। বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ভিটামিন-এ এবং সি পাওয়া যায় সবজি থেকে। প্রায় সব সবজিই ডায়েটারি ফাইবার এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাই অল্প জমিতে বেশি আবাদ করার প্রবণতা বাড়ছে। হাইবৃড জাতের শাক-সবজি চাষ যেমন বেড়েছে সেই সঙ্গে সার ও কীটনাশক বেশি করে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে কৃষকদের মাঝে। এ ছাড়া সারা বছরই সবজি চাষ হচ্ছে। শীতকালে যে সবজি চাষ হওয়ার কথা তা শীতের আগেই চাষ হচ্ছে।  গ্রীষ্মে যে সবজি চাষ হওয়ার কথা সেটিও আগাম চাষ হচ্ছে।  ফলে স্বাদ কমে যাচ্ছে। সবজি চাষের ফলে কৃষকদের সংসারে স্বাচ্ছল্য এসেছে। বেশি লাভ ও বেশি আবাদের আশায়, তারা নিয়ম না মেনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত হাইবৃড বীজ, কীটনাশক ও সার ব্যবহার করছে।

 কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সবজি, ধান চাষে উদ্বৃত্ত থাকলে উত্তর অঞ্চলের মানুষ সবজি ও ফল  প্রয়োজনের তুলনায় কম খাচ্ছেন। এটি কিছুটা অভ্যাসগত কারণ এবং কিছুটা অর্থনৈতিক কারণে হচ্ছে বলে এমনটা মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। স্বাদ পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র না থাকলে খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ রয়েছে। এটি স্থান-কাল ভেদে কম-বেশিও হয়। স্বাদ হলো মুখগহ্বরে স্থাপিত কোনো পদার্থের (মূলত খাদ্যের) সেই উপলব্ধ ধর্ম, যা দ্বারা পদার্থটিকে অম্ল (টক), মিষ্টি, লবণাক্ত (নোনতা), তিক্ত (তিতা বা তেতো), ইত্যাদি বিশেষণে  বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে ক্ষমতাবলে স্বাদ অনুভূত বা উপলব্ধ হয়, তাকে স্বাদেন্দ্রিয় বা স্বাদ উপলব্ধির ক্ষমতা বলে। যে অঙ্গটি স্বাদ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত, তাকে স্বাদগ্রাহক অঙ্গ বা রাসনাঙ্গ বলা হয়ে থাকে। মানুষের ক্ষেত্রে জিহ্বা প্রধান স্বাদগ্রাহক অঙ্গ বা যন্ত্র। যে জটিল প্রক্রিয়ায় মুখগহ্বর থেকে স্বাদের স্নায়ুবিক সংকেতগুলো মস্তিষ্কে গিয়ে স্বাদের উপলব্ধি হয়, তাকে আস্বাদন বা স্বাদ প্রত্যক্ষণ বলে। যখন কোনো পদার্থ মুখগহ্বরে, মূলত জিহ্বার উপরিতলে অবস্থিত স্বাদকোরকগুলোর স্বাদগ্রাহক কোষগুলোর সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে, তখন সেগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে মস্তিষ্কে বা মনে স্বাদ উপলব্ধি হয়।

স্বাদ কোনো খাদ্য বা পদার্থের স্বাদ ও গন্ধের মিশ্র অনুভূতির একটি অংশ হিসেবে অনুভূত হয়। স্বাদ সংবেদন, ঘ্রাণ সংবেদন ও ত্রিজ স্নায়ুর উদ্দীপন এই তিনটি মিলে খাদ্য ও অন্যান্য পদার্থের সামগ্রিক স্বাদগন্ধ নির্ধারিত হয়। মানুষের জিহ্বা, উপজিহ্বা (আলজিহ্বা) ও অন্যান্য অংশেও স্বাদকোরক ও অন্যান্য ধরনের স্বাদ সংবেদী কোষ থাকে। স্বাদেন্দ্রিয় বা স্বাদ সংক্রান্ত তন্ত্রটি অসংখ্য স্বাদগ্রাহক কোষ  নিয়ে গঠিত। যেগুলো স্বাদকোরক নামক কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করে। মানুষের জিহ্বাতে দুই হাজার থেকে পাচ হাজার স্বাদকোরক  রয়েছে। যা সমস্ত স্বাদকোরকের তিন-চতুর্থাংশ। এ ছাড়া মুখ গহ্বরের তালু, পার্শ্ব ও পশ্চাৎ অংশে এবং গলার ভেতরে স্বরযন্ত্র, গলবিল ও অন্ননালীর ওপরের প্রান্তেও কিছু স্বাদকোরক থাকে। জিহ্বার স্বাদকোরকগুলো আবার জিহ্বাপিড়কা নামক কাঠামোর ভেতরে অবস্থান করে।  জিহ্বাপিড়কাগুলো খালি চোখে দৃশ্যমান ও জিহ্বাকে আচ্ছাদনকারী বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র বৃন্তসদৃশ কাঠামো। চার ধরনের জিহ্বাপিড়কা আছে, এগুলো হলো জিহ্বার সমুখ দুই-তৃতীয়াংশে অবস্থিত দুইশ থেকে তিনশ ছত্রাকার পিড়কা জিহ্বার পশ্চাৎভাগে দুই পাশে ২০টি ভাজবিশিষ্ট ২টি পর্ণাকার পিড়কা এবং জিহ্বার পশ্চাৎভাগে মাঝামাঝি নয়টি বলয়িত পিড়কা  ছত্রাকার পিড়কাগুলোর প্রতিটির অগ্রপৃষ্ঠে তিন থেকে পাচটি করে স্বাদকোরক থাকে। প্রতিটি পর্ণাকার পিড়কাতে ৬০০টি স্বাদকোরক থাকে। অন্যদিকে প্রতিটি বলয়িত পিড়কাতে ২৫০টি স্বাদকোরক থাকে। প্রতিটি স্বাদকোরক প্রায় ৫০ মিলিমিটার প্রশস্ত এবং প্রতিটিতে ৩০ থেকে ১০০টি স্বাদগ্রাহক কোষ ও কিছু ভিত্তিকোষ থাকে। মুখগহ্বরের স্বাদগ্রাহক কোষগুলো পাচ ধরনের স্বাদের প্রতি সাড়া দেয়। এগুলো হলো মিষ্টতা, অম্লতা, লবণাক্ততা, তিক্ততা ও মাংসলতা। এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। এই পাচ ধরনের স্বাদের অস্তিত্ব আছে এবং এগুলো একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র। 

স্বাদতন্ত্রটি একই সঙ্গে ক্ষতিকর ও উপকারী পদার্থের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে থাকে।  তাই সব মৌলিক স্বাদ-প্রকারগুলোকে হয় অনীহামূলক কিংবা রুচিবর্ধক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যা মানবদেহের ওপরে এগুলোর প্রভাবের ওপর নির্ভর করে।

এবার আসি হাইবৃড প্রসঙ্গে, হাইবৃড ফসল অতিরিক্ত পানি খায়। তাই এর স্বাদ অন্য জাতের চেয়ে কিছুটা কম। হাইবৃড ফসলের কিছু ক্ষতিকর দিক বা নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যা পরিবেশ, কৃষক ও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলে। হাইবৃড ফসল থেকে উৎপাদিত বীজ (পরবর্তী প্রজন্ম) দিয়ে ভালো ফলন পাওয়া যায় না। কৃষকরা হাইবৃডের বীজ করতে পারে না।  ফলে কৃষকদের প্রতি মৌসুমেই নতুন করে চড়া দামে বীজ কিনে জমিতে বপন করে। এতে একটি গোষ্ঠী লাভবান হলেও কৃষকরা বীজের কাছে জিম্মি।  এই ফসলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও সেচের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বেশি হয়। হাইবৃড অনেক সময়  পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে।  বহুজাতিক ও বাণিজ্যিক হাইবৃড বীজের আগ্রাসনে স্থানীয় ও দেশীয় ফসলের ঐতিহ্যবাহী জাতগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। 

একই ধরনের হাইবৃড ফসল ব্যাপকভাবে চাষ করার ফলে মাটির এবং প্রকৃতির জিনগত বৈচিত্র্য বা জিন ডাইভারসিটি কমে যাচ্ছে। হাইবৃড জাতগুলো সাধারণত অনেক বেশি মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক-নির্ভর হয়, যা মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করে। অনেক সময় প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বা দেশীয় ফসলের তুলনায় হাইবৃড ফসলের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণ কিছুটা কম হয়ে থাকে। কৃষিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে হাইবৃড জাতীয় ফসলের চাষ কমেছে পাচ শতাংশ। হাইবৃড জাতীয় খাবারের স্বাস্থ্য ঝুকি রয়েছে কি না এ নিয়ে নানা মত রয়েছে। যত মত থাকুক না কেন হাইবৃডে স্বাদ কমেছে এটা অনেক কৃষিবিদ অকপটে স্বীকার করেছেন।

নজরুল মৃধা : কবি ও সাংবাদিক 
এডিটোরিয়াল- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত