বিবেকের সংকট : আমাদের দায়বদ্ধতা

কাজী জিয়া উদ্দিন

এডিটোরিয়াল

জাতির প্রকৃত সংকট কেবল অর্থের অভাব নয়, বিবেকের অভাব; কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, অন্যায়ের সঙ্গে সামাজিক আপস। আর প্রকৃত উত্তরণ

2026-10-26T00:00:00+06:00
2026-10-25T21:05:54+06:00
রোববার ● ২৫ অক্টোবর ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
এডিটোরিয়াল
বিবেকের সংকট : আমাদের দায়বদ্ধতা
কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ২৫.১০.২০২৬ ৯:০৫ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
কাজী জিয়া উদ্দিন
জাতির প্রকৃত সংকট কেবল অর্থের অভাব  নয়, বিবেকের অভাব; কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, অন্যায়ের সঙ্গে সামাজিক আপস। আর প্রকৃত উত্তরণ কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নয়- মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সততার প্রতিষ্ঠায়। 

একটি ডিজে পার্টি নিছক বিনোদনের আয়োজন হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আচরণ যখন পেশাগত মর্যাদা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মূল্যবোধের প্রশ্ন সামনে আনে, তখন তা বৃহত্তর আত্মসমালোচনার উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এক জন কর্মকর্তার বাসায় ডিজে পার্টির ঘটনাকে ঘিরে সেই প্রশ্নই প্রাসঙ্গিক- আমরা কি ক্রমশ এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে কি করা যায়, সেটিই মুখ্য; কিন্তু কি করা উচিত, সেই বিবেকবোধ ক্রমেই গৌণ হয়ে পড়ছে? অবশ্যই, কোনো ব্যক্তিকে বিচার করতে হবে ঘটনার প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে; কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আমাদের রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীর সদ্য সাবেক বিভাগীয় কমিশনারকে ঘিরে প্রটোকল-সংক্রান্ত ঘটনাটিও একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০ অক্টোবর ২০২৬ প্রধান মন্ত্রীকে বিদায় জানানোর সময় তার আচরণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং পর দিন তাকে পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পেশাগত সংযম, শিষ্টাচার ও আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে আলোচনা করাই অধিক জরুরি।

প্রটোকল কেবল আনুষ্ঠানিকতার বিধান নয়; এর সঙ্গে দায়িত্ববোধ, পেশাগত শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা জড়িত। এক জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যখন রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সীমারেখা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন, তখন তা ব্যক্তিগত আচরণের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রশাসনিক সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তবে এই একটি ঘটনা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামগ্রিক মানসিকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া যায় না। বরং বৃহত্তর প্রশ্নটি হলো-আমাদের দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিদের মধ্যে পেশাগত মর্যাদা, আত্মসংযম ও নৈতিক স্বাধীনতার চর্চা কতটা শক্তিশালী? পদমর্যাদা অর্জন আর দায়িত্বশীল মানসিকতা অর্জন যে এক বিষয় নয়, এ ধরনের ঘটনা আমাদের তা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

সমস্যাটি কোনো একটি পেশা বা প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির ঘাটতির অভিযোগ আমাদের এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাড় করায়, যেখানে অনৈতিকতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে। অন্যায় দেখে আমরা প্রথমে বিস্মিত হই, পরে নীরব থাকি, এক সময় মানিয়ে নিই; শেষ পর্যন্ত কখনো কখনো তার সুবিধাভোগীও হয়ে উঠি। এভাবেই বিবেকের অবক্ষয় ব্যক্তিগত দুর্বলতা পেরিয়ে সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেয়।

এই অবক্ষয়ের অন্যতম অনুঘটক চাটুকারিতা ও আত্মস্বার্থমগ্নতা। যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতাবানের সন্তুষ্টি, নীতির চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা এবং সত্যের চেয়ে মনোরঞ্জন যখন প্রাধান্য পায়, তখন প্রতিষ্ঠান তার নৈতিক শক্তি হারাতে শুরু করে। অধস্তন কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতনের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ না করে বাহবা দেন; সহকর্মী অন্যায় দেখেও নিজের স্বার্থে নীরব থাকেন; আর নেতৃত্ব সত্যনিষ্ঠ পরামর্শের বদলে প্রশংসা বাক্যে সন্তুষ্ট হয়। এই সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মানও নষ্ট করে। যে পরিবেশে সত্য বলা ঝুকিপূর্ণ, অথচ তোষামোদ লাভজনক, সেখানে মেধা ও সততার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

আধুনিক সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, জ্ঞান ও বস্তুগত অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু নৈতিকতার বিকাশ সমানতালে না চললে সেই অগ্রগতি মানুষের চরিত্র ও সামাজিক আস্থা রক্ষা করতে পারে না। রাষ্ট্রের কাঠামো আধুনিক হতে পারে, অর্থনীতি বড় হতে পারে; কিন্তু ন্যায়বোধ দুর্বল হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক দক্ষতা রাষ্ট্রকে গতিশীল করতে পারে, কিন্তু সততা, বিবেক ও জবাবদিহি ছাড়া সেগুলো সুশাসনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
আমাদের সংকটের একটি বড় নাম- সুবিধাবাদ। নিজের স্বার্থে নিয়ম ভাঙলে তা বাস্তববাদ, অন্যের ক্ষেত্রে একই কাজ অপরাধ; নিজের সন্তানের অবৈধ আয় পরিবারের সাফল্য, অথচ অন্যের দুর্নীতি নিন্দনীয়। এই দ্বিচারিতা নৈতিকতার সর্বজনীন মানদণ্ডকে ধ্বংস করে। যে পরিবার অবৈধ উপার্জনে গর্ব করে, যে সমাজ অর্থের উৎসের চেয়ে অর্থের জৌলুশকে বড় করে দেখে, সেখানে পরবর্তী প্রজন্ম সততার চেয়ে সম্পদকেই সাফল্যের মাপকাঠি ভাবতে শেখে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, পৃষ্ঠপোষকতাবাদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নেতৃত্বের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, যদি আচরণের সংস্কৃতি অপরিবর্তিত থাকে। যোগ্যতার বদলে আনুগত্য, জনসেবার বদলে ব্যক্তিস্বার্থ এবং জবাবদিহির বদলে দায়মুক্তি প্রাধান্য পেলে নাগরিকের আস্থা ক্ষয়ে যায়। বিভক্ত হয় আমাদের যৌথ সামাজিক পরিচয়; নাগরিকের পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে দল, গোষ্ঠী, পদ ও সম্পদের পরিচয়।
ক্ষমতা নিজেই দুর্নীতির অনিবার্য কারণ নয়। কার্যকর জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও ব্যক্তিগত নৈতিকতা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে পারে। সংকট শুরু হয়, যখন ক্ষমতার নৈকট্য নীতির বিকল্প হয়ে ওঠে এবং আনুগত্য সততার চেয়ে বেশি পুরস্কৃত হয়।

এই বাস্তবতাকে দুটি উদ্ধৃতি গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। প্রথমত, ÔIntegrity is doing the right thing, even when no one is watching. - C. S. Lewis। অর্থাৎ, কেউ দেখছে না- এমন পরিস্থিতিতেও সঠিক কাজটি করে যাওয়াই সততার প্রকৃত পরিচয়। দ্বিতীয়ত, ‘Silence in the face of injustice is complicity with injustice. — Ginetta Sagan। অন্যায়ের মুখে নীরব থাকা শেষ পর্যন্ত সেই অন্যায়ের সঙ্গে এক ধরনের যোগসাজশে পরিণত হয়।

তাই উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমাজের ‘ওপেন হার্ট সার্জারি’- রূপক অর্থে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ব্যবস্থার গভীর সংস্কার। পরিবারে বৈধ উপার্জন ও সততার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে; শিক্ষায় নৈতিক যুক্তিবোধ বাড়াতে হবে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি। প্রমাণিত অনিয়মের প্রতিকার হতে হবে পরিচয় ও অবস্থান নির্বিশেষে। একই সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে- প্রতিহিংসা কিংবা প্রমাণহীন অভিযোগের মাধ্যমে নয়।

প্রশাসনে এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে এক জন কর্মকর্তা পদমর্যাদার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের দায়িত্ব, বিধিবিধান ও নাগরিকের প্রতি কর্তব্যকে অগ্রাধিকার দেবেন। ঊর্ধ্বতনের প্রতি সম্মান থাকবে, কিন্তু তা চাটুকারিতায় পর্যবসিত হবে না; আনুগত্য থাকবে সংবিধান, আইন ও প্রতিষ্ঠানের বৈধ উদ্দেশ্যের প্রতি, কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্যে নয়। একইভাবে নেতৃত্বকেও প্রশংসার চেয়ে সত্যনিষ্ঠ পরামর্শকে মূল্য দিতে হবে। 
আইন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু বিবেকের বিকল্প হতে পারে না; শাস্তি অন্যায়কে নিরুৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু নৈতিক সমাজ গড়তে প্রয়োজন পরিবার, প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব ও নাগরিকের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

আজ আমাদের সামনে প্রশ্নটি খুব সরল, অথচ নিষ্ঠুর- আমরা কি সন্তানদের জন্য অবৈধ সম্পদের উত্তরাধিকার রেখে যাব, নাকি সততার সংস্কৃতি? আমরা যদি অন্যায়কে স্বাভাবিক, দুর্নীতিকে সাফল্য এবং নীরবতাকে নিরাপত্তা হিসেবে মেনে নিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে উন্নত অবকাঠামোর আড়ালে একটি নৈতিকভাবে দুর্বল সমাজ তুলে দেব।

জাতির প্রকৃত সংকট কেবল অর্থের অভাব নয়, বিবেকের অভাব; কেবল নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, অন্যায়ের সঙ্গে সামাজিক আপস। আর প্রকৃত উত্তরণ কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নয়- মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সততার প্রতিষ্ঠায়। যে সমাজ অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে, সে নিজের ভবিষ্যৎকেই বন্ধক রাখে। এখনই সময় সেই বন্ধক মুক্ত করার- বিবেককে ফিরিয়ে এনে, ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে এবং সুবিধার ঊর্ধ্বে সততাকে স্থান দিয়ে। 

কাজী জিয়া উদ্দিন : কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি, বাংলাদেশ পুলিশ। 

এডিটোরিয়াল- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত