প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
পিএইচপি সফটওয়্যারের গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে বিশ্ব জুড়ে সাইবার ঝুকির পাশাপাশি বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সেবায় বড় প্রভাব পড়েছে। নিরাপত্তা সতর্কতার অংশ হিসেবে গত ২২ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, গতকাল খুলে দেয়া হয়েছে। সাইবার ঝুকির কারণে দেশের ভূমি সেবা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-ভান্ডারে বড় ধরনের বিঘ্ন ও ঝুকি তৈরি হয়েছে। ঝুকিপূর্ণ সিস্টেমগুলো দ্রুত শনাক্ত করে পিএইচপি সংস্করণ হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। বৃটেনের ৩২টি সরকারি ওয়েবসাইট, ফ্রান্সের টেলিকম প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জ এবং ইনডিয়ার স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (এসবিআই) কিছু তথ্য ফাসের ঘটনা ঘটে। দেশে মাসে প্রায় তিন লাখ মানুষ অনলাইনে জমির নামজারি বা মিউটেশন সেবা নেয়। ই-নামজারি সেবা বন্ধ রয়েছে।
নিরাপত্তার এই ত্রুটির কারণে বিশ্ব জুড়ে ওয়েবসাইট বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশেও বেশ কিছু ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমি সেবার ওয়েবসাইট ছাড়াও রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক, বেসরকারি হসপিটালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট। ওয়েবসাইট বন্ধ রেখে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করছে। বিজিডি ই-গভ সার্টের জরুরি সাইবার সতর্ক বার্তার অংশ হিসেবে ওয়েবসাইট হালনাগাদ করা হচ্ছে।
যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাদের অনেকেই হয়তো পিএইচপির নাম শোনেনি; কিন্তু প্রতিনিয়তই পিএইচপির সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারেকশন হয়। পিএইচপি হলো ‘হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর’এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এটি একটি ‘ প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’, যেটা ব্যাক-এন্ড বা নেপথ্যে থেকে কাজ করে। বিশ্ব জুড়ে যত ওয়েবসাইট রয়েছে, এর ৭০ শতাংশ পরিচালনা করা হয় পিএইচপি দিয়ে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে কানাডিয়ান প্রোগ্রামার রাসমাস লারডর্ফ এটি তৈরি করেন এবং সোর্স কোড সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ফলে সেটি সবাই বিনা মূল্যে ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রূপান্তরের সুযোগ পায়।
পিএইচপিতে এই ত্রুটি এক দশকের বেশি সময় ধরে ছিল। তবে সেটা এত দিন ধরা পড়েনি। গত সপ্তাহে বিষয়টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে শনাক্ত করেন আমেরিকার দুটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের এক দল গবেষক। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো- ক্যালিফ ও উইজ। এর মধ্যে উইজ হলো- গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান এলফাবেটের একটি কম্পানি। সংস্থাটি বলেছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দ্রুত নিরাপত্তা ত্রুটি ঠিক করতে না পারে, তাহলে তাদের সিস্টেম বন্ধ করে দেয়া উচিত। কারণ, এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সরাসরি কোনো তথ্য-ভান্ডার বা ডেটাবেজে হামলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্ব জুড়ে শত শত ওয়েবসাইট বন্ধের ঘটনা ঘটলেও এর আর্থিক ক্ষতি কত, সেটা এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান জানায়নি। মোট কত ওয়েবসাইট বন্ধ হয়েছে, সেটাও জানানো হয়নি। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার উপায় জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, পিএইচপি হালনাগাদ করলে ঝুকি কমবে।
সম্ভাব্য সাইবার ঝুকি এড়ানো এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে ওয়েবসাইটগুলো আবার চালু করা হবে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য-ভান্ডারের তথ্য ফাসের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালেও পাচ কোটি মানুষের এনআইডির তথ্য ফাসের ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। ভয়াবহ বিপর্যয় এড়াতে বৈশ্বিক পদক্ষেপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের সাইবার নিরাপত্তা দ্রুত নিñিদ্র করা জরুরি।