
‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’
নারী কন্যা, জায়া, জননী। একা পুরুষের পক্ষে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়, নারীর অংশগ্রহণ জরুরি। তাই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে নারী-পুরুষের সমানভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমরা কেউ কেউ নারী আর পুরুষের চলার পথ এক মনে করি না। নারী ঘরে সংসার-ধর্ম পালন করবে এমনটা তাদের অভিমত। এ ধারণা বর্তমান থেকে নয়, অতীত থেকে চলে আসছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আজকের নারীর অবস্থান। কেউ চাকরি করছে, কেউ ডাক্তার, কেউ পাইলট, কেউ বড় রাজনীতিবিদ ইত্যাদি। পক্ষান্তরে কোনো কোনো নারী আজও ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দিদশায় জীবন অতিবাহিত করছে।
মূলত নারীকে যথাযথ সম্মান দিতে দুর্গা পূজার অংশ হলো কুমারী পূজা। নারী ভোগ্য নয়, নারী পূজ্য তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব। নিজের স্ত্রীকে তিনি দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা করেছিলেন।
শারদীয় দুর্গা উৎসবের এক বর্ণাঢ্য পর্ব হলো কুমারী পূজা। পূজার সাংস্কৃতিক আবহ সম্পর্কে যাদের আগ্রহ বেশি তারা কুমারী পূজা সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। কালের অতলে দুর্গা পূজায় কুমারী পূজা হারিয়ে গেলেও স্বামী বিবেকানন্দ মাতৃজাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ১৯০১ সালে বেলুর মঠে শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদা দেবীর অনুমতিক্রমে কুমারী পূজা পুনঃ প্রচলন করেন। তবে সব দুর্গা পূজার মণ্ডপে কুমারী পূজা হয় না। সাধারণত রামকৃষ্ণ মিশনের কিছু কিছু শাখায় এ পূজা মহাষ্টমীর দিনে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর ও বরিশাল এর মধ্যে অন্যতম।
কুমারী পূজা বিষয়ে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা হলো— বৃহদ্ধর্মপুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী দেবতাদের স্তবে প্রসন্ন হয়ে দেবী চণ্ডিকা কুমারী কন্যা রূপে দেবতাদের সামনে দেখা দিয়েছিলেন। দেবী পুরাণে বিস্তারিত এ বিষয় উল্লেখ আছে। তবে অনেকে মনে করেন যে, দুর্গা পূজায় কুমারী পূজা সংযুক্ত হয়েছে তান্ত্রিক সাধনা মতে। একসময় শক্তিপীঠসমূহে কুমারী পূজার রীতি প্রচলিত ছিল। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও কুমারীর কথা উল্লেখ আছে। আর এ থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে, দেবীর কুমারী নাম অনেক পুরনো। দেবীর কুমারী নাম যেমন পুরনো, তার আরাধনা ও পূজার রীতিনীতিও তেমনি প্রাচীন এবং ব্যাপক।
যোগিনীতন্ত্রে কুমারী পূজা সম্পর্কে উল্লেখ আছে— ব্রহ্মাশাপবশে মহাতেজা বিষ্ণুর দেহে পাপ সঞ্চার হলে সেই পাপ থেকে মুক্ত হতে হিমাচলে মহাকালীর তপস্যা শুরু করেন। বিষ্ণুর তপস্যায় মহাকালী খুশি হন। দেবীর সন্তোষ মাত্রেই বিষ্ণুর হৃদপদ্ম হতে সহসা ‘কোলা’ নামক মহাসুরের আবির্ভাব হয়। সেই কোলাসুর ইন্দ্রাদি দেবগণকে পরাজিত করে অখিল ভূমণ্ডল, বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ এবং ব্রহ্মার কমলাসন প্রভৃতি দখল করে নেয়। তখন পরাজিত বিষ্ণু ও দেবগণ ‘রক্ষ’ ‘রক্ষ’ বাক্যে ভক্তি বিনম্রচিত্তে দেবীর স্তব শুরু করেন। বিষ্ণু আদি দেবগণের স্তবে সন্তুষ্টা দেবী বলেন— ‘হে বিষ্ণু! আমি কুমারীরূপ ধারণ করে কোলানগরী গমন করে কোলাসুরকে সবান্ধবে হত্যা করব।’ দেবী কথামতো কাজ করেন। সেই থেকে দেব-গন্ধর্ব, কিন্নর-কিন্নরী, দেবপত্নীগণ সকলে সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে কুমারীর অর্চনা করে আসছেন। সাধারণত শ্রীশ্রী দুর্গা দেবীর মহাষ্টমী পূজা শেষে কুমারী পূজা হয়ে থাকে।
পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নিদিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরনো হয় এবং ফুলের গয়না ও নানাবিধ অলঙ্কারে তাকে সাজানো হয়। পা ধুয়ে পরানো হয় আলতা, কপালে একে দেয়া হয় সিদুরের তিলক, হাতে দেয়া হয় মনোরম ফুল। কুমারীকে মন্দিরের সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তার পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানাবিধ উপাচার। এরপর কুমারীর ধ্যান করতে হয়। যাগ-যজ্ঞ-হোম সবই কুমারী পূজা ছাড়া সম্পূর্ণ ফলদায়ী হয় না। কুমারী পূজায় দৈব-ফল কোটিগুণ লাভ হয়। কুমারীকে ফুল দিয়ে পূজা করলে তার ফল হয় পর্বত সমান। যিনি কুমারীকে ভোজন করান তার দ্বারা ত্রিলোকেরই তৃপ্তি হয়। দেবী পুরাণ মতে, দেবীর পূজার পর উপযুক্ত উপাচারে কুমারীদের ভোজনে তৃপ্ত করাতে হবে।
কুমারী দেবী ভগবতীর অতি সাত্ত্বিক রূপ। জগন্মাতা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী হয়েও চিরকুমারী। কুমারী আদ্যাশক্তি মহামায়ার প্রতীক। দুর্গার আরেক নাম কুমারী। মূলত নারীর যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতেই কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়। মাটির প্রতিমায় যে দেবীর পূজা করা হয়, তারই বাস্তবরূপ কুমারী পূজা। কুমারীতে সমগ্র মাতৃজাতির শ্রেষ্ঠ, শক্তি, পবিত্রতা, সৃজনী ও পালনী শক্তি, সকল কল্যাণী শক্তি সূক্ষ্মরূপে বিরাজিতা।
তারাপদ আচার্য্য : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ