অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

লেফটেনান্ট কর্নেল জুবায়ের-আল-হাসান, পিএসসি

এডিটোরিয়াল

এই সড়ক শুধু যাতায়াতকে সহজ করেনি, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের নতুন ভিত্তি

2026-10-20T00:00:00+06:00
2026-10-19T21:07:19+06:00
সোমবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২৬
১০ কার্তিক ১৪৩৩
শিরোনাম:
এডিটোরিয়াল
সড়ক পথে মদক জয়
অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার
লেফটেনান্ট কর্নেল জুবায়ের-আল-হাসান, পিএসসি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ১৯.১০.২০২৬ ৯:০৭ পিএম (প্রিন্ট সংস্করণ)
লেফটেনান্ট কর্নেল জুবায়ের-আল-হাসান, পিএসসি
এই সড়ক শুধু যাতায়াতকে সহজ করেনি, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের নতুন ভিত্তি গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়েছে মদকের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও এর অজানা সম্ভাবনা।
ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড় মদক টং (সাকা হাফং), মদক মোয়াল (জো তলাং), কেওক্রাডং ও তাজিংডংয়ের নামের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। পরে জানা যায়, এসব শৃঙ্গ নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত শ্রেণি মদক রেঞ্জ। এক সময় কল্পনায় ভেসে বেড়ানো সেই দুর্গম জনপদ আজ বাস্তবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর বাস্তবায়নাধীন থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প দেশের সবচেয়ে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলকে অক্লান্ত ত্যাগের মধ্য দিয়ে সড়ক যোগাযোগের আওতায় এনেছে। এরই মাধ্যমে মদক রেঞ্জের পাদদেশে সাঙ্গু অববাহিকায় অবস্থিত মদক জনপদ দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত হয়ে উন্নয়ন ও সম্ভাবনার এক উদীয়মান ভোরের দেখা পেয়েছে।

এই সড়ক শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই করেনি, বরং স্থানীয় মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার করছে।
মদক শব্দটির উৎস ত্রিপুরা ভাষা। এর অর্থ উচু শৃঙ্গ বা পর্বত। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, বান্দরবানের সীমান্ত ঘেষা দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক মদক পর্বতমালা এবং সাঙ্গু নদীর উপনদী মদক খালকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এই জনপদের পরিচয়।

আকাশ ছোয়া পাহাড়, মেঘে ঢাকা শৃঙ্গ, গভীর অরণ্য আর খরস্রোতা সাঙ্গু নদীর বুকে বহমান জীবন মদক যেন প্রকৃতির এক অনিন্দ্য সুন্দর শিল্পকর্ম।
বছরের অধিকাংশ সময়ই পাহাড়ের চূড়াগুলো মেঘ ও কুয়াশার চাদরে আবৃত থাকে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য নাম না জানা ঝর্ণা, স্বচ্ছ পানির ঝিরি এবং সুপ্রাচীন বনভূমি এ অঞ্চলকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

এই অরণ্য শুধু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলই নয়, বরং বিরল প্রাণী, বনজ সম্পদ ও অসংখ্য পাখির নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবেও টিকে আছে। প্রকৃতির অফুরন্ত সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদের পাদদেশে সাঙ্গু নদীর তীর ধরে মূলত ত্রিপুরা, ম্রো, মারমা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতি গড়ার মধ্য দিয়ে মদকের জন্ম হয়েছে।

যদিও বহু আগে থেকেই এখানে কৃষি কাজ, বসতি এবং সীমিত পরিসরে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটেছিল, তথাপি দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে মদক দীর্ঘদিন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা, সুখ-দুঃখ ও সম্ভাবনা অনেকাংশে নির্ভর করেছে সাঙ্গু নদীর খেয়ালি স্রোতের ওপর।

মদকবাসীর জন্য থানচি সদর কিংবা রিমাকরির সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল সাঙ্গু নদী কিন্তু সেই নদীপথ কখনোই সহজ ছিল না।
বর্ষা এলে পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গুর রূপ বদলে যেত। তীব্র স্রোতে নদী হয়ে উঠত ভয়ংকর ও অপ্রতিরোধ্য। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া বিশাল পাথরগুলো নৌযাত্রাকে করে তুলত অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। প্রায়ই পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটার সংখ্যাটাও অগণিত।
অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে জেগে উঠত চর, বালুচর ও পাথরের অংশ। তখন অনেক স্থানে নৌকা আটকে যেত। ইঞ্জিনের শক্তিও হার মানত প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যময় নির্মম রূপের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই বেচে ছিল মদকের মানুষ।
যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্গমতার কারণে মদকের প্রায় সাড়ে চার শতাধিক পরিবার দীর্ঘকাল মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার, প্রশাসনিক সেবা, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সবকিছুই ছিল সীমাহীন দুর্ভোগের এক গল্প।

সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট ছিল চিকিৎসা। জরুরি রোগীকে হসপিটালে পৌছাতে পাচ থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত নদীপথে ভ্রমণ করতে হতো। সময় মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক সংকটাপন্ন রোগী যাত্রাপথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এমন অসংখ্য বেদনাদায়ক স্মৃতি বহন করে চলেছে এই জনপদের অধিকাংশ দোচালা ঘরে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল আরো কঠিন। অনেক সংগ্রাম করে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করা গেলেও, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ছিল অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে প্রায় অধরাই। উচ্চ শিক্ষার জন্য দূরবর্তী শহর বা পাড়ায় থেকে পড়াশোনা করার সামর্থ্য সবার ছিল না। ফলে বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন অকালেই থেমে গেছে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। কৃষিপণ্য সময় মতো বাজারে পৌছাতে না পারায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিক্রি করতে হতো নামমাত্র মূল্যে মহাজনদের কাছে। অনেক সময় পরিবহনের অভাবে ক্ষেতের ও বাগানের ফসল নষ্ট হয়ে যেত।
মহাজনদের সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই বিচ্ছিন্নতাকে পুজি করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে শোষণ করে আসছিল। স্থানীয় মানুষের শ্রম ও উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য তাদের হাতে পৌছায়নি।

অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচারে মদক নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনাঞ্চল। পাহাড়, নদী, ঝর্ণা, অরণ্য আর মেঘের রাজ্যে ঘেরা এই ভূস্বর্গ পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো সব কিছুই ছিল। কিন্তু যোগাযোগের দুর্ভোগ ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি দীর্ঘ বছরেও। নৌপথে হাতে গোনা কিছু পর্যটক এলেও অধিকাংশ মানুষ এই অঞ্চলে ভ্রমণকে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় মনে করেনি।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ ও বঞ্চনার অবসান ঘটাতে আলোর মশাল হয়ে এসেছে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক প্রকল্প।

এই প্রকল্প শুধু একটি সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম নয়। এটি একটি অবরুদ্ধ জনপদের স্বপ্নপূরণের গল্প। বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত প্রায় ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক থানচি থেকে শুরু হয়ে রিমাকরি অতিক্রম করে মদক পর্যন্ত পৌছেছে এবং অবশিষ্ট অংশের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে অচিরেই দুর্গম লিকরি জনপদও সড়ক যোগাযোগের আওতায় আসছে। পাহাড়, টিলা, ঝিরি, উপত্যকা ও শত বছরের বিচ্ছিন্নতাকে ছুড়ে ফেলে এই সড়ক মানুষ, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনাকে একত্রিত করেছে।

সড়ক মানে শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের সুযোগ নয়। একটি সড়ক অসংখ্য ত্যাগের বিনিময়ে তৈরি হয়। তৈরি হয় শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, পর্যটন এবং উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা। এই সড়ক চালু হওয়ার ফলে জীবন যাত্রায় আমূল পরিবর্তনের সুরে আচ্ছন্ন মদকের মানুষ।
এক সময় যে জনপদ ছিল প্রকৃতির কাছে অবরুদ্ধ, সেই মদক আজ ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছে দেশের মূল স্রোতের সঙ্গে। সীমান্তের এই দুর্গম ভূখণ্ডে নির্মিত নতুন পথ শুধু পাহাড় কেটে তৈরি হয়নি। প্রতিটি বাক যেন সাক্ষী হাজারো মানুষের স্বপ্ন, অক্লান্ত সংগ্রাম ও ত্যাগের; যা দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা ও উন্নয়ন বঞ্চনার অন্ধকার পেরিয়ে এই জনপদকে এগিয়ে নিচ্ছে এক আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যতের পথে। মেঘ, পাহাড় আর সাঙ্গুর গর্জনের মাঝখানে তাই আজ নতুন এক ইতিহাস রচিত হয়েছে। তা হলো সড়ক পথে মদকের জয়যাত্রার ইতিহাস।

এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নে অসাধারণ দক্ষতা, নিষ্ঠা, সাহস, একাগ্রতা, ত্যাগ ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে গেছে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী। দুর্গম পাহাড়ের প্রতিকূল পরিবেশে পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরে থেকে, নিজেদের জীবনের ঝুকি নিয়ে সেনা সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন এই সড়ক নির্মাণে। তাদের কঠোর পরিশ্রম, পেশাদারিত্ব এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলেই থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক প্রকল্প মদকবাসীর জীবনে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
চলতি বছরের এপৃল মাসে প্রথমবারের মতো মদককে সড়কপথে সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। মূল সড়ক প্রকল্পের আওতায় মদকে পৌছানোর জন্য প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে অক্লান্ত পরিশ্রমে নির্মাণ কাজ শেষ করে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী।

অবশেষে, ২০২৬ সালের ১৮ মে ইতিহাসের এক স্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম হয়। সেদিন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর অগ্রগামী দল গাড়িযোগে মদকে পৌছায়। সেই যাত্রায় শুধু একটি যানবাহনের আগমন ছিল না। এটি ছিল বহু বছরের বিচ্ছিন্নতা, বঞ্চনা ও অপেক্ষার অবসানের প্রতীক। আনন্দ, বিস্ময় আর আবেগে ভেসে ওঠে পুরো মদক জনপদ। অনেক প্রবীণের চোখে জল টলমল করছিল। তাদের কাছে এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর প্রথম কোনো গাড়ি সড়ক পথে বড় মদকে পৌছেছে।

দুর্গম ঝিরি, খাড়া পাহাড়ি পথ এবং অগণিত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে যখন আধুনিক ভারী যন্ত্রপাতি ও যানবাহন মদকে পৌছায়, তখন স্থানীয় মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো এত বড় যন্ত্র নিজেদের এলাকায় দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ পরম মমতায় ভালোবেসে স্পর্শ করেন, কেউবা নীরবে অশ্রু ফেলছিলেন। সেই অশ্রুর ভেতর মিশেছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তির আনন্দ, নতুন জীবনের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। এটি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক বীরত্ব ও সাহসের গল্পও।

ছোট ছোট শিশুরা বিস্ময়ভরা চোখে যন্ত্রগুলোর চারপাশে ঘুরছিল, উঠে দেখছিল এবং ছবি তুলছিল। তাদের কৌতূহলী দৃষ্টিতে যেন ফুটে উঠছিল নতুন এক আত্মবিশ্বাসের বীজ। পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে জন্ম নিচ্ছিল নতুন দিনের স্বপ্ন। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় মদকের স্বপ্ন।
মদকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এখন মানুষ সহজেই বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হসপিটাল এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দফতরে যাতায়াত করতে পারছে। শত শত বছর ধরে যেসব মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেন, বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় করতেন, আজ তারা অল্প সময়েই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এতে জীবন যাত্রার ব্যয় যেমন কমেছে, তেমনি উন্নত হয়েছে সামাজিক জীবনমান।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে স্বাস্থ্য খাতেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। জরুরি মুহূর্তে রোগীদের দ্রুত হসপিটালে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে, যা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এখন অনেক সহজ হয়েছে, যেটি আগে কল্পনাও করা যেত না। সেই কল্পনার বাস্তব রূপ দিয়েছে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম, ওষুধ সরবরাহ এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের দুর্গম অঞ্চলে যাতায়াত ও সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে আরো গতিশীল হয়েছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও এই সড়ক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত সহজ হওয়ায় তাদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন। ফলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত হচ্ছে। ভবিষ্যতে আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পথও সুগম হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সড়ক মদকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। স্থানীয় কৃষিপণ্য, ফলমূল, বনজ সম্পদ ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য এখন খুব কম সময়ে বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। সড়ক হওয়ার ফলে শহরের অনেক ব্যবসায়ী গাড়িযোগে এসে উৎপাদিত পণ্য অতীতের চেয়ে অনেকগুণ বেশি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, প্রসার ঘটছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের। নতুন কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পাহাড়ি অর্থনীতি ধীরে ধীরে আরো শক্তিশালী ও গতিশীল হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে মদকের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পাহাড়, ঝর্ণা, অরণ্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতি প্রেমী ও ভ্রমণ পিপাসুদের এখন কাছ থেকে পাহাড়ি জীবন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে একটি মাত্র সড়কে। এর ফলে স্থানীয় যুবসমাজের জন্য গাইডিং, পরিবহন, আবাসন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। যা এই জনপদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথকে আরো প্রশস্ত করছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের একটি দুর্গম সীমান্তবর্তী অঞ্চল হিসেবে মদক দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, সীমান্ত নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় সেবা কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুকিপূর্ণ। নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে এখন প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা দ্রুত ও সহজে দুর্গম এলাকায় পৌছাতে পারছে। এর ফলে এই সড়কের মধ্য দিয়ে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম আরো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দুর্গম মদক অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ফলে সীমান্ত চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন সীমান্ত কেন্দ্রিক অপরাধ দমনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর হচ্ছে।
সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, বিশেষ করে তরুণদের মানসিক বিকাশ ও কল্যাণের কথা চিন্তা করে একটি আধুনিক ফুটবল মাঠও নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী। এর ফলে পাহাড়ি তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও ইতিবাচক মনোভাব আরো দৃঢ় হয়েছে। মাঠের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে একটি বিদ্যালয় সংস্কার ও আধুনিকায়নও করেছে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী।
থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প দীর্ঘদিনের অবহেলা, বঞ্চনা ও বিচ্ছিন্নতার শৃঙ্খল ভেঙে মদক অঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এক সময় যেখানে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল দুর্গম নৌপথ, সেখানে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর আন্তরিকতা, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে আজ সড়কপথে মদকের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।

এই সড়ক শুধু যাতায়াতকে সহজ করেনি, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের নতুন ভিত্তি গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয়েছে মদকের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও এর অজানা সম্ভাবনা।
দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে এসে এখন মদকের মানুষ নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। তাদের চোখে ফুটে উঠেছে উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। মদক সড়ক কেবল একটি দুর্গম অঞ্চলে সড়ক নির্মাণের সাফল্য নয়, এটি উন্নয়ন, সংযোগ, মানবিক অগ্রগতি, যোগাযোগ এবং দীর্ঘদিনের বন্দিদশা থেকে মুক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

নতুন এই সড়ক যেন মদকের বুকে রচনা করেছে এক নতুন ইতিহাস। যেখানে পাহাড়ের নীরবতা ভেদ করে এগিয়ে চলেছে আধুনিক, সম্ভাবনাময় এবং স্বপ্নময় এক জনপদ।

লেফটেনান্ট কর্নেল জুবায়ের-আল-হাসান, পিএসসি : অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক, সীমান্ত সড়ক (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য এলাকা) নির্মাণ প্রকল্প ও প্রকল্প পরিচালক, থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প 

এডিটোরিয়াল- এর আরোও খরব 
সম্পাদক ও প্রকাশক : শফিক রেহমান
অফিস:
যায়যায়দিন মিডিয়াপ্লেক্স
৪৪৬ ই+এফ+জি, লাভ রোড, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ঢাকা ১২০৮
ইমেইল : [email protected]
বিভাগীয় ফোন:
অনলাইন নিউজ- ০১৩৩৫১০৭৭০১, ০১৫৭২১৭৩৭৭৭
বিজ্ঞাপন বিভাগ- ০১৯১২২৯২৩১৩, ০১৭১১১৭৫৩৩১
সার্কুলেশন বিভাগ- ০১৭১২৩৮০৩২৫, ০১৮৩৪৮০০৮৭৭
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত