আমির খসরুসাংবাদিক এবং সংবাদ কর্মী হিসেবে খসরুর পেশাগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও বর্ণাঢ্য- একাধারে পৃন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ভোয়া, বিবিসি, আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া অঙ্গনেও খসরুর ছিল ব্যাপক উপস্থিতি। খসরু ছিল সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, লেখক ও গবেষক। গণতন্ত্র- তার সমস্যা ও সংকট, প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তার সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও গবেষণার বিষয় বিস্তৃত ছিল দেশ-বিদেশে। পাঠকদের খসরু নিয়ে যেতে পারত বিষয়ের অনেক গভীরে। দৃশ্যমান যা, তা থাকত বিবরণে, অদৃশ্য যা, তা থাকত তার বিশ্লেষণে।
খসরু হঠাৎই চলে গেল। কাউকে কিছু না বলে। নীরবে নিঃশব্দে। কি তাড়া ছিল ওর- এতো তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার। বয়স তো হয়েছিল মাত্র ৬২ বছর। এই বয়সে কেউ চলে যায়। আমরা যে শুনি Life begins at forty। তাহলে জীবন শুরুর মাত্র ২২ বছর বয়সে এমন কি ঘটল- দেশে, সমাজে বা পরিবারে যে খসরুকে চলেই যেতে হলো। সেদিনটা ছিল শনিবার, ১০ অক্টোবর। সন্ধ্যার দিকে একটা ফোন পেলাম সাগরের কাছ থেকে। সাগর যুবদল কর্মী। সাগর জানাল, মামা, আপনার বন্ধু সাংবাদিক আমির খসরু আর নেই!
সাগরের ফোনে বড় রকমের একটা ধাক্কা খেলাম। বলে কি! এটা কি হতে পারে। খসরু আর নেই। না এ হতে পারে না। মাত্র ক’দিন আগে খসরু ফোন করেছিল। বলেছিল, আমাদের দেখা হওয়া দরকার। অনেক কথা আছে। আমি ওকে আমার বাসায় আসতে বলেছিলাম। ও বলেছিল, আজকাল ঢাকার বাতাস ওর সহ্য হয় না। বাইরে ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। ও খুব কমই বাইরে বের হয়। ও আমাকে ওর বাসায় যেতে বলেছিল। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে দুই-তিন দিনের মধ্যে ফোন করে আমি চলে আসব।
বেকার লোকদের কাজের শেষ নেই। আমার অবস্থাও তাই। অবসর নেয়ার পর থেকে নির্দিষ্ট কোনো কাজ না থাকায়- আমি বলতে গেলে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত। কাজে এবং অকাজে। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব। একেক জনের একেক রকম ফরমাস, আবেদন এবং নির্দেশও আছে। কাউকেই আমি না বলতে পারি না।
দুই.
খসরুকে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। হয়তো তেমন কোনো জরুরি নয়, কিন্তু কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারার এটাই আমার প্রথম ঘটনা নয়। এরকম ঘটনা আগেও হয়তো আরো ঘটেছে। আমি শরমিন্দা হয়েছি। দুঃখ প্রকাশের সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু এবার সে সুযোগ আর নেই। জানি না, কথার এই বরখেলাপ করায় খসরু আমাকে ক্ষমা করবে কি না। কিন্তু আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। পারবও না।
কবে কখন কিভাবে খসরুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল সেসব কথা আজ আর মনে নেই। খসরু ছিল আমার প্রফেশনাল বন্ধু। একই টেবিলের দু’দিকে আমাদের আসন। খসরু ছিল সাংবাদিক-সংবাদ কর্মী। মিডিয়ার জন্য ও খবর তৈরি করত। তথ্য ক্যাডারের সদস্য হিসেবে আমিও সংবাদ তৈরি করতাম-সরকারের নানা কর্মসূচি ও সাফল্যের বিবরণ দিয়ে তৈরি হতো সে সংবাদ। দুই জনেই সংবাদ তৈরি করতাম মিডিয়ায় প্রকাশের জন্য। খসরুর কাজের পরিধি ছিল বিস্তৃত। আমারটা সীমিত। খসরুকে দেশ-বিদেশের সব ঘটনায় নজর রাখতে হতো। আমাকে মনোনিবেশ করতে হতো সরকারের বিশেষ বিশেষ প্ল্যান, কর্মসূচি ও সাফল্য মিডিয়ার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরার কাজে।
পরিচয় তো হলো। ঘনিষ্ঠতা হয়, ঘটনাচক্রে নিউ ইয়র্কে। আমি তখন জাতি সংঘে আমাদের পার্মানেন্ট মিশনে প্রথম সচিব (প্রেস)-এর দায়িত্ব পালন করছি। ১৯৯২-৯৬ সাল। তখন জাতি সংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কভার করার জন্য খসরু এসেছিল নিউ ইয়র্কে। ওর প্রেস কার্ড সংগ্রহ করতে কিছু আনুষ্ঠানিকতায় পার্মানেন্ট মিশনের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। ওই সাহায্য আমরা করি।
খসরু তখন তার এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায় নিউ ইয়র্কে। অধিকাংশ সময়ই তার কাটে জাতি সংঘ ভবনে। আমাদের কাজও ওই ভবনেই। এক সঙ্গে প্রেস বিফৃং এটেন্ড করি। বিভিন্ন কাজের ফাকে এক সঙ্গে কাফেতে গিয়ে কফি খাই। প্রাসাঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক দেশ-বিদেশের নানা বিষয়ে গল্প করি। কখনো কখনো এক সঙ্গে লাঞ্চ খাই। ওই লাঞ্চ হয় কখনো আমাদের অফিসে কখনো বা জাতি সংঘ কাফেতে।
তিন.
খসরু উঠেছিল, যদ্দূর মনে পড়ে নিনিদের বাসায়। বাংলাদেশের সাংবাদিক নিনি তখন নিউ ইয়র্কের স্থায়ী বাসিন্দা। নিনি ও ওর হাসবেন্ডের সঙ্গে খসরুর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল ঢাকা থেকেই।
কাজের ফাকে ফাকে এবং কাজের শেষে এখানে-ওখানে যাওয়া, আড্ডা দেয়া, চা-কফি খাওয়া, অভিন্ন বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করা- এক সঙ্গে সময় কাটানো- এভাবেই ওই দিনগুলো কেটে যায়। খসরু তার দায়িত্ব পালনে ছিল একনিষ্ঠ। তখন কি কারণে, এখন আর মনে নেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাপানের অবস্থান ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খসরু বলল, ওকে জাপান মিশনের পি.আর-পার্মানেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে একটা সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। জাপান মিশনে আমার কাউন্টারপার্টকে অনুরোধ করে তার ব্যবস্থা করি। মনে আছে, ইত্তেফাকে ওই সাক্ষাৎকারটি আট কলাম হেডিংয়ে ফার্স্ট লিড হয়েছিল।
চার.
সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষে খসরু দেশে ফিরে আসে। কিন্তু আমাদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। আমার দেশে ফিরে আসার পর সময় সুযোগ মতো আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো। দেশে ফেরার পর আমার পোস্টিং হয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে যাওয়ার আগে এক সন্ধ্যায় খসরু আমাকে ও দৈনিক জনপদের গোলাম মহিউদ্দিন খানকে এক রেস্টুরেন্টে ডিনারের দাওয়াত করে। সেদিন আমাদের তিন জনের এক সঙ্গে লম্বা একটা সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল।
চট্টগ্রাম থেকে যখনই আমি ঢাকা আসার সুযোগ পেতাম তখন খসরুর সঙ্গে দেখা হতো ওদের এলিফেন্ট রোডের বাসায়। সকালে ব্রেকফাস্টে খসরুদের বাসার খিচুড়ি শুধু আমি নই আমার বন্ধু-সহকর্মী সাবিহ উদ্দিনও তার স্বাদ গ্রহণ করেছে। সাবিহ উদ্দিন ১৯৯১-৯৬ পর্বে প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিল। সেই অপরাধে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর ছয় মাসের মধ্যে সাবিহকে ওএসডি করা হয়। আওয়ামী লীগের পুরোটা সময় সাবিহ ওএসডি ছিল।
পাঁচ.
যদ্দূর মনে পড়ে, ’৯৯-এর দিকে আমার ঢাকায় ফিরে আসার সুযোগ হয়। ওই সময় নুরুল ইসলাম ভুইয়া ছোটনের আগ্রহে আমি সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে একটা কলাম লিখতে শুরু করি।
অবশ্যই নিজের নামে নয়। ওই সময়টায় বা তার আগে-পরে কাছাকাছি সময়ে যায়যায়দিনে সামাদ ভাই- বিবিসি খ্যাত আতাউস সামাস, মানব জমিনের মতিউর রহমান চৌধুরী এবং আমির খসরুও কলাম লিখতেন। খসরু যখন জানতে পারল, আমি অন্য এক নামে যায়যায়দিনে লিখছি- ও একদিন আমাকে ফোন করে, বলা যায় একটু উদ্বেগ প্রকাশ করল। ওর ভয় ছিল, যে নামেই লিখি না কেন- কোনোভাবে জানাজানি হলে আমার সমস্যা হতে পারে।
আমি খসরুর লেখা আগ্রহের সঙ্গে পড়তাম। ওই সময় যায়যায়দিনে ওর একটা লেখার শিরোনাম আমার এখনো মনে আছে- ‘অলি বার বার ফিরে আসে’। সবটা মনে নেই, যদ্দূর মনে পড়ে, ’৯৬-এর ইলেকশনের পরে এক উপ-নির্বাচনে কর্নেল অলি বা তার কেউ কোনো এক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। প্রচারে গিয়েছিলেন কর্নেল অলি। ওই লেখাটি-বিষয়বস্তু, পরিবেশনা ও শিরোনাম মিলিয়ে পাঠকদের মধ্যে একটা আগ্রহই শুধু নয়, একটা চমৎকার অনুরণনও তৈরি করতে পেরেছিল।
ছয়.
সাংবাদিক এবং সংবাদ কর্মী হিসেবে খসরুর পেশাগত জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও বর্ণাঢ্য- একাধারে পৃন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, ভোয়া, বিবিসি, আল জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া অঙ্গনেও খসরুর ছিল ব্যাপক উপস্থিতি। খসরু ছিল সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, লেখক ও গবেষক। গণতন্ত্র- তার সমস্যা ও সংকট, প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তার সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও গবেষণার বিষয় বিস্তৃত ছিল দেশে-বিদেশে। পাঠকদের খসরু নিয়ে যেতে পারত বিষয়ের অনেক গভীরে। দৃশ্যমান যা, তা থাকত বিবরণে, অদৃশ্য যা, তা থাকত তার বিশ্লেষণে।
মিডিয়া জগতে খসরুর অভাব সহজে পূরণ হবে না।
খসরু ছিল এক ভিন্ন genre-এর সাংবাদিক। এ ধরনের সাংবাদিকের খুব বেশি বন্ধু হয় না। তবে গুণগ্রাহী হয় অনেক। গত দেড় যুগে সমাজের সর্বক্ষেত্রে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটেছে মিডিয়া জগৎ তার বাইরে ছিল না।
খসরুর অকাল মৃত্যুতে দেশের প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান শোক প্রকাশ করেছেন।
তাজুল ইসলাম : সাবেক প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব