মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও বেগম আলেমা ভাসানীর মাজার শরিফ (বামে), মাজারের পাশে মুসাফিরখানায় খাবার খাওয়ানো হচ্ছে — যাযাদি* আট দশক ধরে চলছে অবিরাম
* টাকা ছাড়াই প্রতিদিন থাকা-খাওয়া
* খ্যাতি ছড়িয়েছে বিদেশেও
পকেটে টাকা নেই, মাথার ওপর নেই কোনো ছাদ-তবুও এক বেলা আহার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিন্দুমাত্র সংশয় জাগে না মনে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথচারী, অসচ্ছল মানুষ আর ভক্ত-অনুসারীদের জন্য বিগত আটটি দশক ধরে এমনই এক অনন্য ভরসাস্থল টাঙ্গাইলের সন্তোষের ঐতিহাসিক ‘মুসাফিরখানা’। যেখানে প্রায় ৮০ বছর ধরে সম্পূর্ণ নিখরচায় চলছে থাকা ও খাওয়ার এক নীরব মানবিক আয়োজন। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জনকল্যাণমুখী দর্শনের এক জীবন্ত স্মারক এই প্রতিষ্ঠান।
জানা যায়- ১৯৪৬ সালে মওলানা ভাসানী নিজ হাতে এই সেবাশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু যিনি কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে আপসহীন সংগ্রাম করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তার সেই চিরন্তন মমত্ববোধ ও দর্শনের প্রতিফলন আজও অম্লান সন্তোষের আঙিনায়। আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও জটিল আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় যেখানে ন্যূনতম স্বার্থ ছাড়া সমানুভূতি মেলা ভার, সেখানে আটটি দশক ধরে একটি মুসাফিরখানা সচল থাকা এক বিরল দৃষ্টান্ত। এটি কেবল একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানই নয় বরং মওলানা ভাসানীর সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও বৈষম্যহীন সমাজভাবনার এক জীবন্ত দলিল।
দেশ ছাড়িয়ে এই মুসাফিরখানার খ্যাতি ও টানে সীমানা পেরিয়ে আসছেন ভিনদেশের মানুষও। সম্প্রতি ভারতের আসামের লক্ষ্মীপুরের গোয়ালপাড়া থেকে সন্তোষে আসেন তিন ব্যবসায়ী। তাদেরই এক জন মনিরুজ্জামান অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা ভাসানী হুজুরের অনুসারী ছিলেন। তাদের কাছে হুজুরের অনেক গল্প শুনেছি। আজ সশরীরে সন্তোষে এসে মুসাফিরখানায় যে আতিথেয়তা ও সেবা পেলাম, তা এক কথায় চমৎকার।’
আরেক ব্যবসায়ী সানিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে এসেই প্রথমে হুজুরের মাজার জিয়ারত করেছি। বাবা-মায়ের কাছে ভাসানীর গৌরবময় ইতিহাস শুনে বড় হয়েছি।’ একই কথা বলেন- শামসুল, আরেফিন, নওশাদ, খালেক, আসলাম, জাহাঙ্গীর, ছিফাত, লস্কর, তামজিদুল, হরিপদ, রাখাল, সুশান্ত, আজগর, নেহাল, পারভেজ, শাকুরসহ অনেকে।
মুসাফিরখানায় আগন্তুকদের পরম যত্নে আগলে রাখছেন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভক্ত-অনুসারীদের খাবারের দেখভাল করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, দর্শনার্থীরা এখানে এসে মওলানা ভাসানীর মাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন। কেউ কেউ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজার করে নিয়ে আসেন, আবার অনেকেই আসেন খালি হাতে। তবে আগন্তুকদের পটভূমি যা-ই হোক না কেন, সবার জন্যই সাধ্যমতো আহারের ব্যবস্থা করা হয়।
এই মুসাফিরখানার রান্নাঘরে দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন চান মিয়া। তিনি জানান, ‘প্রতিদিন নিয়মিত দুবেলা খাবার পরিবেশন ছাড়াও প্রতি বৃহস্পতিবার এবং প্রতি চান্দ্র মাসের ১১ তারিখে এখানে বিশেষ তবারক বিতরণ করা হয়। এসব দিনে দূর-দূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে।’
মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র ও ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি হাসরত খান ভাসানী বলেন, ‘মওলানা ভাসানী হুজুর বলতেন- তার দরগায় কেউ এলে তাকে যেন অন্তত একটি রুটি দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ পর্যন্ত এখান থেকে কেউ ক্ষুধার্ত মুখে ফিরে যাননি।’
মুসাফিরখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম বলেন, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর স্মৃতি ও আদর্শকে ধারণ করে তার হাতে গড়া সব প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনকে নতুন করে উজ্জীবিত করা হবে। বিশেষ করে, তার ঐতিহাসিক মুসাফিরখানার আধুনিকায়ন অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে- যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ আরো সুচারুভাবে সেবা পেতে পারেন।